মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিনতাই; আড়ালে সংঘটিত হচ্ছে জঙ্গিবাদ

পুলিশের চোখে স্প্রে মেরে ঢাকার আদালতের ফটক থেকে গত রবিবার (২০ নভেম্বর) জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেয় জঙ্গিরা। ওই ঘটনায় আনসার আল ইসলামের ১০ জনের বেশি সদস্য অংশ নেয়। আটটি মোটরসাইকেলে করে জঙ্গি সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসে ও পুলিশের উপর হামলা চালায়। ঘটনার পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গিসহ অন্যরা এসব মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়।



সাধারণত এইরকম ঘটতে দেখা যায়, হলিউড বা বলিউডের অ্যাকশন মুভিতে। কিন্তু বাংলাদেশের আদালত প্রাঙ্গণে, প্রকাশ্য দিবালোকে ২০ নভেম্বরের এমন ঘটনা সত্যিই বিস্ময়কর। সেক্ষেত্রে কিছু প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হয়। তাহলে কি বাংলাদেশে আবারও জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে?



ওইদিকে, ২০ নভেম্বরে পালিয়ে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত সামির ও মো. আবু ছিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিবকে ধরিয়ে দিতে পারলে প্রত্যেকের জন্য ১০ লাখ করে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ। পাশাপাশি দেশজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্দেশে।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গিবাদ নির্মূলে এখন কতটা তৎপর যে, বুধবার (২৩ নভেম্বর) জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করেছে ডিএমপি কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। তার নাম মেহেদী হাসান অমি ওরফে রাফি (২৪)। রাফি ওই ঘটনায় করা মামলার আসামি। ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. ফারুক হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।


দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠে নেমেছে বিএনপি-জামাত জোট। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় তারেক জিয়া ছিলেন সন্ত্রাসীদের গডফাদার। বাংলা ভাইসহ জেএমবির সদস্যরা প্রত্যেকে কাঁধে অস্ত্র নিয়ে পুলিশ প্রটেকশনে প্রকাশ্যে মিছিল করেছে। দেশকে উগ্র জঙ্গিবাদ, মৌলবাদের চারণভূমি বানিয়েছিল। ২০০৬ সালে বিবিসি অনলাইন এক রিপোর্ট মতে- বাংলাদেশে ছোট-বড় ১২৫টি জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব আছে। জঙ্গিদের অনেকে সাক্ষাৎকারে বিবিসিকে বলেছিল, তাদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তারেক রহমান।



নভেম্বর-ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে সারাদেশেই রাজনীতির মাঠ সরগরম। একদিকে আওয়ামী লীগ, মহিলা লীগ, ছাত্রলীগের সম্মেলন, অন্যদিকে সরকারের পতন ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সারাদেশে বিএনপি সমাবেশ করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে জঙ্গিদের এহেন কর্মকাণ্ড আসলে কীসের ইঙ্গিত! আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কতটা প্রস্তুত এইসব অপ-তৎপরতা ঠেকাতে?



বহুল আলোচিত দীপন হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা জঙ্গি সহযোগিতায় আদালত প্রাঙ্গণ থেকে পালিয়ে গেল, এতে কি বোঝা যায় দেশে জঙ্গিরা আবার তৎপর হয়ে উঠছে? আবার খুব দ্রুত সময়ে সেই জঙ্গিদের একজন গ্রেফতার হলো, এটা সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাফল্য এবং তারা সব অপর্কম ঠেকাতে প্রস্তুত আছেন?


বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হামলা শুরু হয় ১৯৯৯ সালের শুরুতে, চলে ২০০৬ সাল পর্যন্ত৷ সে সময় হামলা চালায় হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি) ও জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)৷ ২০০৬ ও ২০০৭ সালে জঙ্গি নেতাদের আটক করে ফাঁসি দেয়া ও কয়েকশ জঙ্গি আটকের প্রেক্ষিতে জঙ্গি হামলা থেমে যায়৷


ওই সময় মনে করা হয়েছিল জঙ্গিরা আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না৷ কিন্তু হামলা বন্ধ হলেও জঙ্গিরা কার্যত বসে থাকেনি৷ সামর্থ্য হারিয়ে তারা আত্মগোপনে চলে যায়৷ ভিতরে ভিতরে সংগঠিত হতে থাকে৷ কৌশল পাল্টে গোপনে সংগঠনকে শক্তিশালী করে আবার হামলার সক্ষমতা অর্জন করে৷ ঠিক এমনটাই ঘটেছে ২০০৭ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত৷ ওই বছরগুলোতে জঙ্গিরা শক্তি অর্জন করেছে এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আবার হামলা শুরু করে৷


