‘পরিশেষে পাঠকদের জন্য একটা কুইজ দিয়ে গেলাম’

babu
ad

ব্যান্ড সঙ্গীত বলতে যা বোঝায় তা আমাদের শ্রোতারা আদৌ বুঝে উঠতে পেরেছেন কিনা, সে ব্যপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। দেশ স্বাধীন হবার পরপরই ‘স্পন্দন’ এর হাত ধরে আমাদের পপ মিউজিকে পদার্পণ যার সৃষ্টির পেছনের নায়কের নাম শেখ কামাল।

যদিও তার আগেই ‘ঝিঙা শিল্পীগোষ্ঠী’ তৎকালীন গোটা পূর্ব পাকিস্তানেই আলোড়ন তুলে ফেলেছিল। তবে সেখানের আবেদন ছিল লায়লা জামান, সাফায়াত আলী, কাদেরী কিবরিয়া, নিঘাত আলীদের কম্পোজিশনে একদম সাদামাটা শব্দ আর কিছুটা ক্যাবারে ঢঙের সুরের মূর্ছনায় এক ধরনের নতুনত্ব গান, যা শুধুই উপরতলার মানুষের মনোবিনোদনেই পরিণত হয়েছিল। সাধারণ মানুষদের হৃদয় কতটা প্রকম্পিত করেছিল, সে আলোচনায় নাই বা গেলাম। এই পরিপেক্ষিতে বর্তমান বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রবর্তক যদি ‘ঝিঙা শিল্পীগোষ্টীকে’ বলা হয়, তবে ভুলও হবে না।

পশ্চিমের মাথা তুলে দাঁড়ানো বিটলস, রোলিং স্টোন, পিঙ্ক ফ্লয়েড, রবার্ট প্লান্ট, ঈগলস ,ডিপ পার্পেল, ইউরিয়া হিপ, ফ্লিট উড ম্যাক, জিম হেনড্রিক্স, বব ডিলান, জোয়ান বায়েজদের গান যখন শুনতে শুরু করলাম তখন বুঝলাম না! পপ, রক এন্ড রোল, রক বা হার্ড রক ব্যান্ড মানেই নিছক গান গাওয়া নয়। এ হলো সমাজ বদলের। দিন বদলের হাতিয়ার।

ব্যান্ড মানেই শুধুই এন্টারটেইনমেন্ট নয়, এ হলো ঘুণে ধরা বুড়ো পৃথিবীটাকে নতুনদের হাতে সংস্কার করা। মানবতার কথা মানব সমাজে ছড়িয়ে দেয়া, যা শত শত বছর আগেই যখন কলোম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের পূর্বেই আমাদেরই একজন বিখ্যাত বাঙালী কবি বলে গিয়েছিলেন তাঁর কবিতার ছন্দে, “শোনো হে মানুষ ভাই……….সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর নাই ।”(কবির নামটি ইচ্ছা করেই লিখলাম না যাতে আপনাদের যাদের আগ্রহ থাকবে তারা খুঁজে বের করে নেবেন ,তাতে শেখাটা অন্তরে গেঁথে যাবে, আপনি হবেন আদর্শ বাঙালী।)

কিন্তু সেই কবির দেশে আজ যখন দেখি, বঙ্গবন্ধুর ডাকে মাত্র নয় মাসে ৩০ লাখ মানুষ হারিয়ে, লাখো নারীর সম্ভ্রমের ত্যাগের বিনিময় স্বাধীন হবার পরেও আজও এই দেশে স্বাধীনতা বিরোধীদেরই জয়জয়কার, তখন মনে হয় বঙ্গবন্ধু একটা অকৃতজ্ঞ, স্বাধীন হবার যোগ্যতাহীন জাতিকে তার পাওনার চাইতেও বেশি দিয়ে গেছেন। যে স্বাধীনতার ও বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন করতেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি ।

দেশ স্বাধীন হবার পর দেশের তরুণদের প্রগতিশীল সৃষ্টিকর্মকে তুলে ধরবার জন্য বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ‘স্পন্দন’ নামের ব্যান্ডটির ছাতার নিচে জড়ো হয় তখনকার কিছু তরুণ শিল্পী যেমন- নাসির আহমেদ অপু, আজম খান, ফিরোজ শাই, ফেরদৌস ওয়াহিদ, লাকি আখন্দ, হ্যাপি আখন্দ প্রমুখ।

