“গ্লোবাল ডে অব প্যারেন্টস”

“গ্লোবাল ডে অব প্যারেন্টস”
ad

তাপস কুমার পাল: আজ ১লা জুন সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে “গ্লোবাল ডে অব প্যারেন্টস”। আজ এই দিনে স্মরণ করা হচ্ছে বিশ্বের সব বাবা-মাকে যারা তাদের ত্যাগ, কষ্ট, ধৈর্য সহকারে সন্তানকে লালন-পালন করে গড়ে তুলেছেন এবং সারা জীবন তাদের স্নেহের বন্ধনে বেঁধে রেখেছেন।

আগে প্যারেন্টস ডে পালন করা হত জুলাই মাসের চতুর্থ রবিবার। ১৯৯৪ সালে তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ১লা জুনকে প্যারেন্টস ডে পালন করার জন্য অনুমোদন দেন। এরপর থেকে এই দিনটি যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের প্রতিটি মানুষ তাদের সব থেকে আপন মানুষ বাবা-মা’র সাথে দিনটি উদযাপন করে আসছে।

পৃথিবীর প্রতিটা দেশে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছেই তাদের বাবা-মা হল প্রথম অভিভাবক যাদের মাধ্যমেই সন্তানের পথ চলা শুরু হয়। বাবা-মা হল প্রথম শিক্ষক যাদের মাধ্যমেই শুরু হয় আমাদের শিক্ষার প্রথম স্তর এবং এই শিক্ষাই আমাদের পরবর্তী সুখী সমৃদ্ধশালী জীবন গড়ার পথ করে দেয়।

একটা সন্তান যখন পৃথিবীর আলো দেখে তখন বাবা-মা তাদের সর্ব সুখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানের সুখকেই নিজেদের সুখ হিসাবে মেনে নেন। গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন তাদের স্বপ্নের মানুষ হিসাবে।

এক গবেষণায় বলা হয় একটা সন্তানের পরবর্তী উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করে তাঁর বাবার মানসিক চিন্তা চেতনা এবং জীবন দর্শনের মনোভাব থেকে। একটা সন্তানের কাছে তাঁর বাবা হল তাঁর স্বপ্নের নায়ক। উন্নত দেশতো বটেই, আমাদের দেশেও সন্তানের ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠার প্রধান চাবিকাঠি হিসাবে তাঁর বাবার অবদানকেই স্বীকার করা হয়।

অপরদিকে, সন্তানের সামাজিক বন্ধন গঠনে মায়ের ভূমিকা আরও বেশী তাৎপর্যপূর্ণ। একটি সন্তানের যত্ন নেওয়া থেকে শুরু করে তাঁর প্রাথমিক রুটিরুজির ব্যবস্থা থাকে একজন মায়ের কাছে। একজন মায়ের সাথে তাঁর সন্তানের সম্পর্কের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠে সমাজের প্রতি ওই সন্তানের দায়িত্ববোধ। গবেষণায় দেখা গেছে অনুন্নত বিশ্বে একটা বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময় তাঁর মায়ের ৩০০ বার মৃত্যু হবার সম্ভাবনা থাকে।

এই যে আমাদের জন্য আমাদের বাবা-মা এতো কষ্ট করেন বিনিময়ে আমারা তাদের কি কিছু দিতে পেরেছি? আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাবা-মা তাঁর সন্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাদের মনে একটু সুপ্ত বাসনা থাকে সন্তান বড় হয়ে তাদের দেখাশুনার ভার নিবেন। আমরা কি আমাদের দায়িত্ব ঠিক মত পালন করতে পারছি।

কিছুদিন আগে বয়স্ক পিতামাতাকে দেখভাল করার জন্য বাংলাদেশে একটা আইন করা হয়েছে। সম্প্রতি চীনের সাংহাইতে বয়স্ক পিতামাতাকে দেখভাল না করলে সন্তানকে শাস্তি দেয়ার বিধান রেখে একটি আইন করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আইন করে কি বয়স্ক পিতামাতাকে দেখাশোনায় বাধ্য করা সম্ভব?

বাবা-মা দেখভাল করতে পারছেন না বলে সন্তান বিগড়ে যাচ্ছে, এই অভিযোগ হরহামেশাই আমাদের শুনতে হচ্ছে। তেমনি এই আধুনিক যুগে পিতামাতার দেখভাল করতে অনাগ্রহী সন্তানদেরও সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের পারিবারিক বন্ধন আগের মত দৃঢ় না থাকার কারণেই বাড়ছে এমন ঘটনা, অভিমত দিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

পারিবারিক বন্ধনের চিত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন বলেন, গ্রাম এলাকায় এখনো পারিবারিক বন্ধন অটুট আছে। যা ঝামেলা হচ্ছে তা আমাদের শহরাঞ্চলে। নগরায়নের প্রভাবে এখন একক পরিবারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আমাদের ব্যস্ত জীবনে আমাদের প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কও এখন আর আগের মত রাখতে পারছি না।

এই সমাজবিজ্ঞানীর মতে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বাবা-মা’র বিবাহ বিচ্ছেদ হলে সন্তান দুইজনের কাছেই যেতে পারেন। বাংলাদেশে কোন দম্পতির বিবাহ বিচ্ছেদ হলে সন্তানদের সাথে যোগাযোগ ভালো চোখে দেখে না। সন্তানদের উপর এই প্রভাব সারাজীবন থাকে। এর ফলে আস্তে আস্তে সামজিক বন্ধনগুলো তাঁর নিজস্বতা হারাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য।

এখন প্রায় প্রতিটি দেশে আইন করা হচ্ছে, বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতার দেখাশুনা না করলে শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে বৃদ্ধ বয়সে সরকার বয়স্কদের দায়িত্ব নেন কিন্তু আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে কি এইটা সম্ভব। আইন করে যদি বাবা-মাকে প্রতিপালন করার ব্যবস্থা করা যায় তবে তাকে অবশ্যই সাধুবাদ জানানো উচিত।

ad