শেরপুর এখন অবৈধ বালুর রাজ্য!

Sherpur, illegal, sand state,
ad

স্থানীয় প্রতিনিধি: আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শেরপুরের পাঁচ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিভিন্ন নদী ও পাহাড়ী ঝিরিতে হাজার হাজার শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে বালুদস্যুরা। এতে হুমকির মুখে পড়েছে নদীর তীরবর্তী গ্রামের শত শত বিঘা ফসলি জমি, বনভূমি, রাস্তাঘাট, ব্রিজ আর ঘরবাড়ি।

বালু উত্তোলন বন্ধ করতে ভুক্তভোগীরা সভা, সমাবেশ ও জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। একটি কুচক্রীমহল বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

 

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানাগেছে, প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রকাশ্যেই চলছে অবাধে বালু উত্তোলন। এর প্রমাণ বহণ করে নাকুগাঁও সড়কের পাশে ঝোলানো বালু বিক্রির অগণিত সাইনবোর্ড। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিরাতে বালুবোঝাই শতশত ট্রাক চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।

বেপরোয়াভাবে বালু উত্তোলনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে জেলার সদর উপজেলা, নকলা, নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র, ভোগাই, সোমেশ্বরীসহ নয়টি নদীর তীরবর্তী বসতভিটা, ব্রিজ, বনায়ন, পাহাড়, পাহাড়ী ঝিরি। হাজার হাজার শ্যালো চালিত ড্রেজার মেশিনের শব্দে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ট্রাক লরির অবাধ যাতায়াতে গ্রামীণ রাস্তাঘাট হয়ে পড়েছে চলাচলের অযোগ্য।

 

আব্দুর রহিম তালুকদার নামের এক কলেজ শিক্ষক বলেন, সদর উপজেলার জামালপুর ঘাট, হরিণধরা, মুন্সিরঘাট, চুনিয়ারচর, নকলার ব্রহ্মপুত্র নদ ঘেঁষা চরঅষ্টাধর, নারায়নখোলা, চন্দ্রকোনা, নালিতাবাড়ীর পশ্চিম সমেশ্চুড়া, চেল্লাখালি, ভোগাই নদী, ঝিনাইগাতীর সোমেশ্বরী, কালঘোষা, মহারশী এবং মালিঝি নদী, ফুলহাড়ি, বাকাকুড়া, দুপুরীয়া, আয়নাপুর, গোমড়া, রামেরকুড়া, পাগলারমুখ, দরবেশতলা, মালিটিলা, হালচাটি ও গান্ধিগাঁও ছাড়াও শ্রীবরদীর বাবলাকোনা, মেঘাদল, কর্ণঝোড়া ও বালিঝুড়িতে নিয়ম না মেনে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় একদিকে নদী ও গারো পাহাড় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।

অপরদিকে, নদীর দুপাড় ও রাস্তাঘাট ভেঙে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও চলাচলের ব্রিজ ভেঙে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

ঝিনাইগাতীর সন্ধ্যাকুড়া গ্রামের নজরুল মিয়া বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালী ও অবৈধ বালু ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন থেকে উপজেলার নদী ও ঝর্ণার পাশে হাজার হাজার শ্যালোযন্ত্র বসিয়ে পাইপের মাধ্যমে বালু তুলে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা Sherpur, illegal, sand state,মূল্যের বালু লুটপাট করে যাচ্ছে।

তিনি জানান, সন্ধ্যাকুড়া গ্রামের শাহ জাহান, বাকাকুড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম, ছামিউল হক, নকশী গ্রামের গোলাপ হোসেনসহ আরও অনেকেই এ অবৈধ কাজের সাথে জড়িত।

তার অভিযোগ, পাহাড়ী ঝর্ণা থেকে বালু পরিবহণের সুবিধার্থে শাল, গজারি ও সেগুন বাগান কেটে তৈরি করা হয়েছে সড়ক। বালু লুটপাটকারীরা প্রকৃতির ওপর অবলীলায় তাণ্ডব চালিয়ে গেলেও প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

 

নালিতাবাড়ীর রামচন্দ্রকুড়া গ্রামের তমিজউদ্দীন বলেন, বালু তুলে নিয়ে যাওয়ার ফলে আমার বাড়ি পুরোটাই নদীগর্ভে চলে গেছে। পরে এর সমাধান পেতে দেড় হাজার টাকা খরচ করে স্থানীয় ইউএনও এবং ডিসি অফিসসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অফিসে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।

তিনি বলেন, নিজের টাকা খরচ করে ভাঙন রোধ করতে নদীর পাড়ে ব্লক বসানোর কাজ করেছি। তারপরও বালু উত্তোলনকারীদের দমানো যাচ্ছেনা। মেশিন বসিয়ে দিনে-রাতে তারা বালু তুলেই যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, শেরপুর এখন অবৈধ বালুর রাজ্যে পরিণত হয়েছে।

বাবলাকোনা আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা কর্ণিয়া সাংমা বলেন, বালু পরিবহণের কাজে ব্যবহার করা ট্রাক, লরি সবসময় যাতায়াত করার ফলে বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি ওয়াল ভেঙে গেছে। ওইসব যানবাহনের বিকট আওয়াজে শব্দ দূষণ হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও এমপির কাছে অভিযোগ জানানো হলেও বালু উত্তোলন থেমে নেই, বরং দিন দিন বেড়েই চলছে।

নালিতাবাড়ীর আদিবাসী অধ্যুষিত সমেশ্চুড়া গ্রামের আরতি মারমা বলেন, আমাদের গ্রামে দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা বালু তোলা হয়। ফলে শহরে যাওয়ার পথে একমাত্র সেতুটির গোড়ার মাটি সরে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এখন গ্রামের সবাইকে পথ চলতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

সদর উপজেলার হরিণধরা গ্রামে বসবাসকারী চাতাল ব্যবসায়ী গোলাম মুর্তুজা বলেন, বালু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিকে নির্দিষ্ট হারে নজরানা দিয়ে বালুর ব্যবসা চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বালু ব্যবসায়ী জানান, প্রতি ট্রাক বালু গড়ে নয় হাজার টাকায় বিক্রি হয়। খরচ বাদ দিয়ে ট্রাক প্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে লাভ থাকে। জেলায় প্রতিদিন গড়ে ২০০ ট্রাক বালু উত্তোলন করা হয়। সে হিসাবে প্রতিমাসে তিন কোটি টাকার বাণিজ্য চলে।

বালু উত্তোলনকারী শ্রীবরদীর আবুল কালাম আজাদ বলেন, বালু উত্তোলনের পক্ষে পুরো গ্রামের মানুষ আর কমিটির লোকজন। তাদের সমর্থনে সবাই মিলে বালু তুলছে।

আরেক বালু উত্তোলনকারী কেরামত মিয়া বলেন, আমরা আগে বালু উত্তোলন করলেও এখন করি না।

জেলা প্রশাসক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, রাতের আধারে যারা বালু উত্তোলন করছে তারা আমাদের পরিবেশ নষ্ট করছে। পাশাপাশি নদীর গতি ধারায় একটি পরিবর্তন আসছে, যা পরিবেশ আইনের পরিপন্থী। এ কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অনেকগুলো মেশিন জব্দ করা হয়েছে এবং বালু উত্তোলনকারীদের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, এরপরও দেখা যায় রাতের আধারে এ ধরনের সমস্যা হয়। তবে বালু উত্তোলনের সংবাদ পেলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করি।

ad