অপু ভাইয়ের তখনকার প্রত্যেকটা গান শুধুই তরুণদেরই আন্দোলিতই করে নাই, বরং তারুণ্য ছাড়িয়ে আমাদের মতো শিশু-কিশোরদেরকেও আন্দোলিত করেছিল। তার ‘সাজিয়ে গুছিয়ে দে মোরে সজনী তোরা’,’স্মৃতিরও সেই পথে আজও’, ‘রিতা যেওনা চলে’, ‘ও গড়িয়া’, ‘এমন একটা মা দেনা’র মতো অনেক গানই উল্লেখ করা যেতে পারে।

সদ্য মুক্তিযুদ্ধ ফেরত মুক্তিযোদ্ধা আজম খান এলেন ‘উচ্চারণ’ নিয়ে। গাইলেন,’হাইকোর্টের ওই মাজারে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’,’রেল লাইনের ওই বস্তিতে’ ইত্যাদি। নব্য স্বাধীন দেশের তরুণরা দেশের হাজারো সমস্যার মাঝেও নিজেদেরকে পরিচালিত করবার প্রয়াস পেলেন এক নতুনত্বের নান্দনিক পথে।

যে স্বীকৃতি ২০১৭ সালে সুদূর উত্তর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার ক্রিকেট বোর্ড তাকে দিয়েছেন “শেখ কামাল স্মৃতি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট খেলাটি শুরু করে, যা ছিল খোদ আমেরিকানদের একটা টুর্নামেন্ট, বাঙালীদের নয়। আর এই টুর্নামেন্টটি তারা করেছিলেন শেখ কামালের অসাধারণ ক্যারিশমেটিক সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতির মূল্যায়ন করে।

যিনি একজন জাতির পিতার সন্তান হয়েও ক্ষমতার মোহে না জড়িয়ে, জাতির যুবসমাজকে একটা সঠিক সৃজনশীলপথেই পরিচালিত করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। হায়রে বাংলাদেশ একজন সৃজনশীল মানুষকে কত সহজেই আমরা ‘ব্যাংক ডাকাত’ বানিয়েছিলাম। অথচ পশ্চিমের মানুষগুলো তাকে ঠিকই খুঁজে বের করে সম্মানিত করে আমাদের মুখের ওপর একদলা ‘ছি’ ছুড়ে মারল।

আবার ওই টুর্নামেন্টকেই কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের ব্যক্তিগত কোন্দলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কিছু স্থানীয় নেতা-কর্মীরা এর বিরোধিতা করেছিলেন ওই মাঠেরই এক কোণায় জামায়াত-বিএনপির সহযোগিতায় আরও একটি টুর্নামেন্ট দিয়ে, যাতে লস এঞ্জেলেসের কনস্যুলেটও সেদিন এর পেছন থেকে ঘি ঢেলেছিলেন।

কিন্তু ঠেকানো যায়নি ক্যালিফোর্নিয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার রবি আলমকে। তিনি সফলতার সাথেই ক্যালিফোর্নিয়া ক্রিকেট বোর্ডের কাছে শেখ কামালের কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে পেরেছিলেন। বিনিময় উত্তর আমেরিকাতে ‘শেখ কামাল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট’। সত্যকে চাপানো যায়না। আজ শেখ কামালের প্রতিভা, গুনাগুন বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়েও সুদূর আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে জামায়াত-বিএনপি ও মোস্তাকদের মুখে ছাই দিয়ে।

১৯৭৫ সাল, বাঙালী জাতির কালো অধ্যায়। তরুণদেরকে সরকারি তত্ত্বাবধানে জাহাজে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো প্রমোদ ভ্রমণে। সেখানে তরুণরা পরিচিত হলো বিলাস, অর্থ, আর ক্ষমতার শিল্পে। এ যেন তরুণদের বাঙালী অন্তরচক্ষুকে এক ধরনের ঘুম পাড়িয়ে রাখা।

চারিদিকে শুরু হলো আমার আমিত্বের বাহবা দেবার সঙ্গীত যজ্ঞ। এ আবহাওয়ায় সেইসব তরুণদের কেউ কেউ হারিয়ে গেলেন, কেউ মরেও বেঁচে থাকবার করুণ যুদ্ধ করে গেলেন, আবার কেউ কেউ হাওয়ায় গা ভাসালেন, হয়ে উঠলেন এক একজন ক্ষমতাশীল ধনকুব।

