ছাত্রলীগের সম্মেলন: উত্তরবঙ্গে আলোচনায় যারা

বহু আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দেশের প্রাচীনতম ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সম্মেলন এলে বরাবরই আলোচনার শীর্ষে থাকে আঞ্চলিক হিসাব- নিকাশ। ব্যতিক্রম ঘটছে না এবারের ৩০তম জাতীয় সম্মেলনেও।


আগামী ৮ ও ৯ ডিসেম্বর দুই দিনব্যাপী ছাত্রলীগের এই জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এরমধ্যে ৮ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এবং ৯ ডিসেম্বর ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।



২১ নভেম্বর, সোমবার বেলা ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় ছাত্রলীগ।



এর আগে ৪ নভেম্বর, শুক্রবার ছাত্রলীগের ৩০তম সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। পরে ১৫ নভেম্বর, মঙ্গলবার তা ৩ তারিখের পরিবর্তে ৮ ডিসেম্বর করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৯ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান যাবেন। দেশে ফিরবেন ৩ ডিসেম্বর। যার কারণে সম্মেলনের তারিখ পেছানোর নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। ফলে সম্মেলনের তারিখ ৮ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। পরে যা দুই দিনব্যাপী হওয়ার বিষয়ে জানানো হয়।


এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় লিখিত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৩০তম জাতীয় সম্মেলন আগামী ৮ ও ৯ ডিসেম্বর আয়োজন করার অনুমতি প্রদান করেছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতান্ত্রিক অভিভাবক দেশরত্ন শেখ হাসিনা। আগামী ৮ ডিসেম্বর সম্মেলন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সম্মেলনের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করবেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।


তিনি বলেন, বাঙালি জাতির মুক্তির মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে জন্ম নেওয়া, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গড়া ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যেকোনো যৌক্তিক আন্দোলনে, যৌক্তিক বিষয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে, বাঙালি জাতির সকল অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে সংগঠনটি নেতৃত্ব দিয়েছে সামনের সারিতে থেকে। বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে মিশে থেকে জাতির উত্থানের সব ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।


জয় বলেন, সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসবে। আর তারাই আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কাকে বিজয়ী করতে জোরালো ভূমিকা রাখবে এবং একইসাথে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠন করার জন্য তরুণ প্রজন্মকে সাথে নিয়ে কাজ করে যাবে তারা।


সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস, সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।


আনুষ্ঠানিক এই সংবাদ সম্মেলনের অনেক পূর্ব থেকে অর্থাৎ সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা হওয়ার পর থেকে সম্মেলনকে ঘিরে উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে নেতাকর্মীদের মাঝে। একই সঙ্গে তখন থেকে শুরু হয়েছে পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ।



নতুন নেতৃত্বে আসার জন্য ছাত্রলীগের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী দলের হাইকমান্ডের সাথে লিংক লবিংয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন পদপ্রত্যাশীরা। কারা আসছেন ছাত্রলীগের আগামীর নেতৃত্বে?



এই আলোচনা এখন ছাত্ররাজনীতির আতুড়ঘর হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী মধুর ক্যান্টিন থেকে শুরু করে ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়সহ সব জায়গায়। পদপ্রত্যাশীসহ ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা- ছাত্রলীগে মেধাবী, শিক্ষার্থীবান্ধব, রাজপথে সক্রিয়, ত্যাগী ও সাংগঠনিক নেতৃত্বসম্পন্ন নেতা আসবেন।


নির্ভরযোগ্যসূত্রে জানা যায়, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রলীগের এবার নেতৃত্ব নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরাসরি নেতা বাছাইয়ে নেতৃত্ব দিবেন।


এদিকে ছাত্রলীগের বিগত সম্মেলনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সম্মেলনে নেতৃত্ব নির্বাচনে কয়েকটি বিষয় দেখা হয়। তার মধ্যে- পারিবারিক পরিচিতি, নিয়মিত ছাত্রত্ব, সংগঠনের জন্য ত্যাগ ও এলাকা। নেতৃত্ব নির্বাচনে অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি এলাকার বিষয়টি বিশেষ প্রাধান্য পেয়ে আসছে। সেক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন বিভাগের পদপ্রত্যাশীরা আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।


ছাত্রলীগের সম্মেলন নিয়ে বিবার্তা২৪ডটনেটের ধারাবাহিক আয়োজনের আজ তৃতীয় পর্ব। সম্মেলনে নেতৃত্বের দৌড়ে উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে আলোচিত যারা, তাদের নিয়ে।


ছাত্রলীগের সম্মেলনের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ২০০৬-২০১১ সাল পর্যন্ত মাহমুদ হাসান রিপন ছাত্রলীগের সভাপতি ও মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এরমধ্যে সভাপতি রিপন ছিলেন উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা অঞ্চলের। এরপরের দুই কমিটিতে এই অঞ্চল থেকে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব আসেনি। পরে ২০১৮-২০১৯ কমিটিতে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পান। যিনি এই অঞ্চলের ছিলেন। পরবর্তীতে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একই সেশনের কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন সাদ্দাম হোসেন। যিনি এখন অবধি দায়িত্ব পালন করছেন।


