ইন্টারপোল, এফবিআই তদন্ত করলে আমার সমস্যা নেই: সামিরা

Interpol, FBI, Investigation, Sameera,
ad

বিনোদন ডেস্ক: সালমান শাহর মৃত্যুর দীর্ঘ ২১ বছর পেরিয়ে গেলেও কখনো প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি তার স্ত্রী সামিরা। শেষ পর্যন্ত নীরবতা ভেঙে সামিরা বললেন, সালমান খুন হয়নি, আত্মহত্যা করেছে। সালমানের মায়ের বারবার ইন্টারপোল, এফবিআইয়ের তদন্ত চাওয়া প্রসঙ্গে সামিরা বলেন, আমার কোনো সমস্যা নেই। আমিও চাই তারা আসুক। আমি যা বলছি সেটাই প্রমাণ হবে।

রবিবার (১৩ আগস্ট) রাতে গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাতকারের তিনি এসব কথা বলেন।

সামিরা বলেন, ইমনের (সালমান শাহ) কথা ভেবেই আমি কোথাও মুখ খুলিনি। আমাকে যেসব অপবাদ দেয়া হয়েছে সেসব নিয়ে রিঅ্যাক্ট করিনি। কারণ আমার যেখানে কথা বলার দরকার সেখানে আমি কথা বলেছি।

তিনি জানান, বারবার তদন্ত হয়েছে সালমানের মৃত্যু রহস্য নিয়ে। আমাকে তলব করা হয়েছে। আমি গোয়েন্দা, পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে জবানবন্দি দিয়েছি। যখন যে যা জিজ্ঞেস করেছে আমি তার জবাব দিয়েছি। আমার যেখানে যেখানে যেটা ক্লিয়ার করার আমি করে যাচ্ছি। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ক্লিয়ার করেই যাচ্ছি।

তিনি বলেন, এই মামলার সঠিক তদন্ত আমিও চেয়ে এসেছি। স্বামী খুনের অপবাদ আমি বয়ে বেড়াতে চাই না। সালমান সেই স্বামী যিনি আমার একটু সুখের জন্য কতো পাগলামী করেছেন। আমিও তাকে প্রাণের মতো ভালোবেসেছি। সেই সময় যারা সালমানের কাছের মানুষ ছিলেন তারা সবাই জানেন এসব। আমাকে সালমানের মা ব্যক্তি আক্রোশ থেকে খুনের আসামী বলছেন।

সামিরা আরও বলেন, আমি জানি ইমন আত্মহত্যাই করেছে। সেদিন আমাদের বাসায় বাইরে থেকে কেউ আসেওনি, কেউ বেরও হয়নি। অনেক মানসিক প্রেসারে ছিল সেই সময় ইমন। সে এমন কিছু করে বসবে ভাবনাতেও ছিল না। আমার কথাগুলো সালমান শাহর ভক্তদের মানতে কষ্ট হবে। কিন্তু এটাই সত্যি। আমারও কষ্ট হয়। যার হাত ধরে বাবা, মা পরিবার ছেড়ে চলে এসেছিলাম তাকে হারিয়েছি ভাবতে। আজও ইমনের (সালমান) বিকল্প কেউ নেই আমার মনে। বেঁচে আছি, বেঁচে থাকতে হয়।

সালমানের ভক্তদের উদ্দেশ্যে সামিরা বলেন, ইমনের মায়ের ভুল কথায় বিভ্রান্ত হয়ে, আবেগতাড়িত হয়ে তার ভক্তরা আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলেন, বাজে ধারণা করেন। কিন্তু কারোর ওপর আমার কোনো রাগ নেই, কষ্ট নেই। প্রথম থেকেই তারা সালমান শাহকে ভালোবাসেন।

সাম্প্রতিক সময়ে রুবির বক্তব্যের বিষয়ে সামিরা বলেন, রুবি যেসব কথা বলছেন তার কোনো ভিত্তি নেই। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। এটিও রেজভীর মতো সালমানের মায়ের কোনো সাজানো পরিকল্পনা হতে পারে। এসব কথা প্রেসের কাছে বলতেও আমার সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমি নিজেই ইচ্ছে করে প্রেসে আসতে চাইনি।

