অবশেষে ৪ বছর পর লাইজুর দাফন সম্পন্ন

Lizu, burial, completed,
ad

স্থানীয় প্রতিনিধি: নীলফামারীর ডোমারে আইনি জটিলতায় চার বছরের অধিক সময় ধরে মর্গে থাকা ধর্মান্তরিত হোসনে আরা (নিপা রানী) লাইজুর লাশ তার স্বামী হুমায়ুন কবির লাজুর কবরের পাশে ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক দাফন করা হয়েছে।

শুক্রবার (৪ মে) বেলা ৩টায় উপজেলার বোড়াগাড়ী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড কাজীপাড়া কবরস্থানে জানাজার নামাজ শেষে তার দাফন কাজ সম্পন্ন হয়। জানাজার নামাজ পড়ান ইমাম মো. রবিউল ইসলাম।

এর আগে বেলা সোয়া ১১টায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘর থেকে লাইজুর মরদেহ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। হাসপাতালের হিমঘর থেকে পুলিশি পাহাড়ায় দুপুরে লাইজুর লাশ উপজেলার বোড়াগাড়ী ইউনিয়নের র্প্বূ-বোড়াগাড়ী কাজীপাড়া গ্রামে তার শ্বশুর সাবেক ইউপি সদস্য জহুরুল ইসলামের বাড়িতে আনা হয়।

এ সময় সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মোছা. উম্মে ফাতিমা, থানা অফিসার ইনচার্জ মোকছেদ আলী, ওসি (তদন্ত) ইব্রাহীম খলিল।

লাইজুর লাশ সেখানে পৌঁছালে তাকে এক নজর দেখার জন্য হাজারো উৎসুক জনতা ভীড় জমান। বিশেষ করে মহিলাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

ডোমার থেকে রুবেল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি প্রায় দশ কিলোমিটার দূর থেকে তার লাশ দেখতে আসেন। রুবেল জানান, চার বছর পর লাশটি কিভাবে আছে, এটিই দেখার জন্য এখানে আসা। তবে কেউ লাশ দেখতে না পেরে হতাশ মন নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। তবে লাশ দাফনের পূর্বে হোসনে আরা লাইজুর পরিবারকে লাশ দেখানোর কথা থাকলেও তারা না আসায় লাশ দেখানো যায়নি।

এর আগে গত ১২ এপ্রিল হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর একক বেঞ্চ ইসলামিক রীতি অনুযায়ী লাইজুর মরদেহ দাফনের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি হোসনে আরা লাইজুর দাফনের পূর্বে তার (লাইজু/নীপা) পরিবারকে (মা-বাবাকে) দেখার সুযোগ করে দিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেয়া হয়।

মামলার বিবরণে জানা যায়, প্রেমের সম্পর্কে থেকে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার অক্ষয় কুমার রায় মাস্টারের মেয়ে লিপা রাণী একই উপজেলার জহুরুল ইসলামের ছেলে হুমায়ন ফরিদ লাইজু ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর পালিয়ে যায়। পরে ধর্মান্তরিত হয়ে লাইজুকে বিয়ে করে লিপা। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে লিপা রাণী রায় তার নাম রাখেন মোছা. হোসনে আরা ইসলাম লাইজু।

কিন্তু বাঁধ সাধে নিপার পরিবার। নিপা অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় লাইজুর বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা করে তার পরিবার। এ মামলায় লাইজুকে নেওয়া হয় কারাগারে। নিপাকে রাখা হয় নিরাপত্তা হেফাজতে। পরে নিপাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নেয় তার পরিবার। লাইজুও জেল খেটে বের হন।

এরপর মেয়ে ও ছেলে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ের সকল কাগজপত্রসহ আদালতে হাজির করে জবানবন্দি দিলে আদালত অপহরণ মামলাটি খারিজ করে দেন। এরপর মেয়ের বাবা মামলার খারিজের বিরুদ্ধে আপিল করে তার মেয়েকে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও মস্তিষ্ক বিকৃত দাবি করেন।

পরবর্তীতে আদালত এই আবেদন আমলে নিয়ে মেয়েটিকে শারীরিক পরীক্ষার জন্য রাজশাহী সেফ হোমে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। মেয়েটি সেফ হোমে থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি স্বামী হুমায়ূন ফরিদ লাইজু বিষপান করে আত্মহত্যা করে।

এরপর লাইজুর আত্মহত্যার বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করে বাবা তার মেয়েকে নিজ জিম্মায় নিতে আদালতে আবেদন করার পর আদালত তা মঞ্জুর করেন। ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি মেয়েকে নিয়ে বাবা তার বাড়িতে রাখেন। আর ২০১৪ সালের ১০ মার্চ বাবার বাড়িতে নিজ শোবার ঘরে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করে মেয়েটি।

২০১৪ সালের ১১ মার্চ নীলফামারী জেলার মর্গে মেয়েটির মরদেহ ময়না তদন্ত করা হয়। এরপর পুত্রবধূ দাবি করে মেয়েটির শ্বশুর জহুরুল ইসলাম ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক দাফনের জন্য আদালতে আবেদন করেন। তবে মেয়ের বাবা অক্ষয় কুমার হিন্দু শাস্ত্র মতে সৎকারের জন্য আদালতে আবেদন করেন।

এরপর উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ডোমার থানা পুলিশকে একটি প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন। কিন্তু উভয়পক্ষ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে ডোমার থানা পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করলে আদালত মেয়েটির মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংরক্ষণের আদেশ দেন। এরপর মেয়েটির মরদেহ সেখানে রাখা হয়।

পরবর্তীতে মেয়েটির মরদেহ দাবির মামলা মেয়েটির শ্বশুরের পক্ষে গেলে মেয়ের বাবা সাব-জজ আদালতে আপিল করেন। তবে আপিলে মেয়ের বাবার পক্ষে রায় আসে।

তবে এরপরই মেয়েটির শ্বশুর জহুরুল ইসলাম রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন। সে আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট গত ১২ এপ্রিল রায় দেন।

ad