'শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শিক্ষায় সফল বিপ্লব ঘটেছে'

'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে

বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলবো না'


এক সাগর রক্তের বিনিময়ে উদিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতার পর বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু ভালোভাবে অনুধাবন করেছিলেন, শিক্ষা ছাড়া জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। তাই তিনি একটি শিক্ষিত জাতির স্বপ্ন দেখেছিলেন। এরপর ভাবনামতো কাজ। শোষণমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ, সংবিধানে শিক্ষা বাধ্যতামূলক, শিক্ষা কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়িত করেছেন। তাঁর আরও উদ্যোগ বাস্তবায়নের স্বপ্ন থাকলেও নিষ্ঠুর ঘাতকদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কারণে বঙ্গবন্ধু তা করে যেতে পারেননি। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে পিতার শিক্ষানীতিকে সামনে রেখে শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এর সার্বিক উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। যার ফলে এই সেক্টরে ব্যাপক সফলতাও এসেছে।


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার মধ্য দিয়ে তাঁর প্রণীত শিক্ষানীতিকেও হত্যা করা হয়। এরপর সামরিক শাসক ক্ষমতায় এসে ১৯৭২ সালের সংবিধানের আলোকে বঙ্গবন্ধু যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিলেন, সেটাকে স্থগিত করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া এবং জেনারেল এরশাদ নতুন শিক্ষা কমিশন গঠনের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যাবস্থাকে পাকিস্তানি ভাবধারায় নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। এরপর ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনেন। ফলে তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্বে মাত্র দু’বছরে ব্যবধানে স্বাক্ষরতার হার ৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এ অর্জনের স্বীকৃতি হিসাবে বাংলাদেশ ‘ইউনেস্কো সাক্ষরতা পুরস্কার ১৯৯৮’ লাভ করে। কিন্তু পরবর্তীতে অর্থাৎ ২০০১ সালে বিএনপি জামায়াত সরকারের আমলে আবার পিছিয়ে যায় শিক্ষা। এসময় শিক্ষার হার আগের চেয়ে ২০ শতাংশ কমে ৪৪ শতাংশে নেমে আসে।


২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও শিক্ষা ব্যবস্থায় নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এসময় শিক্ষার হার ছিল ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে শিক্ষার উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর ধীরে ধীরে এর সুফল আসতে থাকে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৫১.৭৭ শতাংশ। আর এখন ২০২২ এর জনশুমারি ও গৃহগণনা প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে সাক্ষরতার হার দাঁড়িয়েছে ৭৪.৬৬ শতাংশে।


এদিকে শিক্ষাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে, গরীব অসহায় পরিবারের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করতে এবং একইসাথে পাঠ্যপুস্তকের সংকট কমাতে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার বিনামূল্যে বই বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়।


ওই বছর সরকার ২৯৬ কোটি ৭ লাখ টাকার পাঠ্যপুস্তক বিতরণের উদ্যোগ নেয় এবং ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি এটি প্রথম উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে প্রতিবছর এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে। ২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত মোট ৪০০ কোটি ৫৪ লাখ ৬৭ হাজার ৯১১ কপি পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়েছে। যা সারাবিশ্বে জন্য এক বিরল দৃষ্টান্ত । বিনামূল্যে বই বিতরণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের মেধাবৃত্তি, উপবৃত্তিসহ আরও নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে শিক্ষার কল্যাণে। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর প্রণীত রূপরেখায় সকল শিক্ষার্থীর অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করা হয়।


উচ্চশিক্ষাকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন স্থাপিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায়ও বাড়তি নজর দেয়া হচ্ছে। ফলে দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।


শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সাক্ষর জ্ঞানদান, জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদে পরিণতকরণ, আত্ম-কর্মসংস্থানের যোগ্যতা সৃষ্টিকরণের বিধান প্রণয়নকল্পে ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন ২০১৪’ করা হয়েছে। ২০১০ সালে শেখ হাসিনার দিক নির্দেশনায় জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়। অথচ এর আগে দেশে কোনো শিক্ষানীতিও ছিল না।