প্রেসে আসতে না চাওয়া প্রসঙ্গে সামিরা বলেন, আমার জনপ্রিয়তার লাইফটা শুরু হয়েছিল প্রেসকে দিয়ে ইমনের হাত ধরে। ইমন যখন ছিল না আমি আর এই জীবনটা চাইনি। তাকে ছাড়া আমি আর এই প্রেসের মুখোমুখি হতে চাইনি। সবকিছু থেকে বের হয়ে এসে আমি একটা নর্মাল লাইফ চেয়েছি। নর্মাল লাইফ বলতে বাবা মায়ের সঙ্গে থাকা।

তিনি আরও বলেন, সালমানের আত্মহত্যার পর তিনটা বছর একা একা কাটালাম। একটা সময় আমি ভেবেছি বিদেশ চলে যাবো পড়াশোনা করতে। সেটা আর হয়নি। আমি ইমনের মৃত্যু মানতে পারছিলাম না। তার স্মৃতি নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাইলাম। তখন খুব প্রয়োজন বোধ করলাম যদি একটি সন্তান আমাদের থাকত!

নিজের দ্বিতীয় বিয়ে প্রসঙ্গে সামিরা জানান, একটা সময় ইমনেরই বন্ধু মোস্তাক ওয়াইজ আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল। আমি তাকে ফিরিয়ে দেই। পরে তার পরিবার ও আমার পরিবারের প্রচেষ্টায় বিয়েটা হয়। আমি এখন ভালো আছি। এখানে আমার তিনটি সন্তান রয়েছে। বড় ছেলে মালয়েশিয়াতে থাকে। তারপর আরও দুটি মেয়ে রয়েছে আমার। তারা ঢাকার একটি স্কুলে পড়াশোনা করছে।

সালমান শাহর মায়ের সমালোচনা করে সামিরা বলেন, আমার ইমন (সালমান শাহ) যতদিন বেঁচে ছিল আমার শাশুড়ি কি সে সময় বোবা ছিলেন? কেন ইমন নিজে বলেনি? আমাকে নিয়ে কারোর কাছে কোনো অভিযোগ করেনি? কারণ সত্যিটা হলো আমার কোনো দোষ ছিল না। ইমন ওর মাকে পছন্দ করত না। এটা ইমনের পরিবার, খালা-মামা ও তাদের বাচ্চারা জানত। ফিল্মের লোকেরাও জানত।

সামিরা বলেন, সালমানের মা কারাগারে ছিলো কিছুদিন। ইমন দেখতে যেত না। আমিই জোর করে পাঠিয়েছি। এসব কথা নীলা চৌধুরী কী করে ভুলে যান। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি তার পাশে থাকতে। কিন্তু তিনি দজ্জাল শাশুড়িই হতে চেয়েছেন। যার কাছে নিজের ছেলে ভালোবাসা বঞ্চিত, তার কাছে ছেলের বউয়ের ভালোবাসা আশা করা যায় না। এসব কথা বলতে গেলে আমি অনেক আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। আমার উপর দিয়ে অনেক ঝড় যাচ্ছে। আমিও চাই আসল সত্যটা বের হোক। তাহলে আমি শান্তি পাব।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, যতোদিন আমার এই পক্ষের শাশুড়ি বেঁচে ছিলেন আমার পুরনো শাশুড়ি কিন্তু চিৎকার চেঁচামেচি করেননি। অনেকদিন তিনি এসব নিয়ে কিছু বলতেন না। কারণ ইমনের মাকে আমার শাশুড়ি হাড়ে হাড়ে চিনতেন। তারা প্রতিবেশি ছিলো। যখনই আমার শাশুড়ি মারা গেলেন তিনি আমাকে নিয়ে নানা রকম ব্লেম দিতে শুরু করলেন নতুন করে। আমার সন্তানদের, আমার স্বামীর, আমার বাবা, মা, বোন ও তাদের পরিবারের যদি কোনো ক্ষতি হয় তবে তার দায় নীলা চৌধুরীকে নিতে হবে।

তার মিথ্যে কথার ফুলঝুড়িতে সালমান ভক্তরা আবেগের বশে আমাকে নিয়ে নানা বাজে কথা ছড়াচ্ছেন। আমার বোনদের ছবি দিয়ে বলা হচ্ছে এটা আমি। আমার বোনদের সন্তানদের দেখিয়ে বলা হচ্ছে আমার সন্তান। এদের কারো কিছু হলে দায়ী হবেন নীলা চৌধুরী। ওর মাকে নিয়ে সবসময়ই ও মানসিক চাপে ভুগতো। অনেক কষ্ট নিয়ে সে আলাদা হয়েছিল মায়ের কাছ থেকে।

