পূরণ হলো লুসি হল্টের আশা

lucy halt
ad

জাগরণ ডেস্ক: বাংলাদেশে তার জন্ম নয়, নেই রক্তের কোনো বন্ধনও। তবু, অদ্ভুত এক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন বাংলাদেশের সাথেই। গল্পটা বৃটিশ নাগরিক মিস লুসি হল্টের। প্রায় ৬০ বছর ধরে আছেন এদেশে। পূর্বসূরী বৃটিশ শাসকদের শাসনেও রয়েছে তার চরম ক্ষোভ, হয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের নিভৃতচারী নিরব স্বাক্ষী। মানুষটা ভীনদেশী হলেও, মন ও মননে একটু বেশিই বাঙালী। আর এ বিদেশিনী মরতেও চান বাংলাদেশে, বরিশালে। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। অবশেষে পূরণ হয়েছে তার সেই আশা।

শনিবার (৩১ মার্চ) বিকালে লুসি হল্টের হাতে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের সনদটি তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ইংল্যান্ডের সেন্ট হেলেন শহরে মিস লুসি হল্টের জন্ম ১৯৩০ সালে। মাত্র ৩০ বছর বয়সে বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনের হাসপাতালে আসেন সেবায়েত হিসেবে। কথা ছিলো দুবছর বাদে দেশে ফেরার। কিন্তু এখানকার প্রকৃতি, মানুষ আর মানুষের ভালোবাসা আবিষ্ট করে তাকে। তাই তো গত ৫৬ বছর ধরে লাল-সবুজের দেশে মাখামাখি ব্রিটিশ নাগরিক লুসি হল্টের। হৃদপিণ্ডজুড়ে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ। হয়তো সে জন্যই চলনে-বলনে সবকিছুতেই তার বাঙালীয়ানা।

বিনে পয়সায় কখনো সেলাই শেখানো, তাঁত প্রশিক্ষণ, পথ শিশুদের পাঠদান, আবার কখনো বা হাসপাতালে সেবা দিয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলায়। আর এসব কাজের শুরুটা বরিশাল থেকে। পর্যায়ক্রমে নওগাঁ, রাজশাহী, যশোর, ঢাকা, গোপালগঞ্জ, খুলনা হয়ে আবারো বরিশালেই। পরিবার-পরিজন, বৃটিশ আভিজাত্য ফেলে এ বিদেশিনী একা থাকেন অক্সফোর্ড মিশন হোস্টেলের ছোট্ট খাট্টো একটা রুমে।

নাম মাত্র উপার্জন বলতে, বাংলায় অনুবাদ। কেউ কেউ তাঁর কাছে আসেন ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদের জন্য। আবার কেউবা বাংলা থেকে ইংরেজী করাতে। আর এসব কাজ করেন তিনি হাসিমুখে। যদিও, বৃটিশ নগরিক হওয়াতে ৭০ পাউন্ড বা হাজার ছয়েক টাকা পান মাসিক ভাতা হিসেবে। তাও আবার আসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেন

একাত্তরের স্মৃতি রয়েছে লুসির চোখজুড়ে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে বেশ কয়েক মাস আয়া হয়ে যশোরের ফাতেমা হাসপাতালে আহতদের সেবা দেয়া যেনো তার অনন্য দৃষ্টান্ত।

গত বছর জাগরণের সাথে আলাপে লুসি বলেন, “কোনো স্বীকৃতি বা কিছু পাওয়ার আশায় নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় হাসপাতালে আমি বেসামরিকদের সেবা দিয়েছিলাম মানবিক দিক চিন্তা করেই।”

আহতদের সেবা দেওয়ার অবদান হিসেবে সনদ নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে এক কথায় বলেন, ‘না’। ক্ষোভ রয়েছে তার বৃটিশ শাসকদের শাসন নিয়ে। তাঁর মতে বৃটিশরা এখানে (এ উপমাহাদেশে) ঠিক শাসন করেনি। পূর্বসূরীদের পাপের বোঝা নিয়ে কেউ কিছু বললে প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে বোবামুখে তিনি কষ্ট দেন নিজেকে। বলেন, “ওরা অপরাধ করছে। ভুল করেছিলো অনেক। সেই জন্য আমি, আমাকে কেউ খারাপ কিছু বললে চুপ থেকে নিজেকে চাপা কষ্ট দেই।”

আর, নিজ দেশের চেয়ে বিদেশীদের বেশি প্রশংসা করায় ক্ষোভ রয়েছে বাংলাদেশীদের প্রতিও। তিনি বলেন, “বাংলাদেশীরা নিজেরা নিজেদের পেছনে লেগে থাকে। নিজেরা নিজেদের প্রশংসা করে না। এটা আমাকে কষ্ট দেয়। আমি চাই একে অপরকে ভালোবাসবে, প্রশংসা করবে।” লুসি দ্বৈত নাগরিকত্ব চেয়েছিলেন, পাননি। শুধু বাংলাদেশী নাগরিকত্ব নিবেন তাও সাহস পাচ্ছেনা। কারণ বৃটিশ নাগরিক হওয়াতে তিনি ভাতা পান সেখান থেকে। সেটি বন্ধ হবে যদি তিনি সেখানকার নাগরিকত্ব ছেড়ে দেন।

এটাই হয়তো তাঁর ভালোবাসা। লুসি ভালোবেসেছেন বাংলাদেশ। ভালোবেসেছেন বরিশাল। আর তাই জন্ম না নিলেও, শেষ নিঃশ্বাস ছাড়তে চান বরিশাল শহরেই। বাংলা মাটির সোঁদা গন্ধেই ঘুমোতে চান চিরদিনের জন্য। সেজন্য লুসি ঠিক করে রেখেছেন মাটির সেই কবরও। লুসির সেই আশা এবার পূরণ হবে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তিনি পেলেন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব।

ad