কালিয়ায় এনজিও উধাও: প্রতিবাদে ইউএনও কার্যালয় ঘেরাও

Narail
ad

স্থানীয় প্রতিনিধি: নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় চলন্তীকা যুব সোসাইটি নামের এনজিও সাধারণ মানুষের অর্ধশত কোটি টাকার আমানত নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস ঘেরাও করেছে সাধারণ জনতা।

সোমবার (২ এপ্রিল) সালামাবাদ ইউপির চেয়ারম্যান শামীম আহম্মেদের নেতৃত্বে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

এ সময় নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ওয়াহিদুজ্জামান হিরা, জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক এফ এম সোহাগসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। কয়েক হাজার গ্রাহক এই কর্মসূচিতে অংশ নেন।

এ সময় বক্তারা বলেন, চলন্তীকা যুব সোসাইটি সাধারণ মানুষের প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার আমানত নিয়ে পালিয়ে গেছে।  এখন একটাই কালিয়াবাসীর টাকা ফেরত দিতে হবে। এ ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় আগামীতে আরও বড় কর্মসূচি দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, কালিয়ায় চলন্তিকা যুব সোসাইটি নামের ওই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) প্রায় আট হাজার গ্রাহকের ৫০ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ কর্মীদের পালাতে সহায়তা করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় এখন গোটা উপজেলায় আলোড়ন তুলেছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ মার্চ) সকালে গ্রাহকরা কালিয়া পৌর শহরে চলন্তিকার অফিস ঘেরাও করলে পুলিশ তাদের তাড়িয়ে দেয়। এরপর ওইদিন সন্ধ্যায় ইউএনও এনজিওর অফিসটি সিলগালা করে দিয়েছেন।

সূত্র জানিয়েছে, কালিয়া উপজেলা, কালিয়া পৌরসভা, বড়দিয়া, মহাজন ও গাজিরহাট শাখার গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় আট হাজার।

গ্রাহকরা বলেন তাদের কাছ থেকে দিনে, মাসিক, বাৎসরিক হিসেবে টাকা আদায় করা হতো। গ্রাহকদের ছয় বছরে দ্বিগুণ টাকা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি দেয় নামের খুলনাভিত্তিক এনজিও চলন্তিকা যুব সোসাইটি (রেজি নং কে/১১০/০৪)। এতো বেশি লাভের আশায় গ্রাহকরা এদিকে ঝুঁকে পড়েন।

আমানতকারীদের মধ্যে কালিয়া উপজেলার গুরুদাশ স্বর্ণকারের ১৫ লাখ, রামনগর গ্রামের অঞ্জলীর ১ লাখ, শালবরাত গ্রামের গীতা ঢালীর ৫০ হাজার, উত্তম কুমারের ৫০ হাজার, বিলবাউচ গ্রামের শহীদ মোল্যার দেড় লাখ, বড়কালিয়া গ্রামের পেন্টুর আড়াই লাখ, খোকনের আড়াই লাখ, শান্তির ৭০ হাজার, মিতার ৭৫ হাজার, ঝন্টু বর্মনের ৩০ হাজার, কামাল সেখ, মকিদ চৌধুরী, নার্গিস বেগম, শাহিনুর, জামেলা বেগম, মধুসূদন দাশ, তপন চক্রবর্তী-এমন রয়েছেন অন্তত ৮ হাজার। এসব গ্রাহকের লগ্নিকৃত টাকার পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা।

গত বৃহস্পতিবারে চলন্তিকা যুব সোসাইটির অফিস অনেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান। কর্মকর্তাদের সাথে কোনো গ্রাহক ফোনেও যোগাযোগ করতে পারছিলেন না। এক পর্যায়ে তারা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারেন, বাগেরহাট থেকে ওই সোসাইটির কর্মকর্তারা একইভাবে গা ঢাকা দিয়েছেন। নড়াইলের কালিয়ার গ্রাহকরা পর্যায়ক্রমে একত্রিত হয়ে হতে থাকেন। তখন শত শত আমানতকারী কান্নায় ভেঙে পড়েন।