সালমানের মৃত্যুর পর সালমানের মা নীলা চৌধুরীর বরাতে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল, বেশ কয়জন পুরুষের সঙ্গে পরকীয়ার সম্পর্ক ছিলো সামিরার। তাদের মধ্যে অভিনেতা ডন, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ আরও কিছু নাম এসেছে। বলা হয়েছে সামিরার বর্তমান স্বামীর সঙ্গেও তার পরকীয়া ছিল।

পরকিয়া থাকার বিষয় অস্বীকার করে সামিরা বলেন, পুত্র হারানোর শোককে কাজে লাগিয়ে সালমানের জনপ্রিয়তাকে হাতিয়ার বানিয়েছেন তিনি। শুরু থেকেই আমাকে খুনী হিসেবে সবার কাছে প্রমাণ করতে তিনি নোংরা কিছু অপপ্রচার চালিয়েছেন। তারমধ্যে একটি আমি একাধিক লোকের সঙ্গে পরকীয়া করেছি। তারমধ্যে তিনি ডনের নাম ছড়িয়েছেন। অথচ তিনি নিজেও জানেন এবং বিশ্বাস করেন যে ডন ছিলো আমার ছোট ভাইয়ের মতো।

ডনের সঙ্গে সালমানের সখ্যতা নিয়ে সামিরা বলেন, একটু ঘাঁটলেই বুঝা যাবে ডনকে কতোটা পছন্দ করত সালমান। ওর সব ছবিতেই ডনকে নেয়ার জন্য পরিচালকদের বলত সে। অসংখ্য স্টিল ছবিতে ডনকে সে নিজে ডেকে এনে দাঁড় করিয়েছে। বন্ধুর মতো মিশলেও ডন সালমানকে সম্মান করতো। আমাকে ভাবি বলে ডাকতো। আমি তাকে ছোটভাইয়ের মতোই দেখতাম। আর আজ সেই ডন ও আমাকে জড়িয়ে বিব্রতকর একটা গল্প ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

সামিরা জানান, ডনের সঙ্গে আমার যেসব ছবি প্রকাশ করা হয়েছে সবই ফটোশপ। এইসব ছবি নিয়েও তদন্ত হয়েছে। সব মিথ্যে প্রমাণ হয়েছে। যে ছবিটাতে ডন বসা আর আমি ম্যাগাজিন দেখছি সেইটা সালমান নিজেই তুলে দিয়েছিল।

পাশাপাশি কথা উঠেছে আমার বর্তমান স্বামীর সঙ্গেও নাকি আমার পরকীয়া ছিল। একেবারেই হাস্যকর ব্যাপার । আমার স্বামী মোস্তাক ছিল সালমানের ছোটবেলার খুবই ক্লোজ ফ্রেন্ড। একসাথে তারা একই এলাকায় বেড়ে উঠেছে। পড়াশোনা করেছে। সালমান নিজেই ওর সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সালমান যখন ফিল্মে ব্যস্ত হয়ে উঠলো তখন আর ওর সঙ্গে আমাদের দেখা হত না। সালমানের মৃত্যুর এক বছর পর সালমানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে মোস্তাকের সঙ্গে আমার নতুন করে আলাপ হয়।

এই সমাজে একটি ২২-২৩ বছরের মেয়ের বৈধব্য তার বাবা মা মেনে নেয় না। সবাই চায় তাদের মেয়ে আনন্দে বাঁচুক। আমার বাবা-মাও চেয়েছে। এটা দোষের নয়। এজন্য মোস্তাককে দোষারোপ করাটা অন্যায়।

মোস্তাক ও সালমানের অনেক বন্ধু এখনো বেঁচে আছে। আঁখি আলমগীর তাদের খুব ভালো বন্ধু ছিলো। আগুনও তো সালমানের ভালো বন্ধু। তাদের কাছ থেকে তথ্য নিলেই সব সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। মোস্তাক সালমানের বন্ধু। তারই মতো সেও উদার আর বড় মনের বলেই একটি বিধবা মেয়েকে যে কী না স্বামী খুনের জন্য দেশজুড়ে সমালোচিত, তাকে বিয়ে করেছে। আমি ওর কাছে কৃতজ্ঞ।