এরপর এল ক্ষণজন্মা এক কবি ‘রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ’। যিনি একজন পাকিবান্ধব ঘরে জন্মালেও নিজের ঘরেই বিদ্রোহ করে বসলেন, লিখলেন তখনকার সবচাইতে সাহসী কাব্য- জাতির পতাকা খামচে ধরেছে সেই চেনা শকুন।’

রুদ্রর পথ ধরেই সদ্য ইংরেজি ব্যান্ড ‘ফ্রিজিং পয়েন্ট’ থেকে আসা টগবগে তরুণ টুলু আর আমি ভাবলাম এবার বাংলায় কথা বলতে হবে। দাঁড়াতে হবে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সঙ্গীতের হাতিয়ার নিয়ে। আমরা সৃষ্টি করলাম ‘চাইম’, যার ভাবার্থ হলো একমত হওয়া।

চাইমের প্রথম লাইনআপ হলো- টুলু (বেজ গিটার, ভোকাল), শামীম (ভোকাল ), বাবু (ড্রাম ), টফি (কী-বোর্ড ), আর আমি (লিড গিটার, ভোকাল )। আমাদের সবার পছন্দের বন্ধু, টম হলো আমাদের তত্ত্বাবধায়ক অর্থাৎ ব্যান্ড ম্যানেজার। এরপর লাইনআপ বদল হয়ে এলো- ইমন (কী-বোর্ড ) ও সালেহ (ইংরেজি ভোকাল)। এরপর যুক্ত হলো খালিদ (ভোকাল), তারপর টিপু (ইংরেজি ভোকল) এরপর সুমন (ইংরেজি ভোকাল)।

উল্লেখ্য, অবসকিউর সৃষ্টির আগ পর্যন্ত টিপু আমাদের ইংরেজি গানের ভোকাল ছিল। খালিদের চাইমের সাথে যুক্ত হবারও একটা সুন্দর গল্প রয়েছে, যা পরে কখনও বলবো। বাবু তখন একই সাথে আমাদের সাথেও বাজাচ্ছে, আবার আজম ভাইয়ের সাথেও বাজাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমাদের সাথে মাঝে মাঝেই ড্রাম বাজালো জিয়া, নাঈম থাকল আমাদের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হয়ে। তবে আমাদের কয়েকটা গানের রেকর্ডিংয়ে মাইলসের মানাম কী-বোর্ড বাজিয়েছিল।

আমি আর টুলু ক্লাস সিক্স থেকে একসাথে পড়ি। তখন থেকেই আমরা হয়ে উঠলাম সবচাইতে কাছের বন্ধু। সেই ছোটবেলায়ই আমরা দুজনে অনেকগুলো মহল্লায় প্রোগ্রাম করি একসাথে। ছোটবেলা থেকেই আমি ওর বন্ধু আবার ছাত্র। ওর আদ্যোপ্রান্ত ছিল সঙ্গীতে ভরপুর। সেই ছোটবেলায় ওর কাছ থেকে শিখেছি কোনটা বিট আর কোনটা অফবিট। আমরা এক সাথে গান গাইতাম ওর বংগো সঙ্গতে। সেই সময়েই ও যেভাবে বংগো বাজাতো, তা অনেক বড় বড় বাদকদেরও অভিভূত করতো। আমি কাছে ওরই সেই বংগো দিয়েই ওর কাছেই বংগো বাজানো শিখে নিলাম।

হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলাম ও একটা গিটার বাজাচ্ছে। আমি বললাম, তুই গিটার বাজাইস? আমিও বাজাবো। সেইদিন থেকে টুলুর কাছেই আমার গিটারে হাতেখড়ি। টুলুর গিটারেই আমার গিটার শেখা। আমার সঙ্গীত ভাণ্ডারে যা কিছু আছে, তার প্রায় সবটাই টুলুর থেকেই নেয়া। আমাদের প্রত্যেক দিনক্ষণ সবই ছিল সঙ্গীত কেন্দ্রিক। টুলুর হাত ধরেই আমি জয়েন করলাম শুভ্রর ইংরেজি ব্যান্ড ‘ফ্রিজিং পয়েন্টে’।

