দেশে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বাড়ছেই!

পরিবেশদূষণকারী পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন ও বিক্রি চালিয়েই যাচ্ছেন। আইন অমান্য করে প্রকাশ্যে চলছে উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এই প্লাস্টিক পণ্যটির ব্যবহার আটকানো যায়নি উল্টো আরোও বেড়েই চলছে।


বাজারের পণ্য থেকে শুরু করে ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার হচ্ছে। আর এই পলিথিন মাটিতে আটকে পানি ও প্রাকৃতিক পুষ্টির উপাদান চলাচলে বাঁধা দেয়। ফলে মাটিতে থাকা অনুজীবগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে না। ফলে জমির উর্বরতা শক্তি হ্রাস এবং শস্যের ফলন কমে যায়। এছাড়াও মানুষের নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়।


মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজার থেকে বাজার করছিলেন খাইরুল ইসলাম। তার হাতে দু’তিনটি পলিথিনের ব্যাগ। নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার সম্পর্কে তিনি বলেন, ভাই আমাদের তো কিছু করার নেই। দোকানিরা আমাদের ধরিয়ে দিলে আমরা কী করব? ক্রেতা আলু আর মরিচের একটি পলিথিনের ব্যাগ এগিয়ে দিলেন খাইরুল ইসলামের দিকে। পলিথিনের ব্যাগ দিচ্ছেন কেন জানতে চাইলে দোকানি বলেন, পলিথিন ছাড়া সদাইপাতি দিমু কেমনে? কাগজের ব্যাগ কি ঝুঁলাইয়া নেওয়া যাইব?


তবে কাঁচাবাজারগুলোতে কাগজের ব্যাগের ব্যবহার না দেখা গেলেও ফলের দোকানগুলোতে দেখা যায় কাগজের ঠোঙ্গা। মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ কাঁচাবাজার, মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজার, টাউনহল কাঁচাবাজার ও কারওয়ানবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্যাগের দোকানগুলোতে চটের ব্যাগ তেমন একটা নেই, পলিথিনের ব্যাগে ভরা।



রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পলিথিন ব্যাবসায়ী মো. হাবিবুর রহমান বিবার্তাকে বলেন, বাজারে পলিথিন ব্যাগের চাহিদা বেশি। কারণ হিসেবে বলেন, দাম কম ও পরিমাণে বেশি পাওয়া যায়। আর চটের ব্যাগের দাম বেশি তাই কেউ কিনতে চায় না। অন্যদিকে কাগজের ব্যাগে সবকিছু বহন করা যায় না। কোথা থেকে নিয়ে আসেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নিয়া আহি না, আমাগর কাছে পাইকাররা আইসা দিয়ে যায়। তবে তিনি জানান, পুরান ঢাকার চকবাজার, ইসলামবাগ, সোয়ারীঘাট এলাকায় পলিথিন ব্যাগ কারখানার অভাব নেই।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০২ সালের ৮ এপ্রিল পরিবেশ অধিদফতর এক প্রজ্ঞাপণের মাধ্যমে সকল ধরনের পলিথিনের ব্যাগ উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ ও বিতরণ নিষিদ্ধ করে। আইনে পলিথিন উৎপাদন ও বিপণনের দায়ে জেল এবং জরিমানা উভয়দণ্ডের কথা বলা হয়েছে তারপরও এর উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার অবাধে চলছে।


পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সারাদেশে অবৈধ পলিথিন তৈরির কারখানা রয়েছে কমপক্ষে ১৫০০। এরমধ্যে পুরান ঢাকা এবং বুড়িগঙ্গার তীর ঘেষে রয়েছে কমপক্ষে ৭ শতাধিক কারখানা। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিদিন কোটি কোটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার শেষে ফেলে দেয়া হয়। ফেলে দেয়া পলিথিন ব্যাগের একটা বিরাট অংশ কোনো না কোনোভাবে নদীতে গিয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীর তলদেশে পলিথিনের পুরু স্তর জমেছে।


পরিবেশবাদীরা বলছেন, অনেক দেশ আইন করে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করেছ। কিন্তু আমাদের দেশে স্থলের পর এবার নদী-সাগরকে বিষিয়ে তুলেছে বিষাক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক। তারপরও সচেতনতা বাড়ছে না। মানুষ প্রাণী ও পরিবেশকে রক্ষা করতে পলিথিন ও ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তারা বলছেন, পলিথিন নিষিদ্ধ হওয়ার পরও সারাদেশে চলছে এর অবাধ ব্যবহার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই রাজধানীসহ সারাদেশেই পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার চলছে। ছোট পণ্য থেকে শুরু করে সবকিছুতেই বিক্রেতারা ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন পলিথিনের ব্যাগে।