২০১৬ সালে শোলাকিয়া ময়দানে হামলার পর দেশে বড় ধরনের হামলা হয়নি৷ ধারণা করা হয়, পুলিশ ও র‍্যাবের অভিযানে সন্দেহভাজন শতাধিক জঙ্গির মৃত্যু ও কয়েক হাজার জঙ্গি আটকের ফলে হামলা থেমে যায়৷ তবে পূর্বের ন্যায় জঙ্গিরা থেমে থাকেনি৷ মূলত অনলাইনে তারা কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে৷ বিশেষ করে করোনাকালীন ২০২০ ও ২০২১ সালে জঙ্গিরা অনলাইনে প্রচার-প্রচারনায় তৎপর ছিল৷ এ সময় তারা শত শত সমর্থক, বিশেষ করে তরুণদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করে৷


পুরাতন হুজিবি নেতাদের মধ্যে যারা জেলে বা জেলের বাইরে আছে, তারা সক্রিয় হয়েছে৷ এরা নবীনদের হিযরত ও জিহাদে উদ্বুদ্ধ করছে৷ পাহাড়ি অঞ্চলে এদের কিছু গোপন তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়৷ আনসার-আল ইসলামের মতো তারাও অনেক তৎপর গত কয়েক মাস ধরে৷



এদিকে গত সপ্তাহে ঢাকা থেকে তিনজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে, যারা হুন্ডির মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া থেকে টাকা সংগ্রহ করে জঙ্গিবাদে ব্যবহার করছিল৷



মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি ছিনতাই প্রসঙ্গে ফয়সাল আরেফিন দীপনের স্ত্রী রাজিয়া রহমান জলি বিবার্তাকে বলেন, এই ঘটনায় শুধু আমার চিন্তিত নই, দেশের সকলের জন্য চিন্তার।


এ ঘটনা নিয়ে ফয়সাল আরেফিন দীপনের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বিবার্তাকে বলেন, এইসব বিচারে দীর্ঘ সময় চলে যায়। নিম্ন আদালতে বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর উচ্চ আদালতে যায়। এবং তা হাইকোর্টে দীর্ঘসময় পরে থাকে। হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দিতে দেরি করে। মামলার রায় হওয়ার পরও প্রায় দুই বছর চলে গেছে। এরকম দীর্ঘসময় যদি লাগেই বিচারের রায় কার্যকর হতে অথবা চূড়ান্ত হতে। তাহলে তো এদের মাধ্যমে আইনের শাসনের ক্ষেত্রে কোনো উন্নতি সম্ভব নয়।


আবুল কাসেম ফজলুল হক আরো বলেন, আরও দ্রুত সময়ে বিচার সম্পন্ন করা উচিত। সকলের মঙ্গলের জন্য আইনের শাসন দরকার। আর দীপনকে হত্যা করার ফলে আমরা পারিবারিকভাবে যে ক্ষতির শিকার হয়েছি এর তো কোনো প্রতিকার নাই। আমরা দেশে শান্তি চাই, আইনের শাসন চাই। দেশের আইন-কানুন, বিচারিক ব্যবস্থা উন্নত করা দরকার। এটার যারা কর্তৃপক্ষ আছে তাদের ঠিক করতে হবে।


স্বাধীনতার স্বপক্ষের সংগঠন গৌরব ৭১' এর সাধারণ সম্পাদক এফ এম শাহীন বিবার্তাকে বলেন, বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। আমরা নানাভাবে জানলাম যে, কিভাবে পুলিশকে আক্রমন করে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। এটি আমাদের কাছে পরিস্কার এবং যতটুকু বুঝেছি, এই ঘটনার সাথে পুলিশের একটি মহল জড়িত- কারাগার কর্তৃপক্ষসহ যারা ডিউটিতে ছিল। ইতোমধ্যে পাঁচজনকে বহিষ্কারও করেছে পুলিশ। আমরা এর সঠিক তদন্ত চাই। কারাগারের ভেতরে থেকেও কিভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় কারা এদের সাথে যোগাযোগ করে দিতে সহযোগিতা করেছে? কারা কারা জড়িত- এসব তদন্ত করে বের করা উচিত। এই রাষ্ট্রে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জামাত-বিএনপি জোট আমলে দেখেছি। মনেহয় নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি পক্ষ দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। আমরা নানা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র দেখেছি। সেই ষড়যন্ত্রের সফল বাস্তবায়নের জন্য তারা বাংলাদেশেকে বেছে নিতে চায়। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের যে উত্থান দেখলাম- নিশ্চয় তা জাতির পিতার কাঙ্খিত বাংলাদেশ না, ৩০ লক্ষ শহিদের বাংলাদেশ না। যে অসম্প্রদায়িক, ধর্ম নিরোপক্ষ বাংলাদেশ আমরা চেয়েছি, তার সাথে কোনোভাবেই জঙ্গিবাদ শব্দটি যায় না। এই জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতেই হবে। প্রশাসনের যে ভূতগুলো আছে, যারা জঙ্গিবাদকে মদদ দিচ্ছে- তাদেরকে খুঁজে বের করে দ্রুত চিহ্নিত না করতে পারলে আমার মনে হয় সরকারের জন্য বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।


