নড়াইলে শুভ্রা মূখার্জী মেমোরিয়াল হাসপাতাল নির্মাণের নামে জমি দখলের অভিযোগ

Narail-Photo-
ad

এফ এম শাহীন: নড়াইলে শুভ্রা মূখার্জী মেমোরিয়াল হাসপাতাল নির্মাণের নামে অন্যের জমি জবর-দখলসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বেঙ্গল গ্রুপের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন জমির মালিককে ক্ষতিপূরণ না দিয়েই জমি দখল করে রাখা হয়েছে। আবার কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, পরে টাকা দেওয়ার কথা বলে জমি লিখে নেয়া হলেও এখনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। আবার এক জমির মালিককে না জানিয়ে তার জমি দখল করা হয়েছে।

এছাড়া, হিন্দু অধ্যুষিত এ এলাকার নিরীহ জমির মালিকদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে এবং নামমাত্র মূল্য দিয়ে হাসপাতালের জমি কেনা হচ্ছে। বর্তমানে হাসপাতালের জন্য ৪ একর জমি ক্রয় করা হলেও কমপক্ষে ৮ একর জমি দখল করে রাখা হয়েছে।

সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে একটি সন্ত্রাসী চক্র এ কাজের সাথে যুক্ত থাকায় ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। সম্প্রতি এ হাসপাতালের জমি ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ করায় এ চক্রটি নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ তিন জনকে মারধর করেছে।

ভারতের রাষ্ট্রপতির সহধর্মিনী নড়াইলের মেয়ে প্রয়াত শুভ্রা মূখার্জীর নামে ‘শুভ্রা মূখার্জী মেমোরিয়াল হাসপাতাল’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নড়াইলের শুভ্রা মূখার্জী ফাউন্ডেশনকে বাদ রেখেই এ হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এদিকে ঢাকা থেকে ‘শুভ্রা মূখার্জী ট্রাস্টি বোর্ড’ নামে একটি বোর্ডের উদ্যোগে এ হাসপাতাল নির্মাণের কথা থাকলেও ‘শুভ্রা মুখার্জী ফাউন্ডেশন’ এবং জেলা প্রশাসনকে অনেকটা অন্ধকারে রেখেই নির্মাণ কাজটি করা হচ্ছে। এমনকি জমির দলিল করা হচ্ছে বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান মোর্শেদ আলমের নামে। এলাকাবাসীর প্রশ্ন এখানে কি আদৌ হাসপাতাল নির্মিত হবে ?

Narailজানাগেছে, এ বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে শুভ্রা মূখার্জী ট্রাষ্টি বোর্ডের নামে একটি টিম নড়াইল শহর থেকে ৩ কি. মি. পশ্চিমে মুলিয়া ইউনিয়নের বাঁশভিটা এলাকায় নড়াইল-যশোর আঞ্চলিক মহাসড়কের সাথে লাগোয়া একটি স্থানে শুভ্রা মূখার্জী মেমোরিয়াল হাসপাতালের স্থান পরিদর্শন করতে আসেন। জানানো হয়, এখানে ২০ বিঘা জমির ওপর ৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, ট্রাষ্টি বোর্ডের সদস্য বেঙ্গল গ্রুপ ও আর টিভির ভাইস-চেয়ারম্যান মো. জসিমউদ্দিন, শারমিন গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর  মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন, ল্যাবিব গ্রুপের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন আলমগীর (সিআইপি) ও সাবেক সচিব ও মুক্তিযোদ্ধা মো. মোসা প্রমুখ।

এর কয়েকদিন পর থেকেই এখানে হাসপাতালের ডিজিটাল সাইনবোর্ড দিয়ে শুরু হয় হাসপাতাল নির্মাণের নামে জমি ক্রয়, মাটি ও বালি ভরাটের কাজ। কিন্তু শুরু থেকেই চিত্রা কনষ্ট্রাকশন ফার্মের নামে একটি চক্র স্থানীয় জমির মালিকরা জমি বিক্রি করতে না চাইলেও তাদের জমি জবর-দখল, ভয়ভীতি ও কম মূল্যে নিয়ে কয়েকগুন বেশী মূল্যে জমি দলিল করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অবৈধ কাজে সাহায্য করার জন্য মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী কয়েক ব্যক্তিকে এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাথে রাখা হয়েছে সাংবাদিকতার নামে জড়িত কয়েক ব্যক্তি; যাদের দায়িত্ব কোন অপকর্মের সংবাদ যেন প্রকাশিত না হয়। সে জন্য তাদের উপঢৌকনসহ নগদ নারায়নে তুষ্ট করা হয়েছে।

জানাগেছে, বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান মোর্শেদ আলমের নামে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ২১টি দলিলের মাধ্যমে ৪ একর ধানী জমির দলিল করা হয়েছে। নড়াইল সদরের সাব-রেজিস্ট্রার সুব্রত কুমার সিংহ এসব দলিল সম্পন্ন করেন। দলিল লেখক ছিলেন খোকন চন্দ্র রায় (লাইসেন্স নং-৪১)। এসব কাজে সার্বক্ষণিক সাহায্য করছে কথিত চিত্রা কনস্ট্রাকশনের পরিচালক ও জমি এজেন্ট খন্দকার এজাজুল হাসান বাবু। অভিযোগ রয়েছে, সে একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ছাত্রদল নেতা। বিগত ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে সে নড়াইলে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল। সম্প্রতি শুভ্র মুখার্জী মেমোরিয়াল হাসপাতাল নির্মাণের সাথে যুক্ত হয়ে ক্ষমতাসীন দলের একটি অংশকে ম্যানেজ করে অপরাধমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে।