তারচেয়েও বেশি কৃতজ্ঞ সে কোনোদিন আমাকে খোঁটা দেয়নি অন্যের স্ত্রী ছিলাম বলে। বরং তার বন্ধুর প্রতি সে শ্রদ্ধাশীল। তার কাছ থেকেও সালমানের অনেক অজানা কথা আমি শুনেছি। প্রতি বছর সালমানের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে সে আমাকে খুশি করার জন্য মিলাদের আয়োজন করে। সে খুব ভালো করেই জানে, সালমানের স্ত্রীর পরিচয় আমি আজও ভুলিনি। সেই ভালোবাসাও কমেনি।

আজিজ মোহাম্মদ ভাই সম্পর্কে তিনি জানান, তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক কোনোদিনই ছিল না। সালমানসহ তাকে মাত্র একবার দেখেছিলাম আমি। সালমান খুন হয়েছে এই গল্পকে টুইস্ট দিতেই এই লোকের নাম এখানে জড়ানো হয়েছে, আর কিছুই নয়।

তিনি জানান, ফিল্মের অনেকেই জানেন, আমি সালমানের শুটিংয়ের সময় অধিকাংশ দিন তার সঙ্গে থাকতাম। আউটডোর, ইনডোর- সবখানেই আমি সালমানের সঙ্গী হয়েছি। এক পরকীয়া করার সময়টা কোথায় পেলাম?

সালমানের বাবা প্রসঙ্গে সামিরা বলেন, সালমান বেঁচে থাকতে ও পরে আমার শ্বশুর (সালমানের বাবা) তো কোনোদিন এই বিষয়ে একটা কথাও বলেননি যে তার ছেলের বউ খারাপ। তিনি নিজেই ছেলের মৃত্যুর পর লাশের সুরতহালের সাক্ষী। নিজে দুইবার সালমানের পোস্টমর্টেম করিয়েছেন। তেমন কিছু পেলে তিনি নিশ্চয়ই প্রমাণ হিসেবে দেখাতেন। ছেলে কি শুধু সালমানের মায়েরই গেছে, বাবার যায়নি? তার তো আরেকটা ছেলে ছিল। আমার তো আর একটা সালমান ছিল না। স্বামীকে হারানোর শোকের ওপর এই মহিলা স্বামী খুনের দায় আমার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

সামিরা আরও জানান, সবাই ২১ বছর ধরে একপেশে কথা শুনে তাই বিশ্বাস করেছেন। কিন্তু সবার জানা উচিত সালমানের সঙ্গে তার মায়ের সম্পর্কটা কেমন ছিল। একটু খোঁজ খবর করলেই সেগুলো তারা জানতে পারবে। প্রতি মাসে মাকে ৭০ হাজার টাকা দিতো সালমান। এক মাসে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে সরি বলেছিল। সেই টাকা নীলা চৌধুরী সালমানের মুখে ছুঁড়ে মেরেছিল। সালমান কাঁদতে কাঁদতে আমার হাত ধরে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিল।

সামিরা দাবি করেন, ঝগড়া কোন সংসারে না হয়? কিন্তু মিটমাটও হয়। সালমান আমার গায়ে হাতও তুলেছে এই নীলা চৌধুরীর জন্যই। তবু আমরা নিজেদের ঝামেলা মিটমাট করে নিয়েছি। সুখী হবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সালমানের আবেগ প্রবণতা ওকে গ্রাস করেছে।

সামিরা আরও বলেন, আল্লাহর কাছে আমি বিচার দিয়ে রাখলাম, মা হয়ে ছেলেকে এভাবে ছোট করার শাস্তি তিনি যেন পান। ছেলের বউয়ের নামে তিনি মিথ্যাচার করেই চলেছেন। সালমান বেঁচে থাকতে তাকে একদন্ড শান্তি দেননি নীলা চৌধুরী। সে খুব ভালো করেই জানে, সালমানের স্ত্রীর পরিচয় আমি আজও ভুলিনি। সেই ভালোবাসাও কমেনি। বন্ধু হয়ে সালমানের প্রতি মোস্তাকের যে টান ও ভালোবাসা আমি দেখেছি সালমানের মায়েরও সেটা আর অবশিষ্ট নেই বলে মনে করি। তিনি ছেলের মৃত্যুকে পণ্য বানিয়ে ফেলেছেন। উনার তো উচিত ছেলের জন্য দোয়া করা।

ad