শুভ্র উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডন চলে যাবার পর টুলু আর আমি এবার সৃষ্টি করলাম চাইমকে। অতঃপর যুক্ত হতে থাকলো অন্যান্য বন্ধুরা। চাইম সৃষ্টির গল্পটাও এক সময় বলবো। আমার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মনটা সহজেই আমার বাল্যবন্ধু টুলুকে উদ্বুদ্ধ করতে পারলো যে, অন্যরকম কিছু একটা করতে হবে। ব্যান্ড শুধুই গান করবার জন্য নয়, তা হতে হবে মানুষের গান বা মানুষেরই প্রয়োজনে সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে তুলে ধরা। সাথে যোগ হলো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগানো ।আমরা একমত হলাম। চাইম হাটতে শুরু করলো।

টুলু সৃষ্টি করল- ‘আমার জন্য লিখো শুধু একটাই গান ,গান শুধু নয় ,হবে সবারই প্রাণ (বক্তব্য)’, ‘সাত খানি মন বেঁধেছি আমরা আজ এক সুরে জনপথ জনস্রোত মানুষের মন দেখবো ঘুরে ঘুরে (গন্তব্য )’, ‘পড়ালেখা শেষ করে বেকারত্বে ধুকে মরা (বেকারত্ব),’ ‘আমাকে দিয়ে বিধাতা সৃষ্টি করালেন, আমরা বাঙালী (জীবনের ডাক )’।

যখন বাংলাদেশ থেকে বাঙালী শব্দটিই হারিয়ে সবাই কেমন যেন শুধুই বাংলাদেশী হয়ে যাচ্ছিল তখন সৃষ্টি হলো- কীর্তন খোলা (স্মৃতিচারণ ) আর টেন্ডার ফর লিভিং। তৎকালীন বিখ্যাত কার্টুনিস্ট রণবীর ‘টোকাই’কে টুলু তার সৃষ্টির মাঝে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলল যা যেকোনো মানুষকেই সহজেই ছুঁয়ে যেতো।

এর বাইরে আমরা যা করলাম তা ছিল, হারিয়ে যাওয়া লোকজ সঙ্গীতকে গানে বা মিউজিকে আবার নতুন করে তুলে ধরা। চাইমের প্রত্যেকটা সৃষ্টির পেছনে এক একটা ঘটনা বা সময় ধরে রাখা আছে । পরে হয়তো এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত লিখবো । আজ শুধুই আপনাদের জানাবো সেদিন কেন আমরা লুঙ্গি, ফতুয়া পরে বিটিভিতে পারফর্ম করেছিলাম।

১৯৮৮ সালের বন্যার পর হঠাৎ একদিন মাকসুদ ভাই (ফিডব্যাক) বললেন, বন্যার্তদের সাহায্য করার জন্য একটা জয়েন্ট কনসার্ট হতে যাচ্ছে। শেরাটন হোটেলের জেনারেল ম্যানেজারের মেয়ে রেবেকা এর উদ্যোক্তা, তোমাদের জানানো হয়নি? আমি বললাম না আমরা কিছুই জানি না। মাকসুদ ভাই বললেন, মানে কি আমি তো তোমাদের কথা তাকে বলেছি। ঠিক আছে, কাল বিকালে পরিবাগে আসো, ওখানে এই কনসার্টের মিটিং আছে।

যথারীতি পরেরদিন আমরা হাজির হলাম। ওখানে গিয়ে যে পরিস্থিতি দেখলাম তাতে মনে হলো এ যেন ইস্ট লন্ডনের কোনো একটা হলে মিটিং করতে এসেছি যেখানে সবাই আধো বাংলা আর ইংরেজিতে কথা বলছে। ওখানে কনভেন্টে পড়া হামিনদের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে খাঁটি বাংলা ইশকুলে পড়া অনেকেই অনেক কসরত করে ইংরেজি বলছেন শুধু মাত্র এক রেবেকাকে কেন্দ্র করে। অথচ বাঙালীর সন্তান রেবেকা খুব ভালোই বাংলা বলেন ও বোঝেন।

মাকসুদ ভাই আমাদের কথা উল্লেখ করলেন। কিন্তু রেবেকা আমাদেরকে অনেকটা তাচ্ছিল্যের সাথেই বললেন, (যা তার মাথায় আগেই ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল মনে করছি) তোমাদের গান শুনতে কয়জন দর্শক আসবে? দুইদিনের কনসার্টে এইসব ফেমাস ব্যান্ডের মধ্যে তোমাদের কিভাবে একোমোডেট করবো? অথচ তখন চলছে আমাদের জয়জয়কার গোটা বাংলাদেশ জুড়ে। আর ওখানে যেসব ব্যান্ড ছিল তাদের অনেকের নামের আগে ব্যান্ডের ‘ব’ পর্যন্ত যুক্ত হয়নি তখনও।

