সুস্পষ্ট নীতিমালার কারণে এমপিও বঞ্চিত বহু কলেজ!

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাবদ যে অর্থ সরকার দিয়ে থাকে, তাকে এমপিও তথা মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার বলা হয়। আর এ অর্ডারের জন্য নীতিমালাও প্রণয়ন করেছে সরকার। তবে সেই নীতিমালা সুনির্দিষ্ট নয় বলে অভিযোগ উঠেছে। যার ফলে অনেক কলেজ বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা জানায়।


গত বছরের ২৯ মার্চ এমপিও নীতিমালা প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই নীতিমালার বেশকিছু বিষয়ে অস্পষ্ট থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্কুল পর্যায়ের জন্য এই নীতিমালা তুলনামূলক সহজ করা হলেও কলেজ পর্যায়ে ঠিক তার উল্টো বলে মত দিয়েছেন অনেক নন এমপিও শিক্ষক। বিশেষ করে কলেজের এমপিওর জন্য বিভাগভিত্তিক শিক্ষার্থী এবং পরীক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় অনেক কলেজ এমপিও থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানান। পরবর্তীতে এ নিয়ে কোন ব্যাখা বা বিবৃতিও দেয়নি মন্ত্রণালয়। নীতিমালার নানা অসঙ্গতির বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরে (মাউশিতে) লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছে বঞ্চিত প্রতিষ্ঠান।



অভিযোগ প্রদানকারী একাধিক কলেজ বিবার্তাকে জানায়, এমপিও নীতিমালা ২০২১ এর পরিশিষ্ট ‘খ’ তে উচ্চমাধ্যমিক (মফস্বল) কলেজের ক্ষেত্রে কাম্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বলা হয়েছে, বিজ্ঞান বিভাগের ক্ষেত্রে একাদশে ৩০, দ্বাদশে ৩০ জন অর্থাৎ ৬০ জন। মানবিক / ব্যবসায় শিক্ষার ক্ষেত্রে এক বর্ষে ৪০ জন করে মোট ৮০ জন। মানবিক/ব্যবসায় শিক্ষার সাথে বিজ্ঞান যোগ হলে অর্থাৎ দু’টি বিভাগের ক্ষেত্রে হবে মানবিক/ ব্যবসায় শিক্ষায় এক ইয়ারে ৪০ করে ৮০ জন, তার সাথে বিজ্ঞান বিভাগের ৩০ জন করে ৬০ জন। অর্থাৎ এখানে শিক্ষার্থী হবে ১৪০ জন।



মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা অর্থাৎ দুই বিভাগ থাকলে তখন হবে প্রত্যেক ইয়ারে ৪০ জন করে ৮০ জন। এভাবে দুই বিভাগ মিলে হবে ১৬০ জন। অন্যদিকে, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান অর্থাৎ তিনটি বিভাগ থাকলে তার সংখ্যা হবে ৪০ + ৪০ + ৩০ = ১১০ জন করে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে সর্বমোট ২২০ জন।


২০২১ সালের এই নীতিমালায় পরিশিষ্ট ‘গ’-তে ন্যূনতম পরীক্ষার্থী তিন বিভাগ মিলে ৬০ জন এবং গড় পাসের হার ৫০ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এই ৬০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে কোন বিভাগ থেকে কতজন সেই বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে ‍কিছু বলা হয়নি। ফলে কলেজে দুই বিভাগ থাকলে কতজন পরীক্ষার্থী কিংবা এক বিভাগ থাকলে কতজন পরীক্ষার্থী থাকবে সেই বিষয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা। যার কারণে অনেক কলেজ নীতিমালার শর্ত পূরণ করলেও এমপিওভুক্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই রকম একটি কলেজ, যশোরের সদর উপজেলাধীন নিউ মডেল কলেজ। প্রতিষ্ঠানটি শুধু মানবিক বিভাগে এমপিও এর জন্য আবেদন করেছে। তাদের এমপিও নীতিমালার সব শর্তও বিদ্যমান আছে। কলেজটির তিন বছরের পরীক্ষার্থী গড় ৪৬ জন এবং পাসের হার ৫৩ শতাংশ হলেও কলেজটিকে কাম্য শিক্ষার্থী ও পাসের হার নেই বলে এমপিওভুক্ত করা হয় নাই।


এ বিষয়ে কলেজটির অধ্যক্ষ ড. আলমগীর কবির মিলন বিবার্তাকে বলেন, কেন এমপিওভুক্ত করেন নাই, সেজন্য ওনারা একটা কলাম তৈরি করেছে। ১০৯নং কলামে ওনারা উল্লেখ করেছেন যে, আমার কলেজে কাম্য সংখ্যক পরীক্ষার্থী ও পাসের হার নাই। আমি বলতে চাচ্ছি, ওনারা তিন গ্রুপে একাদশে ভর্তি করাতে বলেছেন ৪০ জন, আর দ্বাদশে ৪০ জন। এক্ষেত্রে যদি কোনো কলেজে শুধু মানবিক থাকে তাহলে একাদশে ৪০ জন এবং দ্বাদশেও ৪০ জন। অর্থাৎ দুই ইয়ার মিলে ৮০ জন শিক্ষার্থী। একাদশ ও দ্বাদশ দুই ইয়ারের শিক্ষার্থীরাতো একসাথে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে না। দ্বাদশ শ্রেণিতে গিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য ফরম ফিলাপ করে।


