মধ্যরাতে সরানো হলো সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্য

Move, Supreme Court, sculpture
ad

জাগরণ ডেস্ক: অবশেষে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের অব্যাহত দাবির মুখে সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে ভাস্কর্যটি মধ্যরাতে সরানো হয়েছে। দাবির মুখে সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে স্থাপিত ভাস্কর্য অপসারণ করা হয়েছে। ভাস্কর্য সরানোর সময় রাতভর আদালতের ফটকের সামনে বিক্ষোভ করেছেন বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।

বৃহস্পতিবার (২৫ মে) মধ্যরাত ১২টার দিকে অনেকটা গোপনেই শুরু করে ভোরের আগেই ভাস্কর্যটি সরানোর কাজ শেষ করা হয়। টানা ৪ ঘণ্টা ধরে কয়েকজন শ্রমিক ভাস্কর্য সরানোর কাজ করেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানিয়েছেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নির্দেশেই ভাস্কর্যটি অপসারণের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে ভাস্কর্যটি সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের পানির পাম্পের পাশে নীল রঙা ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।

এ সময় ভাস্কর্য অপসারণের বিরোধিতা করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে ক্ষুব্ধ জনতা। কংক্রিটের গোড়ায় হাতুড়ি আর শাবল দিয়ে রোমান যুগের ন্যায়বিচারের প্রতীক লেডি জাস্টিসের আদলে গড়া ভাস্কর্যটি যখন সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে সরানো হচ্ছিল, তখন পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন এর ভাস্কর মৃনাল হক। দীর্ঘ এ সময়ে বেশ কয়েকবার সাংবাদিকদের কাছে ছুটে আসেন মৃনাল হক। অসহায়ত্ব ও ক্ষোভের কথা জানান অশ্রসজল চোখে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভাস্কর্য সরানোর খবর পাওয়ার পর বিভিন্ন এলাকা থেকে সর্বোচ্চ আদালতের সামনে ছুটে আসেন বিক্ষুব্ধরা। দুইটার দিকে বেশ কিছু তরুণ সুপ্রিম কোর্টের মূল ফটকের বাইরে স্লোগান দিতে থাকেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের নেতা-কর্মী ও সাধারণ ছাত্রদের একটি মিছিল আসে।

রাত আড়াইটার দিকে বিক্ষুব্ধরা আদালতের ফটক ধরে ধাক্কাধাক্কি করেন। এ সময় কিছুক্ষণের জন্য ভাস্কর্য সরানোর কাজ বন্ধ থাকে। ভেতর থেকে ফটকের কাছে আসেন কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

তবে সাময়িক উত্তেজনার পর বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ফটকের সামনে ও অন্য একটি অংশ রাস্তার একপাশ বন্ধ করে রাস্তার ওপর অবস্থান নেন। থেমে থেমে স্লোগান দিচ্ছিলেন তাঁরা। স্লোগান ওঠে ‘ন্যায়বিচারের ভাস্কর্য অপসারণ করা যাবে না’, ‘আপস না রাজপথ?—রাজপথ, রাজপথ’, ‘হেফাজতের আস্তানা, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘মৌলবাদের আস্তানা, ভেঙে দাও জ্বালিয়ে দাও’ ইত্যাদি।

ভাস্কর্যটি অপসারণের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন অ্যাক্টিভিস্টরা। এটিকে কালো দিন বলেও অভিহিত করেন কেউ কেউ।

বিক্ষোভের মধ্যেই ভাস্কর্যটি অপসারণের কাজ শেষ হয়। সেখান থেকে ক্রেনের সাহায্যে ভাস্কর্যটি একটি ছোট ট্রাকে তোলা হয়। ভাস্কর্যটি অ্যানেক্স ভবনের ভেতরে পানির পাম্পের পাশে নিয়ে রাখা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

ভাস্কর্যটির শিল্পী মৃণাল হক বলেছেন, আমার কিছু বলার নাই। অনেকের অনেক ক্ষমতা আছে। আমি বানিয়েছি, আমাকে সরাতে বলা হয়েছে। আমি তদারকি করছি। এসব বলতে গেলে বিপদ। এর আগে আমার বানানো লালনের ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। আমাকে গতকাল বলা হয়েছে। এ ভাস্কর্য কোন গ্রিক দেবীর নয়। এটি সম্পূর্ণ বাঙালি মেয়ের ভাস্কর্য। শাড়ি-ব্লাউজ পরা একজন বাঙালি নারীকে উপস্থাপন করা হয়েছে এ ভাস্কর্যে। আর এখানে দাড়িপাল্লা বিচারের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এদিকে, ভাস্কর্যটি সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে পুনঃস্থাপন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্থপতি মৃণাল হক।

অন্যদিকে, ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলা শুরু হতে না হতেই প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানায় হেফাজতে ইসলাম। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ওলামা কেরামকে আস্থা ও ভরসা রাখতে বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কথার প্রতিফলন ঘটেছে, সেজন্য তাকে ধন্যবাদ। দেশের মানুষের ধর্মীয় চেতনাবোধকে মূল্য দিয়ে মূর্তি সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে। মূর্তি নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছে সরকার।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের শেষ দিকে গ্রিক দেবীর ভাস্কর্যটি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়। এরপর প্রায় দুই মাস এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কোন মত প্রকাশ না হলেও ফেব্রুয়ারিতে মুখ খোলেন হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী। এক বিবৃতিতে তিনি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্যটি অপসারণের দাবি জানান।মূলত সুপ্রিম কোর্টের ঠিক পাশে জাতীয় ঈদগাহের অবস্থান হওয়ায় কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত দেবী থেমিসের আদলে বানানো ভাস্কর্যটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ, ঈদগাহ থেকে ভাস্কর্যটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এ নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও একাধিকবার মন্তব্য করেন।

ad