কাটাখালী পৌর মেয়রের অডিও ক্লিপ ভাইরাল, ৩ মামলা

রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলীর ১ মিনিট ৫১ সেকেন্ডের একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অডিও ক্লিপটিতে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নিয়ে কটূক্তিমূলক বক্তব্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত সোমবার (২২ নভেম্বর) রাত থেকে অডিও ক্লিপটি সামাজিক মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। এ ঘটনায় এরইমধ্যে রাজশাহীর তিনটি থানায় মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করেছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) তিনজন কাউন্সিলর।

এ তিন কাউন্সিলরের মধ্যে বোয়ালিয়া থানায় রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি ও রাসিক ১৩ নং কাউন্সিলর আব্দুল মোমিন, চন্দ্রিমা থানায় মহানগর যুবলীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও ১৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর তৌহিদুল হক সুমান এবং রাজপাড়া থানায় মামলা করেছেন ১৪ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ১৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও অতিরিক্ত সহকারী পুলিশ কমিশনার গোলাম রুহুল কুদ্দুস মামলা দায়েরের বিষয়টি বলেছেন , মেট্রোপলিটন এলাকায় রাজশাহী সিটির তিন কাউন্সিলর বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ম্যুরাল সম্পর্কিত আপত্তিকর মন্তব্য করার কারণে নগরীর পৃথক তিনটি থানায় মামলা দায়ের করেছেন বলে শুনেছি।

বিস্তারিত জানতে চাইলে পুলিশের এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মামলা হয়েছে, এটাই শুনেছি। এখন পর্যন্ত বিস্তারিত আমার জানা নেই। বিস্তারিত জানার পর জানাতে পারবো।

অডিও ক্লিপটিতে মেয়র আব্বাস আলী স্থানীয় ভাষায় বলছেন, 'হাইওয়েটাকে আমরা ডিজাইন করতে দিয়্যাছি। আমাদের যে অংশটা হাইওয়ে। সিটি গেট থেকে আমার অংশ। টোটালটাই একটা ফার্মকে দিয়্যাছি, তারা একদম বিদেশি স্টাইলে সাজায়ে দিবে ফুটপাত, সাইকেল লেন টোটালটায় আমার অংশটায়।'

কথার এই পর্যায়ে পাশে থেকে কেউ একজন বলে ওঠেন, 'দুই পারে দুইটা গেট করার কথা আছে।'

উত্তরে পৌর মেয়র বলেন, 'একটু থাইমি গেছি গেটটা নিয়ে, একটু চেঞ্জ করতে হচ্ছে যে ম্যুরালটা দিছে বঙ্গবন্ধুর, এটা ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক সঠিক না। এজন্য আমি ওকে থুব না। সব করব, যা কিছু আছে, খালি শেষ মাথাতে যেটা মাইন্ড করবে না ওড্যাই। আমি দেখতে প্যাছি, আমাকে যেভাবে বুঝ্যালো আমি দেখতে প্যাছি যে ম্যুরালটি ঠিক হবে না দিলে। আমার পাপ হবে। তো কেন দিব? দিব না, আমি তো কানা লোক না, আমাক বুঝাই দিছে।'

অডিও ক্লিপে তিনি আরও বলেন, 'যেভাবে বুঝাইছে তাতে আমার মুনে হইছে যে, ম্যুরালটা হইলে আমার ভুল হয়্যা যাবে। এজন্য চেঞ্জ করছি। এই খবরটাও যদি আবার যায়, তো আবার রাজনীতি শুরু হয়্যা যাবে। ওই বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল দিতে চাইয়া দিচ্ছে না। বঙ্গবন্ধুক খুশি করতে যাইয়া জায়গা নারাজ করবো নাকি? এইডা লিয়েও রাজনীতি করবে কিন্তু আমি সিওর। তবে করলে কিছু করার নাই। মানুষেক সন্তুষ্ট করতে যাইয়া আল্লাক অসন্তুষ্ট করা যাবে না তো।'

এদিকে দিন শেষে মঙ্গলবার (২৩ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৭টার দিকে মেয়র আব্বাস আলী নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। তাতে তিনি লেখেন, 'অডিওটি সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনুন। আপনারা বুঝতে পারবেন অডিওটি এডিট করে তৈরি করা হয়েছে। আমি কখনও কারও সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালসহ গেট নির্মাণ করা হবে না কিংবা কেউ ম্যুরাল নির্মাণ করলে বাধা দেওয়া হবে এ রকম কথা বলিনি।'

সেখানে তিনি আরও উল্লেখ করেন, 'হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে লালন করি এবং মমতাময়ী জননী বাংলাদেশের সফল প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার দেখানো পথে একজন সাধারণ কর্মী হয়ে পৌরসভার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। গত ২৯ মে আমার ফেসবুক আইডি থেকে কাটাখালী পৌরসভার প্রবেশদ্বারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালসহ গেট নির্মাণ করা হবে মর্মে আপলোড দিয়েছিলাম। গেট নির্মাণের জন্য সকল প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু ঢাকা টু রাজশাহী মহাসড়ক দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান থাকায় গেটটি নির্মাণ সাময়িকভাবে বন্ধ আছে। চার লেন রাস্তা নির্মাণের জন্য মহাসড়কের দুই ধারে কতটুকু জায়গা বাড়ছে সেটা নিশ্চিত হওয়ার পরে আশা করছি আগামী বছরের জানুয়ারি অথবা ফেব্রুয়ারিতে পুনরায় গেট নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু করতে পারবো।'

স্ট্যাটাসে তিনি দাবি করেন, 'জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালসহ গেট নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানোর পর থেকে একটি অশুভ শক্তি ম্যুরালসহ যেন গেট নির্মাণ করতে না পারি এ ব্যাপারে ষড়যন্ত্র শুরু করে।'

এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অনিল কুমার সরকার বলেন, 'মন্তব্য পরিষ্কার। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে তিনি কটাক্ষ করেছেন। আমরা সাংগঠনিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।'

এ বিষয়ে তদন্তের প্রয়োজন আছে কি না এবং দলীয় সিদ্ধান্ত কী হবে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে ঘটনাটি জানার পর আমি আমার সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মো. আব্দুল ওয়াদুদ দারা এমপির সাথে কথা বলেছি। তিনিও আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেনকে জানিয়েছেন। অতিদ্রুত একটি তদন্ত কমিটি করে আলোচনা করা হবে। আমরা এরইমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষকারী ব্যক্তির দলে কোনো স্থান নেই।'

জানা গেছে, মেয়র আব্বাস আলী কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের এবং রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরেও তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে মেয়র নির্বাচিত হন।