‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ লেখা নিয়ে রাতে উড়ছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

'Joy Bangla, Joy Bangabandhu', Launching, Bangabandhu Satellite,
ad

জাগরণ ডেস্ক: বারবার দিন পরিবর্তনের পর অবশেষে আগামী ১০ মে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট- ১’ এর উৎক্ষেপণ হতে চলেছে। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান লেখা নিয়ে কক্ষপথের দিকে ছুটবে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম এই উপগ্রহটি।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার বেসরকারি মহাকাশ অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি কোম্পানি ‘স্পেসএক্স’ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় ১০ মে বিকাল ৪টা ১২ মিনিট থেকে ৬টা ২২ মিনিটের (বাংলাদেশ সময় ১১ মে রাত ২টা ১২ মিনিট থেকে ৪টা ২২ মিনিট) মধ্যে যেকোনো সময় ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট- ১’ উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হবে বলে তাদের ওয়েবসাইট সূত্রে জানাগেছে।

বৃহস্পতিবার (১০ মে) দিবাগত রাত ২টা থেকে উৎক্ষেপণ প্রস্তুতিসহ সার্বিক বিষয়সহ উৎক্ষেপণের মুহূর্তটি সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ দেশের সবকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল।

যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার সকালে অরল্যান্ডোর কেনেডি স্পেস সেন্টারে (নাসার) স্যাটেলাইট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থ্যালেস অ্যালেনিয়ার সঙ্গে স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি রিভিউ বিষয়ক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সব কিছুর তদারকি করেছে বাংলাদেশ। ওই বৈঠকের স্যাটেলাইটের কারিগরি অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে বাংলাদেশকে জানানো হয় বলে জানাগেছে।

এই উৎক্ষেপণ উপলক্ষে বাংলাদেশীদের পদচারণায় উৎসবমুখর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের মিয়ামি, কোকোয়া বিচ ও অরল্যান্ডো এলাকা। শুধু ফ্লোরিডা নয়, নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, জর্জিয়াসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে শত শত প্রবাসী বাংলাদেশী ফ্লোরিডা যাচ্ছেন।

মাস কয়েক আগে সরেজমিনে স্যাটেলাইট কার্যক্রমের অগ্রগতি দেখতে ফ্লোরিডা আসেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। তখন বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থালাস এলেনিয়া তারানা হালিমকে বলেন, সাধারণত স্যাটেলাইটের কোথাও কিছু লেখা যায় না। লেখার কোনো নিয়মও নেই। কিন্তু ৫৭তম স্যাটেলাইট দেশ হতে যাওয়া বাংলাদেশকে তারা স্মৃতি হিসেবে কিছু একটা লিখার সুযোগ দিতে চান।

তখন তারানা হালিম তাদের বলেন, আমি এখানে কিছু লেখার সাহস দেখাতে চাই না। আর যদি এতে কারও নাম লিখতেই হয় তাহলে তা অবশ্যই আমাদের জাতির জনকের নাম লিখতে হবে। আর আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্লোগান হচ্ছে জয় বাংলা।

তখন তিনি থালাসের বিশেষ অমোচনীয় কালিতে নিজ হাতেই স্যাটেলাইটের গায়ে লিখে দেন ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। স্যাটেলাইটের পুরো মেয়াদকাল অর্থাৎ ১৫ বছরেও এ লেখা মুছবে না।

প্রথমবারের মতো ফ্যালকন-৯ রকেটের ব্লক ৫ সংস্করণ বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট নিয়ে জিওস্টেশনারি ট্রান্সফার অরবিটের পথে ছুটবে এবং কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে উৎক্ষেপণের মাধ্যমে স্যাটেলাইটের অধিকারী বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটবে।

কেনেডির স্পেস সেন্টারের ৩৯-এ লঞ্চিং প্যাড থেকে ৩ দশমিক ৯ মাইল বা ৬ দশমিক ২৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত অ্যাপোলো বা সাটার্ন ভি সেন্টার থেকে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের দৃশ্য। এ ছাড়াও সাড়ে ৭ মাইল বা ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেইন ভিজিটর কমপ্লেক্স থেকেও দেখা যাবে একই দৃশ্য। এর জন্য কাউকে কোনো অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হবে না বলে জানিয়েছে স্পেসএক্স।

সারা দিনের জন্য টিকেট কেটে আগ্রহীরা লঞ্চ প্যাড থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৯ মাইল দূরে অ্যাপোলো/স্যাটার্ন ভি সেন্টার এবং প্রায় সাড়ে ৭ মাইল দূরে কেনেডি স্পেস সেন্টারের মূল ভিজিটর কমপ্লেক্স থেকে এই উৎক্ষেপণ দেখার সুযোগ পাবেন।

