বঙ্গবন্ধুই বিশ্বের দরবারে বাঙালির মাথা উঁচু করে দিয়েছেন

turin afroz
ad

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল প্রবক্তা। যখনই বাঙালিদের ওপর কোনো আঘাত এসেছে তখনই তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক নেতা থেকে বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে জাতির জনক। তার পুরোটা জীবন কেটেছে বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়ে। তিনি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা এবং জাতীয়তাবাদের আলোয় উদ্ভাসিত একজন রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর জন্ম না হলে বাঙালি স্বাধীনতাই পেত না। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যাপারে এই দাবি পুরোপুরি যৌক্তিক।

বঙ্গবন্ধুর সব আন্দোলনের একটিই উদ্দেশ্য ছিল। আর তা হচ্ছে বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা। বাঙালি জাতির জাতিসত্ত্বার ওপর যখনই আঘাত এসেছে তখনই বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদমুখর হয়ে সেই আঘাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, আইয়ুবের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ১৯৭০-এর নির্বাচন- যখনই বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে এসেছে তিনি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বজ্র কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

১৯৭০-এর নির্বাচনে জয়লাভের পর যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে তখন তিনি তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণেও জাতীয়তাবাদকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলেন। তিনি বলেন, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, তারা বাঁচতে চায়। তারা অধিকার পেতে চায়। নির্বাচনে আপনারা সম্পূর্ণভাবে আমাকে এবং আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন শাসনতন্ত্র রচনার জন্য। আশা ছিল জাতীয় পরিষদ বসবে, আমরা শাসনতন্ত্র তৈরি করব এবং এই শাসনতন্ত্রে মানুষ তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস, বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, রক্তদানের করুণ ইতিহাস। নির্যাতিত মানুষের কান্নার ইতিহাস।

অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের আলোকে উদ্ভাসিত। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে দেশ স্বাধীন হলো। বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন তার কাঙ্খিত সোনার বাংলায়। রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু তার দেশের মাটিতে আরও জোরালোভাবে দিলেন জাতীয়তাবাদের ঘোষণা। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বললেন, ‘জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল চরম মরণ সংগ্রামে। জাতীয়তাবাদ না হলে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে আমরা এগিয়ে গিয়েছি। … এই যে জাতীয়তাবাদ, সে সম্পর্কে আমি একটা কথা বলতে চাই। ভাষাই বলুন, শিক্ষাই বলুন, সভ্যতাই বলুন, আর কৃষ্টিই বলুন, সবার সঙ্গে একটা জিনিস রয়েছে, সেটা হলো অনুভূতি। … অনেক দেশ আছে একই ভাষা, একই ধর্ম, একই সবকিছু, কিন্তু সেখানে বিভিন্ন জাতি গড়ে উঠেছে, তারা একটি জাতিতে পরিণত হতে পারেনি। জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির ওপর। আজ বাঙালি জাতি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে; এই সংগ্রাম হয়েছিল যার ওপর ভিত্তি করে সেই অনুভূতি আছে বলেই আজকে আমি বাঙালি, আমার বাঙালি জাতীয়তাবাদ।’

অতি সাধারণ ভাষায় তিনি জাতীয়তাবাদের যে গভীর ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা সত্যিই অনন্য। তিনি প্রথমেই বলেছেন, জাতীয়তাবাদ না হলে একটি জাতি এগোতে পারে না এবং জাতি হিসেবে আমাদের এগিয়ে যাবার মূলনীতি হবে জাতীয়তাবাদ। কাজেই আমরা দেখতে পাই রাজনৈতিক নেতা থেকে বঙ্গবন্ধু পরবর্তীতে জাতির জনক-তার পুরো জীবনই কেটেছে বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়ে। তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা এবং জাতীয়তাবাদের আলোয় উদ্ভাসিত একজন রাষ্ট্রনায়ক।

বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। তিনি তার এক ভাষণে বলেছেন ‘সাম্প্রদায়িকতা যেন মাথাচারা দিয়ে উঠতে না পারে। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। মুসলমান তার ধর্মকর্ম করবে। হিন্দু তার ধর্মকর্ম করবে। বৌদ্ধ তার ধর্মকর্ম করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না’। ১৯৭২’র সংবিধানে বঙ্গবন্ধু তার চিন্তার প্রতিফলন ঘটান। কিন্তু তার পরের ইতিহাস বাঙালি জাতির অন্ধকার যুগের ইতিহাস। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। অবৈধভাবে সামরিক জান্তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। সংবিধানে একের পর এক অবৈধ সংশোধনী আনা হয়। ১৯৭২’র সংবিধানকে ভূলুণ্ঠিত করে পাকিস্তানি চেতনার আলোকে একের পর এক সংশোধনী আনা হয়। পাকিস্তানি পরাজিত শক্তির দোসরদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়। সমাজে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প রোপণ করা হয়। সমাজ এক ভুল ইতিহাস ও মূল্যবোধের চোরাবালিতে নিমজ্জিত হতে থাকে।

ইতিহাসের বিশাল এক সময় ধরে চলে এই অধঃপতন। অবৈধ সামরিক সরকারের আমলে রোপিত সাম্প্রদায়িকতার বৃক্ষটি সমাজে ডাল-পালা ছড়িয়ে বটবৃক্ষে পরিণত হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।

একটি সরকারের পক্ষে সাম্প্রদায়িকতাকে একা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠন বা রাষ্ট্র ধর্মের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সমাজকে সেই মোতাবেক তৈরি করতে হবে এবং সেই তৈরির দায়িত্ব কিন্তু সবার। সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। সমাজকে তৈরি না করে যে কোনো আইন চাপিয়ে দিলে তা সমাজের জন্য বুমেরাং হয়ে যেতে পারে।

আমাদের দেশের ইতিহাসে একটি লম্বা সময় ধরে পাকিস্তানি মনোভাবাপন্ন অবৈধ সামরিক শাসকেরা এবং তাদের সমর্থকেরা দেশ পরিচালনা করেছেন। তারা সে সময় তাদের পাকিস্তানি ভাবধারা অনুযায়ী বিভিন্নভাবে সংবিধানকে কাটাছেঁড়া ও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ-এর মতো কালা আইনও করেছেন। যা ছিল বঙ্গবন্ধুর চিন্তার সঙ্গে পরিপূর্ণ সাংঘর্ষিক। পরে আমরা দেখেছি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় বসিয়ে এদেশকে পাকিস্তান বানানোর চক্রান্ত করা হয়েছে। তবে আশার বিষয় আওয়ামী লীগ সরকার এসব চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতো জঘন্য কালা আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছে। পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছে। ধন্যবাদ দিতে হয় আমাদের উচ্চ আদালতকেও যেখান থেকে কিছু যুগান্তকারী রায় এসেছে এসব অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী ও তাদের কৃত সংশোধনের বিরুদ্ধে। সর্বোপরি আমি আশাবাদী যে আমরা শিগগিরই এমন একটি আইনি ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারব যেখানে বঙ্গবন্ধুর চিন্তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন আমরা দেখব।

মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা অস্বীকার করা মানে প্রকারান্তরে মুক্তিযুদ্ধকেই অস্বীকার করা। মনে রাখতে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধু না জন্মালে বাঙালি জাতি কোনো দিন-ই স্বাধীনতা পেত না। আমরা যদি এবার আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ষষ্ঠ এবং সপ্তম তফসিল স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্রের মূল পাঠকে সংবিধানের সঙ্গে সংযোজিত করেছে। কিন্তু যেটা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই সেটা হলো, ১৯৭২ সালের আদি সংবিধান থেকেই এই দুটি বিষয় আমাদের সংবিধানের অন্তর্গত করা হয়েছে। আমাদের সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্র দুটি আমাদের সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। সংবিধানের চতুর্থ তফসিলেও স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্র ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি হিসেবে চিহ্নিত করে সংবিধানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। একইভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত রয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হচ্ছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি। সুতরাং এই বিষয় নিয়ে বিতর্ক অর্থহীন ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।

ad