রেবেকার হুল ফোটানো কথাগুলো নীরবে হজম করলাম। এবার আমাদের পালা উত্তর দেবার। কথাগুলো আমিই বললাম খাঁটি বাংলা শব্দে, তোমাদের দুইদিনের কনসার্টের একদিন শুধুই চাইমকে দিয়ে দাও। তাতে তোমাদের অন্যদিনের চাইতে যদি দর্শক বেশি না আসে, টিকিট কম বিক্রি হয় তবে টিকিটের বাকি টাকা চাইম পেমেন্ট করে দেবে।

এবার হোঁচট খেলো রেবেকা। আর মাকসুদ ভাইও ঝাঁপিয়ে পড়লেন আমাদের হয়ে। তারপর আমরাও কনসার্টটি করলাম। সেখানেও অনেকগুলো গল্প আছে যা পরে কখনও বলবো। সেই কনসার্টে কত টাকা উঠেছিল তা আমরা কখনোই জানতে পারিনি। শুধু জানি আমাদের কনসার্টে হল ফুল হবার পরও অতিরিক্ত মানুষ ঢুকাতে হয়েছিল যারা দাঁড়িয়েই ছিল। শুধু জানি, সেই কনসার্টের টাকা রেবেকাসহ হামিনরা কয়েকজন মিলে স্বৈরাচার এরশাদের হাতে দিয়ে এসে বিটিভির রাতের সংবাদ হয়েছিল।

সেদিন থেকেই আমাদের ভাবনা হয়েছিল, ব্যান্ড মিউজিকটাকে আপামর জনতার কাছে নিতে হবে। গিটার, ড্রাম, কী-বোর্ড এগুলো কি শুধুই উপর তলার মিউজিক? না, তাতো নয়। এগুলোতো স্রেফ যন্ত্র, যা আমরা বাঙ্গালীরাই বাজাচ্ছি, আমাদেরই মতো করে। পশ্চিমের ব্যান্ডদের কাছ থেকে তো আমরা শিখেছি কিভাবে এটার ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ের গোপন কষ্ট, ভালোবাসা, মূল্যবোধ ও ঘুমন্ত বিবেককে জাগানো যায়।
সেই থেকেই মাথায় আইডিয়া আসলো লুঙ্গি, ফতুয়া আর গামছার সাথেই বেঁধে ফেলতে হবে এইসব পশ্চিমের যন্ত্রগুলোকে ঠিক তেমন করে, যেমন করে রেডিও ,ট্রানজিস্টার, রেকর্ড প্লেয়ার, টেলিভিশন আজ সাধারণ মানুষদের নিজের হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময় টুলুর মামা হাফিজুর রহমানের লেখা ও সুরে এই গানটা পাওয়া গেলো। আমরা আমাদের কাজে নেমে গেলাম। কি করতে পারলাম আর কি করতে পারলাম না সেটা আপনাদের মতামতের জন্যই থাকলো । শুধু জানি আমরা (চাইম) যা কিছুই করেছি তা একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই করেছি। যা ছিল সমাজ এর কল্যাণে, সমাজ ভাঙার গান। আজকের মতো সেলিব্রেটি বা ফ্যান পেজ খোলার মতো নয়।

ব্যান্ড মানেই কতগুলো যন্ত্রী বাজাবে আর একজন সামনে দাঁড়িয়ে হিরোর মতো গান গেয়ে যাওয়া নয়। ব্যান্ড মানেই প্রত্যেকটি সদস্যের সম্মিলিত মেধার সমন্বয়ে প্রকাশ করা একটা শিল্প, যেখানে একক ব্যক্তির নামের ওপর কিছুই গড়ে ওঠে না। সেখানে সবগুলো ব্যক্তির নাম মিলেই একটা নাম বা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে যেমন ‘চাইম’, সাতজন মানুষের একমত হওয়া বা এক সাথে একই শিল্পসত্তা হয়ে গড়ে ওঠা। যা শুধুই মানুষের কল্যাণে।

পরিশেষে পাঠকদের জন্য একটা কুইজ দিয়ে গেলাম, খুঁজে বের করুন তো, সেই কবির নামটি কি? যিনি লিখেছিলেন ‘শোনো যে মানুষ ভাই……….সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর নাই’।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু

লেখক:
আল আমিন বাবু (চাইম)
লস এঞ্জেলেস

ad