অ্যাপোলো/স্যাটার্ন ভি সেন্টারে যাওয়া যাবে শুধু কেনেডি স্পেস সেন্টারের বাসে চড়ে এবং সেটা ধারণক্ষমতা পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত খোলা থাকবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ উপলক্ষে সোমবার ফ্লোরিডা গেছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম (সাবেক টেলিকম প্রতিমন্ত্রী), তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ।

উৎক্ষেপণস্থল ফ্লোরিডায় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়সহ সরকারের ৪২ সদস্যর একটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত থাকবে। এ ছাড়া সাংবাদিকসহ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের অনেকে সেখানে থাকবেন। তাদের মধ্যে ৪০ জন উৎক্ষেপণস্থল থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে প্রথম গ্যালারি থেকে এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করবেন।

প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে দ্বিতীয় গ্যালারিতে থাকতে পারবেন আরও প্রায় ২০০ জন। এরপর পাঁচ কিলোমিটার দূরে অন্য একটি উন্মুক্ত স্থান থেকেও এ উৎক্ষেপণ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যাবে।

৩ হাজার ৫০০ কেজি ওজনের জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফ্যালকন-৯ কক্ষপথের দিকে ছুটবে কেনেডি স্পেস সেন্টারের ঐতিহাসিক লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯-এ থেকে। এই লঞ্চ কমপ্লেক্স থেকেই ১৯৬৯ সালে চন্দ্রাভিযানে রওনা হয়েছিল অ্যাপোলো-১১।

কেনেডি স্পেস সেন্টার পরিদর্শনের জন্য সাধারণ প্রবেশ মূল্য ৫০ ডলার (বয়স ১২ বছরের ক্ষেত্রে) ও ট্যাক্স ৩ দশমিক ৫০ ডলার সর্বমোট ৫৩ দশমিক ৫০ ডলার এবং ৩-১১ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিটি টিকেটের মূল্য ৪০ ডলার ও ট্যাক্স ২ দশমিক ৮০ ডলার সর্বমোট ৪২ দশমিক ৮০ ডলার। অনলাইনে টিকিট কিনলে শতকরা ২০ শতাংশ ছাড় পাওয়া যাবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশী কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির জন্য রাখা হবে। স্যাটেলাইটটি ১৫ বছর মেয়াদের মিশনে পাঠানো হচ্ছে।

এই কৃত্রিম উপগ্রহটি টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও বেতারসহ ৪০ ধরনের সেবা দেবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ট্যারিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা বহাল থাকা, পরিবেশ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ই-সেবা নিশ্চিত করবে।

স্যাটেলাইটের কার্যক্রম পুরোপুরিভাবে শুরু হলে আশপাশের কয়েকটি দেশে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা দেয়ার জন্য জিয়োসিক্রোনাস স্যাটেলাইট সিস্টেম (৪০ ট্রান্সপন্ডার, ২৬ কেইউ ব্র্যান্ড, ১৪ সি ব্যান্ড)-এর গ্রাউন্ড সিস্টেমসহ সব ধরনের সেবা পাওয়া যাবে।

শ্বের অন্যতম খ্যাতনামা স্যাটেলাইট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থেলেস এলেনিয়া স্পেস বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি নির্মাণ করেছে। এটি তৈরির জন্য ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর বিটিআরসির সঙ্গে টার্ন কি পদ্ধতি কোম্পানিটির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৯০২ কোটি টাকা।

সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এক হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট এক হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা বিডার্স ফাইনান্সিং-এর মাধ্যমে ব্যয় সংকুলান হয়েছে।

এদিকে, উৎক্ষেপণ উপলক্ষে দেশজুড়ে উৎসব আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সময়কে স্মরণীয় করে রাখতে সফল উৎক্ষেপণের পর রাজধানীর উল্লেখযোগ্য এলাকায় আতশবাজির উৎসব শুরু হবে। এছাড়া, ডিজিটাল আলোকসজ্জার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সব জেলায়ও এ উপলক্ষে উৎসব হবে।

সব মিলে অনুষ্ঠান আয়োজনে ১৬ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। তবে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে বিটিআরসি থেকে সহায়তা নেয়া হবে বলেও জানানো হয়। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ উপলক্ষে একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশের উদ্যোগও নেবে ডাক অধিদপ্তর।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০১৭ সালের অক্টোবরে। এর পর গত ডিসেম্বরে এর সার্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে ওড়ার উপযোগী ঘোষণা করা হয়।

এরইমধ্যে ১৬ ডিসেম্বর বৈরী আবহাওয়া এবং আরও কিছু যুক্তিযুক্ত বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের তারিখ পিছিয়ে যায়। পরে তা উৎক্ষেপণের জন্য ৪ মে নতুন তারিখ নির্ধারিত করা হয়েছিল।

যদিও পরে জানা যায় ৪ মে তা উৎক্ষেপণ না হয়ে আগামী ৭ মে হতে পারে। কিন্তু আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাকি থাকায় বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু-১’ এর উৎক্ষেপণ মে মাসের ১০ তারিখ হতে চলেছে।

ad