নড়াইল পৌরসভার দক্ষিণ নড়াইল এলাকার এবিএম কামরুল আহসান নামে এক জমির মালিক জেলা প্রশাসকের নিকট লিখিত অভিযোগে জানান, বেঙ্গল গ্রুপ নামে একটি প্রতিষ্ঠান মুলিয়া ইউনিয়নের ৬৬ নং বাঁশভিটা মৌজায় নির্মাণাধীন হাসপাতালের সাথে লাগোয়া হাল ৭৯, ৮০ ও ৮১ এই তিনটি দাগে তার নিজ নামের ৮২ শতক ধানী জমিতে বালি ভরাট করছে। বিষয়টি জানার পর অবাক ও বিস্মিত হই। পরে আমার জমি ফেরত পেতে ৪ এপ্রিল ঢাকাস্থ ৭৫ গুলশান এভিনিউ ঢাকার বেঙ্গল গ্রুপের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার সাথে দেখা করে কথা বলেছি। তারা বিষয়টি সুরাহার আশ্বাস দিলেও এখনও পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি।

Narail-Pবাঁশভিটা গ্রামের তোরাব আলী (৪৫) জানান, নির্মিতব্য হাসপাতাল এলাকায় তার বসত ভিটাসহ ৯ শতক জমি রয়েছে। তিনি জায়গা বিক্রি করবেন না বললেও হাসপাতাল নির্মাণের নামে বাবু, বাবুল আক্তার ও স্থানীয় মুলিয়া ইউনিয়নের মেম্বর পলাশ মালাকার ৯ শতক জমির ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে জোরপূর্বক জমির দলিল নিয়ে গেছে। তিনি এ জমি ফেরত চাইলে দালালরা জমি লিখে দিতে চাপ প্রয়োগ করছে।

বাঁশভিটা গ্রামের সুজয় বিশ্বাস জানান, আমার ৪২ শতক জায়গা হাসপাতালের বাউন্ডারির মধ্যে পড়েছে। সাড়ে ১৫ হাজার টাকা করে শতক ঠিক হয়েছে। এখনও জমির মূল্য পাইনি।

নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মনিরুজ্জামান রোজ ও সাধারণ সম্পাদক পলাশ আহসান জানান,  নির্মণাধীন শুভ্রা মূখার্জী মেমোরিয়াল হাসপাতালের জমি ক্রয়ে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ পেয়ে বেঙ্গল গ্রুপের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্তের জন্য ২৪ মে নড়াইলে নির্মাণাধীন হাসপাতাল এলাকায় আসে। ওই দিন বেলা ১১টার দিকে এই টিমের এক সদস্য জনাব নুরুজ্জামানের কাছে জমি ক্রয়ে অনিয়মের বিষয়টি অবগত করার জন্য ছাত্রলীগের ৮জন নেতা-কর্মী সেখানে যাই। এ সময় জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার সানি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সদস্য ইজাজুল হাসান বাবুর নেতৃত্বে প্রায় ১০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী পিস্তলের বাট দিয়ে আমাদের রক্তাক্ত জখম করে এবং ছাত্রলীগ নেতা টিটোকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করে তার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।

 শুভ্রা মূখার্জী ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও প্রয়াত শুভ্রা মূখার্জীর আত্মীয় অয়ন রঞ্জন দাস বলেন, শুনেছি নড়াইলের মেয়ে প্রয়াত শুভ্রা মুখার্জীর নামে হাসপাতাল হবে। কিন্তু তা করতে গেলে অবশ্যই শুভ্রা মূখার্জী ফাউন্ডেশনকে অবহিত করা উচিত। কারা শুভ্রা মূখার্জী ট্রাষ্টি বোর্ডের সদস্য কারা এ হাসপাতাল নির্মাণ করছে তা আমরা কিছুই জানি না।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, হাসপাতাল হোক এটা আমরা চাই। তবে কারো জমি দখল করে টাকা না দিয়ে জমির প্রকৃত মালিককে বঞ্চিত করে অনিয়মের মাধ্যমে নয়। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়ম মেনেই হাসপাতাল করা হোক। বিষয়টি বেঙ্গল গ্রুপ কর্তৃপক্ষকেও খতিয়ে দেখার আহব্বান জানান তিনি।

জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মলয় কুমার কুন্ডু বলেন, একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে জমি দখল করে মালিককে টাকা না দিয়ে অস্ত্র দেখিয়ে জমি লিখে নিয়ে হাসপাতাল করা হবে এটি মেনে নেওয়া যায় না। এখানে হাসপাতাল হোক এটা আমরা নড়াইলবাসী চাই। তবে কোন সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে জমি দখল করে নয়।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কাজী মাহাবুবুর রশীদ জমি দখলের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি তদন্তের জন্য সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক মো. এমদাদুল হক চৌধুরী বিষয়টি সম্পর্কে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান।

এ ব্যাপারে বেঙ্গল গ্রুপের চেয়ারম্যান মোর্শেদ আলমের নম্বরে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ad