আবার পুরনো পলিথিন পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে নতুন পলিথিন। এতে মারাত্মকভাবে বায়ু দূষণ হচ্ছে। পলিথিন পোড়ালে কার্বন মনো-অক্সাইড তৈরি হয়ে বাতাস দূষিত করে। এদিকে পলিথিনের জন্য সমুদ্রের জীববৈচিত্রেও পরেছে ঝুঁকির মূখে।



চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারে চর্মরোগ ও ক্যান্সারের মত ভয়াবহ রোগ হয়। পলিথিনে গরম খাবার দিলে বিস্ফালন-এ তৈরি হয়। আর বিস্ফালন-এ থাইরয়েড হরমনকে বাঁধা দেয়। যার ফলে বিকল হতে পারে লিভার ও কিডনি। এমনকি বিস্ফালন-এ গর্ভবতী মায়ের রক্তের মাধ্যমে ভ্রুণে চলে যাওয়ার কারণে ভ্রুণ নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে দেখা দিতে পারে বন্ধ্যাতাও। পলিথিনে খাবার সংগ্রহ করে তা গ্রহণের ফলে মানব শরীরে বাসা বাঁধতে পারে ক্যান্সারের মত প্রাণঘাতী রোগ।


এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছর ৮৭ হাজার টন ওয়ানটাইম পলিথিন ও প্লাস্টিক বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক স্ট্র, কটনবাড়, ফুড প্যাকেজিং, ফুড কনটেইনার, বোতল, প্লেট, প্লাস্টিক চামচ, কাপ, প্লাস্টিক ব্যাগ, পেস্ট, শ্যাম্পুর প্যাকেট ইত্যাদি। মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ও বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে এসব প্লাস্টিক কৃষি জমি, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নদী-নালা, খাল-বিল ও সমুদ্রে পতিত হয়ে এসব পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতি করছে।


বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) তথ্য মতে, শুধু রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি পলিথিন একবার ব্যবহার করে ফেলে দেয়া হয়।



গবেষণায় জানা যায়, ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদীর পানি এখন পলিথিনের কারণে ভয়াবহ দূষিত। এই নদীর তলদেশে জমাট বেঁধেছে প্রায় ৮ ফুট পুরু পলিথিনের স্তর। ভয়াবহ দূষণের কারণে এই নদীর পানি থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। প্রাণ ও পরিবেশ বাচাঁতে শাস্তির বিধান রেখে পলিথিন উৎপাদন ও বিপণন রোধে আইন করা হয়েছে। সচেতনা ও আইনের প্রয়োগ না থাকায় পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ হয়নি।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অধিকাংশ নদ-নদীর তলদেশে পলিথিনের পুরু স্তর জমায় পানি ধারণ ক্ষমতা অনেক কমে গেছে। সিলেটের সুরমা নদীর অবস্থা এরকম হওয়ায় পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি নদী ধারণ করতে পারছে না। ফলে নদী উপচে প্লাবিত হচ্ছে শহর-গ্রামসহ গোটা এলাকা। পলিথিন আমাদের ভূমি, নদী, পরিবেশ সব কিছু গিলে খাচ্ছে। সাগর বিষাক্ত করছে। রাস্তা এবং গলি থেকে পলিথিন বাতাসে উড়ে জমা হয় ড্রেনে-নর্দমায়। পলিথিন ৪০০ বছরেও পচে না। অর্থাৎ আজ কাজ শেষে যে পলিথিন গলিতে বা রাস্তায় ফেলা হচ্ছে তা পরিবেশ ধ্বংস করার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পলিথিন একদিকে জলাবদ্ধতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা কমাচ্ছে, আবার তলদেশে জমা হয়ে নদী ভরাট হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে।


বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক বিবার্তাকে বলেন, পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ আইন থাকলেও এর কার্যকারিতা একেবারেই নেই। সরকার একেবারেই আন্তরিক নয়। পলিথিন বন্ধ করতে হলে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু পরিবেশ অধিদফতর একা পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ করতে পারবে না। তাদের সাথে শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সিটি কর্পোরেশনও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।


পৃথিবী ও মানব সভ্যতাকে রক্ষায় এর উৎপাদন এবং ব্যবহার বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।