এফ এম শাহীন আরো বলেন, আপনি যদি শেকড় খুঁজতে যান, দেখবেন জঙ্গিবাদের শেকড় কোথায়। বাংলাভাই থেকে শুরু করে আমরা দেখেছি বিএনপি-জামায়াতের প্রত্যক্ষ, আর্থিক, রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় কিভাবে গ্রেনেড হামলা হয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার উপর। কীভাবে হত্যা করা হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের, কীভাবে সাম্প্রদায়িক হামলা করা হয়েছে। কারা এই রাষ্ট্রকে অকার্যকর রাষ্ট্র বানাতে চায়, সেই পক্ষটি পুরোপুরি চিহ্নিত। কিন্তু বিগত ১৪ বছর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেও তাদের নির্মূল করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।



মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি আসামি ছিনতাই বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমপি বিবার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অবস্থান তো আছেই। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে সারাদেশে যেভাবে জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল, বিশেষ করে হাওয়া ভবন থেকে তারেক রহমান বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল। তাদের কারণেই আজ দেশে জঙ্গিবাদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জঙ্গিবাদ দমন করা হয়েছে, কিন্তু নির্মূল করা যায়নি। যারা (জঙ্গি) এখনো আছে, তারা আবার হয়তো বিএনপি-জামায়াতের উসকানি, মদদে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। যার ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় জঙ্গিদের কোনো গ্রুপ বা অন্য রাজনৈতিক দলের মদদ, যোগসূত্র আছে কি-না সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।



গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সাথে কথা হয় বিবার্তার। আদালত প্রাঙ্গণ থেকে আসামি ছিনতাই নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি তো উল্টোভাবে দেখি, এই বিচারটাই প্রশ্নবিদ্ধ। কাদের মোল্লার বিচারটা দেখুন, সেটা অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ বিচার ছিল। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচারটা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এবং এসব কারণে বিচার যখন অবিচার হয়ে যায়, তখন মানুষের মধ্যে একটা ক্ষোভ জন্মায়। এরকম অন্যায় অবিচারের বিচার চাওয়া যায় না। যার কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। এটা এখনো রায়হীন।


আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বলছেন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি-জামায়াত মাঠে নেমেছে এ ঘটনার সাথে তারা সম্পৃক্ত এমন প্রশ্নের উত্তরে জাফরুল্লাহ বলেন, এসব পাগলামির কোনো উৎস নেই। আসামীকে কোর্ট থেকে ছিনিয়ে নেওয়া তো সরকারের বড় ব্যর্থতা। অন্ততপক্ষে এটা খেয়াল রাখতে হবে, এই বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা নাই। আমি অন্য একটা উদাহারণ দিচ্ছি, আমরা দশ বছর ধরে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করছি। আজকেও ভর্তি ছিল ১১০ জনের। কোনো কারণ না দেখিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এটাকে কেঁটে ৫০ জন করেছে। বহু অনুনয়-বিনয় করে কাজ না হবার পরে আমরা কোর্টে যাই, কোর্ট আমাদের পক্ষে রায় দেন। এবং বলেছে এই ছিট কাঁটার কোনো যুক্তি নাই। কিন্তু আজকে পাঁচ মাস হয়ে গেছে, হাইকোর্ট এই রায়কে এখনও পর্যন্ত কার্যকর না করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এখানে সরকারি প্রতিষ্ঠানই সরকারের আদেশ মানে না। সুতরাং, সেখানে এই জাতীয় ঘটনা অনাকাংখিত হলেও এমন ঘটনা ঘটবেই।


ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এর মিডিয়া ও পাবলিক রিলেশন বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. ফারুক হোসেনের সাথে কথা হয় বিবার্তার। তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি যারা আছে সবাইকে ডাণ্ডা-বেড়ি পড়ানো থাকে।


আদালত প্রাঙ্গণ থেকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিনতাইয়ের সময় আসামিদের নিরাপত্তায় ডাণ্ডা-বেড়ি পড়ানো হয়নি কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে উপ-কমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, ডাণ্ডা-বেড়ি পরানোর বিষয়টি আমাদের না, কারা কর্তৃপক্ষের। কারা কর্তৃপক্ষকে ডাণ্ডা-বেড়ি পড়ানোর আদেশ আছে। হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী তারা পড়িয়ে দিবে, আমরা নিয়ে আসব।


আদালত প্রাঙ্গণ থেকে জঙ্গি ছিনতাই কিভাবে সম্ভব এমন প্রশ্নের উত্তরে মো. ফারুক হোসেন বলেন, এটা সম্ভব বলেই তো ঘটনা ঘটেছে। তারা দীর্ঘদিন থেকে পরিকল্পনা করছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা সাকসেস হয়েছে।


উপ-কমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, প্রতি বছর আমরা প্রায় এক লক্ষ আসামি হ্যান্ডেল করি। ডিএমপির প্রতিষ্ঠা ১৯৭৬ সাল। প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছরে কী একটি ঘটনা ঘটছে। এগুলো কাউন্ট করলে আপনি যদি শতকরা হিসাব করেন, দেখবেন তা ০০০.০১% ও-না। জঙ্গি ছিনতাইয়ের সাথে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।


এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বিবার্তাকে বলেন, আপনি যদি সিরিয়াসলি কল্পনা করেন আমাদের দেশে ক্রিমিনাল জাস্টিজ সিস্টেমটা আছে নাগরিক ও পুলিশকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে ক্রিমিনাল জাস্টিজ রিফর্ম না হওয়াতে আমরা দীর্ঘদিন একটা ট্র্যাডিশনাল সিস্টেমের মধ্যে চলছি। অর্থাৎ একটা প্রাতিষ্ঠানিকরণ যেটাকে বলি, সেই প্রাতিষ্ঠানিকরণটা আমাদের এসব প্রাতিষ্ঠানে হয়ে ওঠে নাই। একটা খুনের আসামি তাকে যখন আদালতে আনা নেয়া করা হয়, তখন তার যে পর্যাপ্ত প্রটোকল দরকার, সেই প্রটোকলটা এক্ষেত্রে মানা হয় নাই কোনো ভাবেই। এটা আসলে আমাদের পুরো কালচারের মধ্যে আছে।


তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী চলতে দেই না বলেই এই ঘটনার ক্ষেত্রে আসামিদের আনা হয়েছে সামান্য কিছু প্রটোকল মেনে। যেখানে তাদের সিকিউরিটি ইনসিউর করে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম যে, খুবই তাচ্ছিল্য করে খুনের আসামিদের আদালতে আনা হয়। চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের আসামিদের যেভাবে আদালতে আনা হয়েছে, নেয়া হয়েছে, সেই তুলনায় এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আর এই প্র্যাকটিসটার ক্ষেত্রে আপনি যদি কোর্টের কথা বলেন- কোর্টে মানুষ কিভাবে যায়-আসে? পৃথিবীর কয়টা জায়গায় এধরনের মানুষ একেবারে এভাবে যায়! যেকোনো সময় একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে।


এই অপরাধ বিজ্ঞানী বলেন, দেশে একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে, তারপর আমাদের টনক নড়ে। এটি এজন্য বলছি যে, কোনো একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমরা উদ্যোগ নেই, কিন্তু আগে থেকে সতর্ক থাকি না। এর আগেও কিন্তু ত্রিশাল এমন ঘটনা ঘটেছিল। সেখান থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারতাম। কিন্তু আমরা সেখান থেকে আমরা শিক্ষা নেইনি। তার মানে হচ্ছে, আমাদের প্রতিটা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে ক্রিমিনাল জাস্টিজ সিস্টেমের যে প্রতিষ্ঠানগুলো আছে অর্থাৎ প্রধান এজেন্সি, কোর্ট, প্রিজন এবং পুলিশ। এই প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার সাথে নিয়ম-কানুন এবং তার ‌‌‍রোল অফ ল' যেভাবে মেনে চলা দরকার, সেইভাবে যদি আমরা সাজাই তাহলে ভবিৎষতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না।