তিনি বলেন, কাজেই দ্বাদশে ৪০ জন ভর্তি করাতে বলে আপনি তো পরীক্ষার্থী ৬০ জন চাইতে পারেন না। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কখনও শিক্ষার্থী থেকে বেশি হতে পারে না। যে কলেজে সায়েন্স, কমার্স এবং আর্টস- তিনটা গ্রুপ আছে, সেগুলো নিয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা লিখেছেন ৬০ জন। এক্ষেত্রে ২০ জন সায়েন্স, ২০ জন কমার্স এবং ২০ জন আর্টসের হবে, এ বিষয়গুলো নীতিমালায় উল্লেখ নেই। ফলে বিষয়টি স্পষ্ট না করায় সবাই ভাববে যে, তিন গ্রুপের জন্য ৬০ জন। কাজেই এক গ্রুপের জন্য যদি কেউ আবেদন করে, সেক্ষেত্রে ৪০ জন শিক্ষার্থীর জায়গায় পরীক্ষার্থী হবে ২০ জন।


তিনি আরো বলেন, তারা বলেছে- মফস্বল কলেজের ক্ষেত্রে পাসের হার থাকতে হবে ৫০ শতাংশ। তা আমাদের ৫৩ শতাংশ রয়েছে। আরেকটা বিষয়, আমরা শুধু মানবিকের জন্য আবেদন করেছিলাম। আমাদের এখান থেকে প্রত্যেক বছর ৪৬ জন করে পরীক্ষা দিয়েছে। অর্থাৎ যেখানে ২০ জন লাগবে, সেখানে ৪৬ জন পরীক্ষা দিয়েছে। অথচ ওনারা দেখাচ্ছেন, আমাদের কাম্য পরীক্ষার্থী নাই। আর পাশের হারের কথা যখন সচিব মহোদয়কে বললাম, উনি বললেন পাসের হার ঠিক আছে কিন্তু পরীক্ষার্থী সংখ্যা ঠিক নাই। কাজেই একটায় ফেল করলে টোটালটা ফেল হবে।



এই অধ্যক্ষ বলেন, কাম্য পরীক্ষার্থী দুই ইয়ারে ৪০ জন করে ৮০ জন বলতেছেন। তাহলে শিক্ষার্থী যদি এক ইয়ারে ৪০ জন হয় তাহলে পরীক্ষার্থী কখনো ৪০ এর অধিক হতে পারে না। তখন তিনি আমাকে বললেন, আমাদের নীতিমালা একটা অস্পষ্টতা রয়েছে। আমি এটা চাইলেও সমাধান করতে পারবো না। এক্ষেত্রে আপনার কোর্ট করা উচিত। কোর্ট যখন রুল জারি করবে, তখন এটা সংশোধন করা যেতে পারে।



যশোরের কেশবপুরের সাউথ বেঙ্গল কলেজও একইভাবে নীতিমালার শর্ত পূরণ করে এমপিও থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মাহবুবুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, অযৌক্তিকভাবে আমাদের কলেজকে এমপিওভুক্ত করা হয়নি। যেখানে তিন বিভাগ মিলে পরীক্ষার্থী চাওয়া হয়েছে ৬০ জন। সেখানে আমাদের এক বিভাগ অর্থাৎ মানবিক বিভাগ চালু আছে। তাই তিন বিভাগের পরীক্ষার্থী ৬০ হলে, এই বিভাগে ২০ জন হওয়ার কথা।


তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে এক বিভাগে শিক্ষার্থী আছে ৪৫ জন, সেখানে পরীক্ষার্থী ৬০ জন হবে কিভাবে? নীতিমালায় কোন বিভাগ থেকে কতজন পরীক্ষার্থী থাকবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা নাই।


এমপিও নীতিমালায় অস্পষ্টতার বিষয়ে জানতে চাইলে এমপিও আপিল কমিটির সভাপতি ও অতিরিক্ত সচিব মো. আবু ইউসুফ মিয়া বিবার্তাকে বলেন, নীতিমালা ভালো করে পড়েন, সেখানে ক্লিয়ার বলা আছে। এখানে কোন অস্পষ্টতা নেই। যারা অভিযোগ করেছে, তাদেরকে নীতিমালা ভালো করে পড়তে বলেন।


এমপিও নীতিমালা সম্পর্কে জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবু বকর ছিদ্দীককে গতকাল সকালে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। পরে তাকে নিউজের বিষয়বস্তু লিখে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়। ওইদিন বিকালে কল দেয়া হলে তিনি প্রতিবেদকের পরিচয় জেনে বলেন, আপনি আমাকে এতোবার কল দিয়েছেন কেনো? পরে প্রতিবেদক এমপিও নীতিমালা বিষয়ে মন্তব্য জানার ছিল বললে তিনি বলেন, আমি ব্যস্ত আছি। কাজেই কোনো মন্তব্য এখন দিতে পারবো না।