বঙ্গবন্ধুকন্যা বাংলাদেশ সাক্ষরতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। এদিকে নারী শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব, মাদরাসা শিক্ষায় আধুনিকায়ন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিসহ শিক্ষার উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে উন্নত ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে দেশের ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৩ হাজারের অধিক স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় স্থাপন করা হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। এছাড়া ডিজিটালাইজেশন করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনলাইনের আওতায় এনে নানা কার্যক্রমকে রুটিনমাফিক স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে। কোভিডকালেও অনলাইন প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রমকে চালু রাখা হয়েছে।




নানা ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফলতার কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জেড এম পারভেজ সাজ্জাদ বিবার্তাকে বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব স্বীকৃত সফল রাষ্ট্রনায়ক জননেত্রী শেখ হাসিনার ৭৬তম জন্মদিনে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর যখন বাংলাদেশকে গভীর অন্ধকারে নিপতিত হয় এবং হত্যায় জড়িত দেশিয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা যখন বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধকে চিরতরে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র লিপ্ত। মাতৃভূমির সেই গভীর সংকটকালে ১৯৮১ সালের ১৭ মে পিতার স্বাধীন করা দেশকে পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে শত বাধা বিপত্তি ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। তাঁরই হাত ধরে বাংলাদেশ পেয়েছে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা। দেশ এগিয়ে চলেছে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার অভিষ্ট লক্ষ্যে।


তিনি বলেন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, গ্রামকে শহরে রূপান্তর, ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা প্রত্যন্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া, দেশের সকল পর্যায়ের যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়নসহ বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প- যেমন পদ্মা বহুমুখী সেতু, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, মেট্রো রেল, কক্সবাজার রেললাইন, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু রেল সেতু, এলএনজি টার্মিনাল, পায়রা বন্দর, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণসহ ইত্যাদি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে।


শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর অবদানের কথা উল্লেখ করে এই শিক্ষাবিদ বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবিস্মরণীয় এক নাম। তাঁর যুগান্তকারী নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে শিক্ষায় ব্যাপক সফলতা এসেছে। আর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য তিনি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছেন। আশা করি, বঙ্গবন্ধুকন্যার হাত ধরে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরিত হবে। মহান আল্লাহর নিকট তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘ কর্মক্ষম জীবন প্রার্থনা করছি।


কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বিবার্তাকে বলেন, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার যে সকল সেক্টরগুলোকে প্রাধান্য দিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম ছিল শিক্ষা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেক্টরে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছেন। ফলে এই সেক্টরে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।



তিনি বলেন, একটা সময় প্রাথমিক শিক্ষার হার ৬১ শতাংশ থাকলেও আজ তা ৯৬ শতাংশে উন্নিত হয়েছে। বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তিসহ শিক্ষার কল্যাণে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শিক্ষায় ব্যাপক সফলতার মাধ্যমে নীরব বিপ্লব ঘটেছে।


তিনি আরও বলেন, এদেশের মাদরাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার জন্যও নানাভাবে কাজ করা হচ্ছে। ফলে এখানকার শিক্ষার্থীরা সব ধরণের সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। কোনো কিছু থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন না। এদিকে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে গবেষণা বৃদ্ধিসহ এর উন্নয়নেও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। উচ্চ শিক্ষাকে দেশময় ছড়িয়ে দিতে জেলায় জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আজ দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৪ টিতে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে জোর দেয়া হয়েছে। এখানেও ১১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যা উচ্চ শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।


ড. মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, দেশের সর্বত্র এখন ডিজিটালাইজেশন এর ছোঁয়া লেগেছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা জোরালো হয়েছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত সব জায়গায় এখন ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা দেয়ার নানামুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া জেন্ডার সমতা এবং শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে কাজ করছে শেখ হাসিনা সরকার।


এই শিক্ষাবিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প ২০৪১ অর্থাৎ এদেশকে উন্নত বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। আর এটির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে আমি একটা কথা বলতে চাই, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অবশ্যই আমাদের শিক্ষার গুণগত মান আরও বৃদ্ধির জন্য কাজ করতে হবে।