এদিকে উত্তরবঙ্গ অঞ্চল রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ নিয়ে হলেও রাজশাহী অঞ্চল থেকে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব দীর্ঘদিন আসেনি। সর্বশেষ এই এলাকা থেকে ১৯৮৮-১৯৯২ কমিটিতে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব এসেছিল।


এরপর থেকে ২০১৮-২০১৯ পর্যন্ত ছাত্রলীগের ৮টি কেন্দ্রীয় কমিটি হলেও রাজশাহী অঞ্চল থেকে নেতৃত্ব আসেনি। তবে বিভিন্ন সময়ে রংপুর অঞ্চল থেকে নেতৃত্ব এসেছে। ফলে এবারের সম্মেলনে প্রার্থী নির্বাচনে ধারাবাহিকতার ন্যায় রংপুর ও দীর্ঘদিন নেতৃত্ব না পাওয়া রাজশাহী অর্থাৎ উত্তরবঙ্গ অঞ্চলটি বরাবরের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


আলোচনায় যারা:


সাদ্দাম হোসেন (ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক), রকিবুল ইসলাম ঐতিহ্য ( সহ সভাপতি কেন্দ্রীয় কমিটি), রাকিবুল হাসান রাকিব ( সহ সভাপতি কেন্দ্রীয় কমিটি), হায়দার মোহাম্মদ জিতু ( প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক), আবুল হাসনাত সরদার হিমেল ( গ্রন্থতা ও প্রকাশনা সম্পাদক), আবদুল্লাহ হীল বারী ( গণশিক্ষা সম্পাদক), আল আমিন সিদ্দিক সুজন (ক্রীড়া সম্পাদক), মেহেদী হাসান সানী ( সাংস্কৃতিক সম্পাদক), হাসানুর রহমান হাসু ( সমাজসেবা বিষয়ক উপ সম্পাদক), আহসান হাবীব ( উপ দফতর সম্পাদক ও সাবেক জিএস অমর একুশে হল)।


তবে শেষ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গ অঞ্চল থেকে শীর্ষ নেতৃত্বে আসছে কী আসছে না, তা জানার জন্য আগামী সম্মেলনের পর নতুন কমিটি ঘোষণার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।


কেমন নেতৃত্ব চান আলোচিত পদপ্রত্যাশীরা?


ছাত্রলীগের ৩০ তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে কেমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করেন জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বিবার্তাকে বলেন, যারা একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে, যারা চতুর্থ শিল্প বিপ্লব উপযোগী দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে এবং বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের যে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জনগণের জীবনমানের যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সেটি ধরে রাখার জন্য যারা সাহসিকতা, মেধা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবে এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করি। সর্বোপরি যারা সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে বলিষ্ঠ ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এমন নেতৃত্ব ছাত্রলীগে আসুক।


ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি রকিবুল ইসলাম ঐতিহ্য বিবার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন 'বাংলাদেশ ছাত্রলীগ' জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা স্বপ্নের ধারক ও বাহক। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ ও বিবিধ টানাপোড়েন মোকাবিলা করে ছাত্রলীগ তার অগ্রযাত্রা ধরে রেখেছে।


আদর্শিক সংগ্রাম ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের একনিষ্ঠ অনুসারী বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বর্তমান প্রেক্ষাপটে আরো বেগবান ও শক্তিশালী। আগামী নেতৃত্বেও এর প্রতিফলন থাকবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করি। আগামী দিনের নেতৃত্ব হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জীবিত, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বলীয়ান এবং সর্বোপরি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে প্রদীপ্ত।


ছাত্রলীগের সহ সভাপতি রাকিবুলহাসানরাকিব বিবার্তাকে বলেন,বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ ‍মুজিবুর রহমানের আদর্শের সংগঠন। এ দেশের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সংগঠনটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কাজেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগে দেশরত্ন শেখ হাসিনার টিমমেট প্রয়োজন।



যে নেতৃত্ব শেখ হাসিনার পালস বুঝবে, তাঁর পরিকল্পিত নতুন আধুনিক-উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করবে, তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়বে এমন নেতৃত্বই ছাত্রলীগের আসন্ন সম্মেলনে সবার প্রত্যাশা।



ছাত্রলীগের প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক হায়দার মোহাম্মদ জিতু বিবার্তাকে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতির দর্শন যারা মনেপ্রাণে লালন ও ধারণ করেছেন এবং জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার উন্নয়ন চিন্তার সহযাত্রী হিসেবে দৃঢ়তার সাথে কাজ করেছেন, সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বিনির্মাণে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার যোগ্য সারথী হিসেবে কাজ করার যোগ্যতা যারা রাখেন, এমন নেতৃত্ব আমরা প্রত্যাশা করি।