‘আমাকে কেউ কিছু করার ক্ষমতা রাখে না’

Morrelgonj
ad

স্থানীয় প্রতিনিধি: ‘আমার বিরুদ্ধে অনেকে অভিযোগ দিয়েছে, কিন্তু আমাকে কেউ কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আমি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ইউএনও, টিও, এটিওদের বদলী করে দিতে পারি। ভালো লাগলে ছেলে-মেয়ে পড়াবেন আর না লাগলে নিয়ে যাবেন। তাতে কিছুই যায় আসে না।’

সন্তানের খোঁজ নিতে আসা অভিভাবকের সাথে ঠিক এমন দম্ভোক্তি আর লাঞ্ছনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও অর্থ আর ক্ষমতার দাপটে আবারো পাড় পেয়ে যাচ্ছে শোক দিবসে বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে কটূক্তি করা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের ৯৫নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাছির হাওলাদার।

বিদ্যলয়ের জমি দাতা ও সাবেক সভাপতি মৃত আব্দুল মালেক হাওলাদারের ছেলে ও অভিভাবক মো. শহিদুল ইসলাম হাওলাদার এক লিখিত অভিযোগে জানান, তার দুই সন্তান তাওহীদ ও মরিয়ম ওই বিদ্যালয়ের ৪র্থ ও ১ম শেণিতে পড়ে। যে কারণে প্রায় প্রতিদিনই বিদ্যালয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার খোঁজ খবর নিতে আসতে হয় তাকে। কিন্ত বিদ্যালয়ে এসে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের নাছিরের অনিয়মিত উপস্থিতি ও বিলম্বে বিদ্যালয়ে আসার কথা জানতে পেরে বিষয়টি সম্পর্কে কথা বলতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত প্রাধন শিক্ষক নাছির হাওলাদার তাকে চরমভাবে লাঞ্ছিত করে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেন।

এ সময় উত্তেজিত শিক্ষক নাছির নিজের পকেট থেকে একটি কার্ড বের করে উচিঁয়ে ধরে বলেন, ‘এটি কার কার্ড চেনো? আমার বিরুদ্ধে উপর মহলে অভিযোগ দিয়েও কোন লাভ হবে না। আমার বিরুদ্ধে অনেকে অভিযোগ দিয়েছে। কিন্ত আমাকে কেউ কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আমি ইউএনও, টিও, এটিওদের সাথে কেরামবোর্ড খেলি। আবার আমি ইচ্ছা করলে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ইউএনও, টিও, এটিওদের বদলী করে দিতে পারি।’

উত্তেজিত শিক্ষক নাছির আরো বলেন, ‘আমার খোঁজ-খবর নেওয়ার দরকার নেই। ভালো লাগলে ছেলে-মেয়ে পড়াবেন, আর ভালো না লাগলে নিয়ে যাবেন। আমার বিদ্যালয়ে এতো ছাত্র-ছাত্রীর প্রয়োজন নাই।’

এ ঘটনার সুষ্ঠ বিচার ও সরকারি পদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পর্কে দম্ভোক্তিকারী শিক্ষক নাছিরের অপসারণ দাবি করে গত (৫ মার্চ) লাঞ্ছনার শিকার অভিভাবক মো. শহিদুল ইসলাম হাওলাদার জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি, বাগেরহাট) ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত (৮ মে) উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফকরুল ইসলাম ও মো. মনিরুজ্জামানের সমন্বয় গঠিত তদন্ত কমিটি সরেজমিনে ঘটনার সত্যতা পেলেও অজ্ঞাত কারণে এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি অভিযুক্ত ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে তদন্তকারী সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, অভিভাবকের সাথে অশোভন আচরণ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পর্কে দম্ভোক্তিসহ দপ্তরি কাম-নৈশ প্রহরী নিয়োগে দুর্নীতির অপর আরও একটি অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দপ্তরে দাখিল হয়েছে। এ ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশিষ কুমার নন্দী বলেন, তদন্তে অভিযোগের অনেকটা সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদনটি পুরোপুরি পড়ে দেখা হয়নি। সত্যতা নিশ্চিত হলে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১১ আগষ্ট বিদ্যালয়ে জাতীয় শোক দিবসের প্রস্তুতিমূলক সভা চলাকালে ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান ও এসএমসির সদস্যদের উপস্থিতিতে ১৫ আগষ্ট জাতীয় শোক দিবস পালনে অনিহা প্রকাশ করেন অভিযুক্ত নাছির হাওলাদার। ওই সময় তিনি অফিস কক্ষে রক্ষিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবির দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলেন, ‘৪১ বছরের পচা লাশ নিয়া টানা হেচড়া করার কি প্রয়োজন! ১৫ আগষ্ট পালন করা আর্থিক অপচয় ও ছেলে-মেয়েদের  লেখাপড়ার ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই না। স্বাধীন হয়ে আমারা কি পেয়েছি এর চেয়ে পাকিস্তান আমল অনেক ভালো ছিল।’

সাবেক শিবির কর্মী নাছির হাওলাদারের বিরুদ্ধে এ ঘটনার তদন্ত শেষে আদালতে একটি মামলা হয়। বিজ্ঞ আদালত মোরেলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরে অজ্ঞাত কারণে তৎকালীন শিক্ষা অফিসার আনিসুর রহমান থানা পুলিশ ও আদালতে একটি মীমাংসা পত্র দিয়ে মামলাটির নিস্পত্তি করে ফেলেন।

মোরেলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাশেদুল আলম জানান, ওই সময়ে দায়িত্বে থাকা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান থানা পুলিশ ও আদলতে একটি মীমাংসা পত্র প্রেরণ করলে মামলাটির নিষ্পত্তি হয়ে যায়।

মামলার বাদী নাসির উদ্দিন হাওলাদার জানান, নাসির ক্ষমতা আর টাকার প্রভাবে প্রভাবিত হয়েই শিক্ষা কর্মকর্তা কাল্পনিক মীমাংসা পত্র পাঠিয়েছিলেন আদালতে। যে কারণে মামলাটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

ad