ময়মনসিংহে হকার্স সুপার মার্কেটে আগুন: ১৫০ দোকানি সর্বস্বান্ত

Mymensingh, Hawker's Super Market, Fire, 150 Shops, gone,
ad

স্থানীয় প্রতিনিধি: ময়মনসিংহ শহরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা গাঙ্গিনারপাড়ের হকার্স সুপার মার্কেটে পরপর দুই দফা অগ্নিকাণ্ডে মার্কেটের অভ্যন্তরে এবং তার আশপাশের ১৫০টির অধিক দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঈদের আগ মূহুর্তে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীর পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৭ জুন) সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে এ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় বলে নিশ্চিত করেছেন ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক শহিদুর রহমান।

ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট র‌্যাব, পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পৌনে ১০টার দিকে প্রথম দফায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও কিছু সময় পর আবারও আগুনের লেলিহান শিখা প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠে।

Mymensingh, Hawker's Super Market, Fire, 150 Shops, gone,

এক পর্যায়ে আগুন পাশের মসজিদ মার্কেটে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বেলা ৩টার দিকে আগুন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। ঘটনাস্থলের চারদিকে উঁচু দালান ও শহরে পানি সংকটের কারণে আগুন নেভাতে বিলম্ব হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়েছে বলে আগুন নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনকারী কর্মীরা জানিয়েছেন।

বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত এবং এতে সবমিলে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব নিয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৮ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের কথা বলা হয়েছে।

পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের মালিক ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালে মার্কেট থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয় স্থানীয়রা। খবর পেয়ে সকাল সোয়া সাতটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট এসে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। কিন্তু আশপাশে উঁচু দালান এবং পানি সংকটের কারণে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছিল না অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা।

Mymensingh, Hawker's Super Market, Fire, 150 Shops, gone,

ক্রমেই আগুনের ভয়াবহতা বাড়তে থাকে। এতে আশপাশের উপজেলা মুক্তাগাছা, ত্রিশাল, ঈশ্বরগঞ্জ, ফুলবাড়িয়াসহ ফায়ার সার্ভিসের মোট ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। শহরের পানির সংকট থাকায় বেশকিছু দূরে ব্রহ্মপুত্র নদী থেকে পানি এনে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালানো হয়।

বেশকিছু সময় পরে বিদ্যাময়ী সরকারি স্কুলের পুকুর থেকে পানি এনে আগুন নেভানোর কাজ করা হয়। দীর্ঘ সময় পর পৌনে ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে মার্কেটের দোকানের কর্মী ও মালিকেরা ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা দোকানগুলোর শাটার ভেঙে ভেতরে আগুন নেভানোর কাজ করেন।

কিছু সময় বিরতির পর আবারও আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে উঠে। এ সময় পাশের মসজিদ মার্কেটে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে প্রায় দুই ঘন্টা চেষ্টার পর আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে।

আগুন লাগার খবর পেয়ে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা ও তাদের অনেকের পরিবারের সদস্যরা ছুটে আসেন। এ সময় ব্যবসায়ীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

Mymensingh, Hawker's Super Market, Fire, 150 Shops, gone,

জজ মিয়া নামের একজন দোকান মালিক কাঁদতে কাঁদতে বলেন, মার্কেটে আমার একটা কাপড়ের দোকান। ঈদের জন্য আট লাখ টাকা ঋণ নিয়ে নতুন মালামাল এনেছি। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

হকার্স সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল হক বলেন, ঈদকে সামনে রেখে সব ব্যবসায়ীই দোকানে নতুন মালামাল এনেছিল। অনেকই টাকা ঋণ করে মালামাল আনে। আগুনে সবাই নিঃস্ব হয়ে গেছেন।

ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক শহীদুর রহমান বলেন, আগুন লাগার কারণ জানা যায়নি। এ ব্যাপারে তদন্ত করে বিস্তারিত জানানো হবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দেবার আশ্বাস দেয়া হয়।

ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার মাহফুজ জীবন গণমাধ্যমকে জানান, আগুনের খবর পাওয়ার পর পরই ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ছুটে যায়। শুরুতে চার ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে গেলেও পরে আরও ইউনিট বাড়ানো হয়।

হকার্স মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল হক গণমাধ্যমকে জানান, ওই মার্কেটে দেড় শতাধিক দোকান রয়েছে। এরমধ্যে, পোশাক, জুতা, গয়না, প্রসাধনী ছাড়াও বেশ কিছু দর্জির দোকান ছিল। লোক যারা ছিল তারা মাত্র ৪-৫টা দোকানের মাল বের করতে পেরেছে। বাকি সব পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।

Mymensingh, Hawker's Super Market, Fire, 150 Shops, gone,

ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রহমান জানান, ধারনা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে এ অগ্নিকন্ডের সূত্রপাত। এ মার্কেটে এবং এর আশপাশে মিলে তিন শতাধিক দোকান রয়েছে।

ঘটনাস্থলে লোকসমাগম ঠেকাতে এবং ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সহযোগিতা করতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও পুলিশ সদস্যরা কাজে নামেন।

মূহুর্তে সব পুড়ে ছাই হতে দেখে বিলাপ করতে থাকেন হকার্স সুপার মার্কেটের দোকানদার সোহেল মিয়া। তার দোকানে যথেষ্ট মালামাল আগে থেকেই ছিল। ঈদ সামনে রেখে গতকালও দেড় লাখ টাকার কাপড় উঠান তিনি। আগুনে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, রোজার ঈদকে সামনে রেখে ধারদেনা করে ২৫ লাখ টাকার কাপড় তুলেছিলাম। এই ঈদে যে লাভ হবে তা দিয়ে পুরাতন ঘর ঠিকঠাক করবো ভেবেছিলাম। এখন কিভাবে ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চালাবো সেটাই ভাবছি।

মার্কেটের জুতা ব্যবসায়ী আরমান বলেন, ঈদ উপলক্ষে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে জুতা এনে মজুত করেছিলাম। রোজার ঈদেই মূলত বেশি বেচা-বিক্রি হয়। ঈদের এই লাভ দিয়েই সারা বছর সংসারসহ দোকানের কর্মচারীদের খরচ চলে। আগুনে সব মালামাল পুড়ে ছাই হয়েছে। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নাই।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল-আমীন জানান, আগুনের কথা জানতে পেরে আশপাশের এলাকার হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন। দোকানের উদ্ধার করা মালামাল বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সেই মালামাল খোয়া যাতে না যায় সে বিষয় এবং সার্বিক সহযোগিতায় পুলিশ সদস্যরা কাজ করে।

এদিকে, হকার্স মার্কেটে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদারদের আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস। ঘটনার পর হকার্স মার্কেট পরিদর্শন শেষে সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীদের তিনি এই কথা জানান।

জেলা প্রশাসক বলেন,পুড়ে যাওয়া দোকানের মালামালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করার পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। আগামী দুইদিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

এদিকে জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্র্যাট নায়িরুজ্জামানকে প্রধান করে আট সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে আগামী তিনদিনের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

ad