রাজশাহীতে বেড়েছে ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন

রাজশাহী জেলা ও মহানগরীতে হঠাৎ করেই ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যানের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। জেলায় গত তিন মাসে ৫০টি ধর্ষণের ঘটনা সামনে এসেছে। এছাড়া এই সময়ের মধ্যে পৃথক ১০৪টি নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। 


ধর্ষণের ৫০টি অভিযোগের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে ৩৮টি এবং মহানগরীর ১২টি। এদিকে পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধর্ষণের শিকার নারীর সাথে অভিযুক্ত ধর্ষকের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে অভিযুক্ত ধর্ষণকারীদের সকলেই গ্রেপ্তার বা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।


জানাগেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, নারীর সাথে পুরুষের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর কোন কারণে বিচ্ছেদ। তখন নারী বা তার পরিবার ওই পুরুষের বিরুদ্ধে থানায় এসে মামলা করছেন ধর্ষণের। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নারীর সঙ্গে একজন পুরুষ প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে তাকে ফুসলিয়ে বা উভয়ের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর পর নারীকে ছেড়ে চলে গেছে ওই পুরুষ। তখন সেই নারী এসে থানায় ধর্ষণের মামলা করছেন ওই পুরুষের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, অপহরণের যেমন মামলা হচ্ছে সেগুলোর ক্ষেত্রের দেখা গেছে অপহরণকারী পুরুষের সাথে অপহরণের স্বীকার ওই নারী প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল। সমাজে এমন ঘটনা কারোই কাম্য নয়। তাই পুলিশ বলছে, অভিভাববকদের সতর্ক হবার পাশাপাশি নিজেদের সন্তানকেও সতর্ক করতে হবে।


রাজশাহী জেলার বিভিন্ন থানায় সেপ্টেম্বর মাসে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে ১৮টি, যার মধ্যে ১১টি ঘটনা উপজেলা পর্যায়ে এবং ৭টি মহানগরীতে। ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৮টির মধ্যে ১২টি ঘটনায় প্রেমের সম্পর্ক ছিল উভয় পক্ষের সাথে। জেলার ১১টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ৫টিতে এবং মহানগরীর ৭টি ধর্ষণের ঘটনার প্রতিটির ক্ষেত্রে ধর্ষকের সাথে অভিযোগকারী নারীর প্রেমের সম্পর্কের সত্যতা পেয়েছে পুলিশ। আগস্ট মাসে রাজশাহী জেলার ৯টি উপজেলায় ১৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। যার মধ্যে ১৪টি ঘটনায় উভয় পক্ষের মাঝে প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল বলে জানা গেছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ের থানাগুলোতে ৮টি অপহরণ মামলা হয়েছে। যেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিটি অপহরণ মামলার আসামীর সাথে ভুক্তভোগী নারীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল।


রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন (বিপিএম, বার) জানান, নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই সমাজে ধর্ষণসহ নানা ধরণের অপরাধ ও অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিভাবক যারা আছেন তাদের সতর্ক হতে হবে সবার আগে। সন্তান কোথায় যায়, কার সাথে সম্পর্ক করে, এসব দিকে নজর রাখতে হবে।


পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে প্রেম করে নারীকে ছেড়ে চলে গেছে, পরে অভিভাবক এসে থানায় মামলা করে ধর্ষণের। অথবা প্রেমের সম্পর্ক, সেখান থেকে শারীরিক সম্পর্ক, পরবর্তিতে ছেলে স্বীকার করছে না। তখন থানায় এসে নারীপক্ষ বলে যে আমার সাথে দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক, আমাকে জোর পূর্বক বা ফুসলিয়ে ধর্ষণ করেছে, মামলা করবো। তখন আমরা মামলা নেই, সেই মামলার প্রেক্ষিতে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা বা রায় ঘোষণা করেন বিজ্ঞ আদালত। ধর্ষণ বা এই জাতিয় ঘটনা কারোই কাম্য নয়। অভিভাবকদের সতর্ক হতে হবে, নিজেদের সন্তানদের সতর্ক করতে হবে। পরিবার সতর্ক হলেই এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।


এদিকে রাজশাহী জেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রকাশিত তথ্য মতে, গত তিন মাসে মোট ৫০টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। জুলাই মাসে ১৪টি ধর্ষণের মধ্যে ৩টি মাহনগরীতে এবং ১১টি জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘটেছে। আগস্ট মাসে ১৮টি ধর্ষণের মধ্যে ২টি মহানগরীতে আর ১৬টি জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ঘটেছে। আর সেপ্টেম্বর মাসে ১৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। যার মধ্যে মহানগরীতে ৭টি এবং উপজেলা পর্যায়ে ১১টি।


এ সংক্রান্ত মামলা আদালতে বিচারাধীন এবং আসামীরা জেল হাজতে রয়েছে। এদিকে গত তিন মাসের তুলনামূলক চিত্রে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বর মাসে রাজশাহী মহানগরীতে ধর্ষণের ঘটনা উপজেলার মতো বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাই মাসে মহানগরীতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৩টি, আগস্টে ২টি এবং সেপ্টেম্বর মাসে এই সংখ্যা ৭ এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে।


এদিকে, গত ৩ মাসে ১০৪টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। জুলাই মাসে ৩৪টি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার মধ্যে ২৪টি উপজেলা পর্যায়ে এবং ১০টি মহানগরীতে। আগস্ট মাসে এ সংক্রান্ত ২০টি মামলার মধ্যে ১২টি উপজেলা পর্যায়ে এবং ৮টি মহানগরীতে। সেপ্টেম্বর মাসে ৫০টি মামলার মধ্যে ২৯টি উপজেলা পর্যায়ে এবং ২১টি মহানগরীতে।