সৈয়দ নজরুল ইলাম: বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি

জাতীয় চার নেতার একজন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। যে কজন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন নজরুল ইসলাম।

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯২৫ সালে ময়মনসিংহ জেলার (বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলা) যশোদল বীরদামপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার লেখাপড়ার শুরু যশোদল মিডল ইংলিশ স্কুলে৷ এরপর কিশোরগঞ্জ আজিমুদ্দিন হাই স্কুল আর ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে কাটান তার স্কুল জীবন। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে ১৯৪১ সালে দুই বিষয়ে লেটার মার্কসসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন।

১৯৪৩ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে কৃতিত্বের সাথে বি.এ. (অনার্স), ১৯৪৭ সালে এম.এ এবং ১৯৫৩ সালে এল.এল.বি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৬-৪৭ সালে সলিমুলাহ মুসলিম হল ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। তিনি ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদকও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি সর্বদলীয় একশন কমিটির -এর সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হবার পরও সরকারি চাকরি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ১৯৪৯ সালে ইতিহাসের প্রভাষক হিসেবে আনন্দমোহন কলেজে যোগদান করেন। পরে ১৯৫৫ সালে ময়মনসিংহে আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৭ সালে খ্যাতিমান রাজনীতিক, সু-সাহিত্যিক ও পাকিস্তানের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আবুল মনসুর আহমেদকে কাউন্সিলের মাধ্যমে হারিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং এ পদে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ছিলেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭২ তিনি আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবিতে দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন শুরু হলে আইয়ুব সরকার আওয়ামী লীগের সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করার পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

তিনি ছিলেন ডেমোক্রেটিক এ্যাকশন কমিটির অন্যতম কর্ণধার। রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করার জন্য রাওয়ালপিন্ডিতে প্রথমে ১৯৬৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এবং পরে ১০-১৩ মার্চ দু'দফা এ বৈঠক হয়। তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের অন্যতম নেতা হিসেবে এ সময় বৈঠকে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১৭ আসন থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় সংসদে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্টপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং নিজে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটা সরকারের কাঠামো তৈরি করেন এবং ১০ এপ্রিল রেডিওতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত অস্থায়ী সরকারের তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ময়মনসিংহ-২৮ আসন থেকে। নির্বাচনের পর পরবর্তী মন্ত্রীসভায়ও তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। জাতীয় সংসদে তিনি উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও গ্রহণ করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর তাঁকে প্রথমে গৃহবন্দী এবং ২৩ আগস্ট, ১৯৭৫ তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী করা হয়। কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর অন্য তিন নেতার সাথে তাকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

মন্তব্য লিখুন :