জানা যায়, চলন্তিকা যুব সোসাইটি ২০০৮ সালে প্রথমে কালিয়া পৌর এলাকায় অফিস ভাড়া করে পরবর্তী সময়ে শহরের থানা সড়কে ভবন ক্রয় করে কাজ শুরু করে। অফিস কর্মচারীসহ বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক মাঠকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আদলে ৬ বছরে দ্বিগুণ ও দশ বছরে তিনগুণ মুনাফা দেয়ার ঘোষণা দিয়ে মেয়াদি আমানত (এফডিআর), মাসিক আমানত (এমএসএস) এবং ক্ষুদ্র পরিসরে ঋণ বিতরণ কর্মসূচির কাজ শুরু করে।

প্রথমদিকে গ্রাহকদের মধ্যে নামমাত্র কিছু ঋণ বিতরণ করলেও আমানতের টাকা ফেরত চেয়ে পাননি তারা। অনেকের আমানতের মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও আমানতের টাকা তুলতে গেলে এনজিও কর্মকর্তারা সংস্থার নিয়ম পালনের অজুহাতে কালক্ষেপণ করতে থাকে। এতে ওই এনজিও সম্পর্কে গ্রাহকদের সন্দেহ বাড়তে থাকে।

আমানতকারীরা টাকা ফেরত নিতে মরিয়া হয়ে উঠলেও তাদের টাকা ফেরত না দিয়ে ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্টরা নানা টালবাহানা করতে থাকে। এরই মধ্যে ২৮ মার্চ রাতে চলন্তিকার ম্যানেজার মিলন দাসের পলায়নের খবর গ্রাহকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে শতাধিক আমানতকারী ওই এনজিওর কালিয়া অফিস ঘেরাও করেন।

সেখানে প্রধান হিসাবরক্ষক ভজন কুমার দাশসহ কয়েকজন কর্মচারী আটকা পড়েন। ঘটনার খবর পেয়ে কালিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ আমলে না নিয়ে তাদের তাড়িয়ে দেন। পরে এনজিওকর্মীদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করা হয় বলে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ রয়েছে। তারা বলছেন, পুলিশ তাদেরকে নিরাপত্তা দেওয়ার নাম করে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিয়ে উৎকোচের বিনিময়ে পালাতে সহায়তা করেছে।

চলন্তিকা যুব সোসাইটির কালিয়া অফিসের ম্যানেজার মিলন কুমার দাশ মুঠোফোনে জানিয়েছেন, তারা গ্রাহকদের সঙ্গে ঠিকমতো কাজ চালিয়ে এলেও জানুয়ারি থেকে এমডি সরোয়ার হোসাইন ও চেয়ারম্যান খবিরুজ্জামান গ্রাহকদের আমানতের প্রায় ৩০ কোটি টাকা আটকে দেয়।

চলন্তিকার চেয়ারম্যান মো. কবিরুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

কালিয়া থানার ওসি শেখ শমসের আলী গ্রাহকদের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চলন্তিকার অফিস ঘেরাওয়ের খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে ম্যানেজার মিলনের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেছেন। ম্যানেজার গ্রাহকদের অভিযোগ গুজব বলে তাকে জানিয়েছিলেন। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য টাকা আনতে খুলনায় প্রধান কার্যালয়ে রয়েছেন বলে অবহিত করার কারণে তিনি গ্রাহকদের সরিয়ে দিয়েছেন। সন্ধ্যায় অফিসটি সিলগালা করা হয়েছে।

কালিয়ার ইউএনও মো. নাজমুল হুদা বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে প্রতারকদের আটক করতে এনজিও চলন্তিকায় গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে কাউকে না পেয়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার জন্য অফিসটি সিলগালা করেছি।

একটি সূত্র জানায়, গত মাস আগে ওই অফিসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাগজ পত্র পোড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারে কালিয়া অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপ্যাল অফিসার বুলবুল হোসেন নড়াইল জেলা অনলাইন মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি উজ্জ্বল রায় ও সাধারণ সম্পাদক মো. হিমেল মোল্যার নিকট অভিযোগ করে জানান, চলন্তিকা যুব সোসাইটির নামে সিডি ০২০০০০৩৭৩০৩২৭ নং অ্যাকাউন্ট আছে।

তিনি জানান, এ বছরে ওই অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা লেনদেন হয়নি। গত বছরে ১০-১২ লাখ টাকা মাত্র লেনদেন হয়েছে। তবে গত বছরের ২১ ডিসেম্বর ৫ লাখ টাকা অনলাইনের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে। এখন ওই অ্যাকাউন্টে মাত্র ১০ হাজার টাকা রয়েছে।

ad