বন্দুকযুদ্ধে নিহত যুবক সাতক্ষীরার মুকুল, শরিফুল নয়

Mukul
ad

বিশেষ প্রতিনিধি: রাজধানীর খিলগাঁও থানা এলাকার মেরাদিয়ার বাঁশপট্টিতে গত শনিবার রাতে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত যুবক সাতক্ষীরার মুকুল, শরিফুল ওরফে হাদি- ১ নয়।

সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে এসে মুকুলের লাশ শনাক্ত করার পর জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে এ দাবি করেন নিহতের দুলাভাই হেদায়েতুল ইসলাম ও চাচাতো ভাই রহমত আলী। তারা বলেন, নিহতের নাম শরিফুল ওরফে হাদি নয়। সে মো. মুকল রানা, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র।

এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়েছে নিহত যুবক ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার প্রধান আসামী শরিফুল ওরফে হাদি-১।

DMP Listসোমবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিহতের দুলাভাই পরিচয় দিয়ে সাতক্ষীরার অধিবাসী হেদায়েতুল ইসলাম মুকুলের জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে জানান, নিহত যুবকের নাম শরিফুল নয়, তার মুকুল রানা। জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ১৯৯৩৮৭১৮২৫৪০০০০৬৮। এতে মুকুলের পিতার নাম মো. আবুল কালাম আজাদ এবং মায়ের নাম মোছা. ছকিনা লেখা রয়েছে। জন্ম তারিখ ১৯৯৩ সালের ২৫ নভেম্বর উল্লেখ রয়েছে।

হেদায়েতুল এ সময় বলেন, পত্রিকায় নিহত মুকুলের ছবি দেখে তারা সাতক্ষীরা থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন। মৃতদেহ দেখে মুকুলকে তারা চিনতে পেরেছেন। মুকুল সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলো। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে মুকুল ছিলো দ্বিতীয়। সাতক্ষীরায় মুকুলের বাবার ছোট চিংড়ির ঘেরের ব্যবসা রয়েছে। আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল না হওয়ায় এক বছর আগে সে ঢাকায় চলে আসে। তবে মুকুল উত্তরার কোথায় থাকতো, কী করতো বা কোনো জঙ্গী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলো কি না তা তিনি জানেন না বলে দাবী করেন।

গত রোববার বিকেলে খিলগাঁও থানার এসআই আল মামুন সুরতহাল রিপোর্টে নিহত যুবকের নাম শরিফুল ওরফে হাদি-১ বলে উল্লেখ করেন।

এদিকে নিহত তরুণের সুরতহাল রিপোর্ট করা হলেও নিহতের পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে বা জাতীয় পরিচয়পত্র অথবা অভিভাবক ছাড়া এই নামে মৃতদেহের সুরতহাল রিপোর্টে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইলিয়াস মেহেদী। এর ফলে অজ্ঞাতনামা (২৫) হিসেবে মৃতদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করার পর তা ঢামেক মর্গে রাখা হয়।

অপরদিকে, অভিজিৎ রায়ের বাবা অজয় রায় তার ছেলে অভিজিৎ রায় হত্যাকান্ডের প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্রসফায়ারে হত্যার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, কিছুদিন পূর্বে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বলেছিলেন অভিজিতের তিন হত্যাকারী দেশের বাইরে চলে গেছে। তারা যদি দেশের বাইরে চলে যায় তাহলে হঠাৎ করেই এই হত্যাকারী আবির্ভূত হলো কি করে?

তিনি আরো জানান, তার ছেলের হত্যাকারীদের বিচার হবে কীনা সে বিষয়ে তিনি ধীরে ধীরে আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। মানুষ আশা নিয়েই বেঁচে থাকে। তবে এভাবে যদি প্রকৃত হত্যাকারীরা ক্রসফায়ারের নামে নিহত হয় তো সেভাবে তো আর তদন্ত বিভাগের প্রতিও আস্থা রাখতে পারি না, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমের ওপরেও আস্থা রাখতে পারি না। এমনকি সরকারের ওপরেও ক্রমশ আস্থাটা ক্ষীণ হয়ে আসছে। অনেকগুলো হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত একজন প্রধান অভিযুক্ত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় বিচার বাঁধাগ্রস্ত হবে। যেকোনো ক্রসফায়ারের ঘটনা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং আদালত এই ধরণের মৃত্যুকে কোন সময় আইনিভাবে বৈধ বলে মনে করেন না বলে জানান তিনি।

গত রবিবার পুলিশ জানিয়েছিলো, খিলগাঁও থানা এলাকার মেরাদিয়া বাঁশপট্টি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্য শরিফুল ওরফে সাকিব ওরফে হাদি-১ নিহত হয়েছে। সে ছিলো সংগঠনটির সিপার সেলের অন্যতম কিলার। সে লেখক ও ব্লগার ড. অভিজিৎ রায় হত্যাকান্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিলো। তাকে ধরিয়ে দিতে ৫ লাখ টাকাও পুরস্কার ঘোষণা করেছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. দিদার আহাম্মদ দাবী করে বলেন, ‘নিহত শরিফুল বিভিন্ন নামে গোপনে সক্রিয় ছিলো। অভিজিৎসহ আরও ছয়টি খুনে সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিল সে।’ অভিজিৎ হত্যাকান্ডের তদন্তে সংগ্রহ করা সিসি টিভি ফুটেজে তাকে দেখা গেছে। বিভিন্ন সময় ব্লগার, প্রগতিশীল লেখক, প্রকাশক হত্যায় জড়িত সন্দেহভাজন হিসেবে যে ৬ জঙ্গীকে ধরিয়ে দিতে পুলিশ সম্প্রতি পুরস্কার ঘোষণা করেছিলো। ওই তালিকার মধ্যে শরিফুলের অবস্থান ছিলো দ্বিতীয়।

অপরদিকে জানা যায়, পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত যুবক শরিফুলের আসল নাম মুকুল রানা। তিনি চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন বলে দাবী করেছেন মুকুলের পিতা আবুল কালাম আজাদ।

আবুল কালাম জানান, স্কুল-কলেজের সনদে তার ছেলের নাম মুকুল রানা। স্থানীয় লোকজনও তাকে মুকুল রানা নামেই চেনে। তার বয়স ২৩ বছর। তিনি সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইংরেজি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলো। গত দুই বছর যাবত সে পড়াশোনা বাদ দিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলো। মুকুল রানা চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি যশোরের জগন্নাথপুরের মহুয়া আক্তার রিমিকে বিয়ে করে। এর এক দিন পর সাতক্ষীরার বাড়িতে গিয়েছিলো সে। এরপর আবার যশোরের শ্বশুরবাড়িতে যায়।

২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় যশোরের বসুন্দিয়া এলাকা থেকে তাকে সাদা পোষাকে থাকা কে বা কারা যেন তুলে নিয়ে যায়। এ ঘটনার ৩/৪ দিন পর যশোর কোতয়ালি থানায় মুকুল রানাকে তুলে নেয়ার ঘটনায় তার শ্যালক আমির হোসেন একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

তার ছেলে মুকুল ঢাকায় গিয়ে অন্য কোনো দলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলো কি না, তা তিনি জানেন না বলে জানান আবুল কালাম আজাদ।

ad