কুষ্টিয়ায় শ্রম বিক্রির হাট

ফজরের আযানের ধ্বনি শুনেই ঘুম থেকে উঠে পড়েন যেখানে শ্রমিকরা। ব্রিজের উপর কাঁচি আর মাথাল মুড়ি দিয়ে বসে থাকেন কামলা বিক্রির জন্য। ভোরের আলো ফোঁটার আগেই কেউ সাইকেলে চড়ে, কেউবা ভ্যানে আবার কেউ পায়ে হেঁটে ছুটে আসেন শ্রমিকের খোঁজে। এ দৃশ্য কুষ্টিয়া সদর উপজেলার আইলচারা বাক্স ব্রিজ হিলাল মোড়ের।

জানা যায়, এলাকায় শ্রমিকের চাহিদার কারণে এখানে বিভিন্ন স্থানের শ্রমিকদের আগমন ঘটে। এখন সেখানে শ্রমিকের হাট জমে উঠেছে। প্রতিদিন শত শত শ্রমিক আসলেও চাহিদার কারণে তাদের ভাগে মেলানো দায় হচ্ছে। সকলেরই চাহিদা শ্রমিকের। কেউ ধান কাটছে, কেউ ধান বাঁধছে, কেউ ধান ছাড়ছে। কেউ সবজির জমিতে চাষ করছে। তাই চড়া মজুরি দিয়েই শ্রমিক কেনা লাগছে গৃহস্থদের।

এতে দারুণ কদর বেড়েছে শ্রমিকদের। অতিরিক্ত মজুরি দিয়েও শ্রমিক না পাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে গৃহস্থদের। যে যার কাজের সুবিধামতো তাদের চাহিদা অনুযায়ী কামলা খোঁজ করেন। দাম –কষাকষি করেই নিয়ে চলেন কাজের জন্য। আলসেদের চাইতে তাগড়ে জওয়ান শ্রমিকের চাহিদা থাকে আগা-গোড়াই। তাই কর্ম চঞ্চল শ্রমিকরা আগেভাগেই বিক্রি হয়ে যায়। কাজের টান থাকলে আলসে জনরাও শেষ পর্যন্ত বিক্রি হয়ে যায়। তবে তাদের হাজিরা থাকে কম।

হাফ খোরাকি আর কিছু রাহা খরচ পেলেও ওইসব শ্রমিকরা খুশি। এভাবেই দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বড় আইলচারা হিলাল মোড়ে শ্রমিকের হাট চলে আসছে। আগে শ্রমিকের প্রয়োজনে পোড়াদহ স্টেশন থেকে কামলা নিয়ে আসতে হতো। এখন আইলচারা হিলাল মোড়ে হাটটি হওয়ায় এলাকাবাসীর চরম উপকার হচ্ছে। হাটটি শুরুর দিকে কুষ্টিয়ার বড় আইলচারা গ্রামের মন্ডল পাড়ার মরহুম হিলাল মন্ডল এখানে শ্রমিকদের ডেকে ডেকে বসাতেন। শ্রমিকরা কাজ না পেলে এক বেলা খাওন দিয়ে তাদের বিদায় দিতেন। এভাবেই শ্রমিকদের আসা-যাওয়ার ধারা অব্যাহত রাখার পর হাটটি চালু হয়।

শ্রমিকের হাটটি এখন জাঁকজমকভাবে চলে আসছে। এখানে দেশের উত্তরাঞ্চল চাপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, রাজশাহী, পাবনা, ফরিদপুরসহ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে নিম্নআয়ের লোকজন শ্রম বেচাকেনার জন্য আসেন। ফজরের আজান দেওয়ার পর পরই বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচি, ঝুড়ি, কোদালসহ কাজের জন্য শ্রমিকেরা জড়োা হয় কুষ্টিয়ার বড় আইলচারা হিলাল মোড়ে। এই মোড়ের ব্রিজের উপরসহ দীর্ঘ মোড়ে শ্রমিকে শ্রমিকে কানায় কানায় ভরে যায়। সকালে শ্রমিকদের শোরগোল আর চিৎকার ২/১ মাইল দূর থেকে শোনা যায়। বছরের সব সময়ই এ শ্রমিকের হাট বসে।

শ্রমিক এ হাটের সুনাম থাকায় জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে গৃহস্থরা মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল নসিমন, করিমন নিয়ে এ হাটে ছুটে আসে। গৃহস্থদের চাহিদা অনুযায়ী শ্রমিকদের বিভিন্ন দামে কিনে নিয়ে যায়। শুধু ধান লাগানো, ধান-কাটা আর পাট কাটা ধোয়ার জন্যই নয়। সব ধরনের কাজের জন্য পাবেন বিভিন্ন পেশার শ্রমিক। রাজমিস্ত্রী, টিনের ঘরের মিস্ত্রীও পাওয় যায় এখানে। কোন কাজের জন্য দিনব্যাপী শ্রমিক ও চুক্তিতেও শ্রমিক কেনাবেচা হয় এ হাটে। আমন, ইরি, বোরোর মৌসুমে শ্রমিকদের চাহিদা থাকে সবচেয়ে বেশি। কাজের সময় সবচাইতে বেশি মজুরি পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিকরা এ বাজারে ছুটে আসছেন। এখন আর ভোর নয় গৃহস্থদের চাহিদা থাকায় দিনের বেলাতেও শ্রমিক কিনে কাজে লাগাচ্ছে। আর এ ভাবেই কুষ্টিয়ার বড় আইলচারা হিলাল মোড়ে আবহমান কালের শ্রমিক হাট বসছে।

শ্রমিক শফিকুল জানায়, তাদের বাড়ী মাঝপাড়ায় তারা খুব ভোরে এখানে সাইকেলযোগে আসেন। সারা বছরই কামলা দেন। তারা কাজের মৌসুমে ভালো দাম পান বলে জানান।

শ্রমিক ক্রেতা আজিবর জানান, তারা মাঠে কাজ করার জন্য শ্রমিক নিতে এসেছেন কিন্তু শ্রমিকের বাজার খুব চড়া। কত দাম জানতে চাইলেই ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলছেন ৫ শ’ থেকে ৬ শত টাকা। দামাদামি করতেই অন্য গৃহস্থ এসে তাদেরকে নিয়ে চলে যাচ্ছে।
স্থানীয় চাষি খালিদ হাসান জানান, আইলচারা, বল্লভপুর, খাজানগর এলাকায় ধান-চাতাল ও অটো রাইচ মিল গড়ে ওঠায় অত্র এলাকার শ্রমিকরা আর এখানে শ্রম দিতে আসেনা। তারা বিভিন্ন মিলে চাকরি করছেন। ফলে শ্রমিক সংকট এ এলাকায় সব সময়। অনেক সময় শ্রমিকের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।  বড় আইলচারা হিলাল মোড়ে বৃহত্তম শ্রমিকের হাট বসছে প্রতিদিনই। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী কুষ্টিয়া জেলায় ব্যাপক সুনাম বয়ে এনেছে।