শহীদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্য একটি প্রদীপ্ত সংগ্রামী নাম

মানুষ তাঁর পরিবেশের সাথে একান্ত, নিবিরভাবে সম্পৃক্ত থাকে। কারন তাহাকে বাঁচতে হয় পরিবেশের সাথে যোগাযোগ ও আদান প্রদানের মাধ্যমে। আমারা সবাই জানি ও বুঝি, পারিপার্শ্বিকতা উপেক্ষা করে আমরা বাঁচতে পারিনা। তারপরও দেখা যায় আমরা আমাদের করনীয় সম্বন্ধে সচেতন নাই। প্রসঙ্গত বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের একটা গানের কথা মনে পড়ে-’তুমি কেমন করে গান কর হে গুনী, আমি অবাক হয়ে শুনি, শুধু শনি।’ আমাদের গ্রাম আর প্যারী মোহন আদিত্যের গ্রাম পাশাপাশি। আমরা খুব বেশী ছোট বড় ছিলাম না। শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের পরম ভক্ত ছিলেন প্যারী মোহন আদিত্য। সেই সুবাদে পাকুটিয়াতে সৎসঙ্গ আশ্রম গড়ে ওঠে। আমরা আশ্রমের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। প্যারী মোহন আদিত্য গল্প লিখতনে, কবিতা লিখতেন, নাটক-গান-বাজনা এমন কি যাত্রাও করতেন। আমি গান শুনতে, নাটক ও যাত্রা দেখার জন্য আশ্রমে যেতাম। আড্ডা জমত প্যারী আদিত্যের দোকানে। আড্ডায় বুঝতাম দেশের প্রতি তাঁর ভালবাসার কথা, মানুষের প্রতি ভালবাসার কথা। তিনি বাড়ী-বাড়ী ঘুরে বেড়াতেন, সবার সুখ-দঃুখের সাথী হতেন। তার মধ্যে ছিল না কোন ভেদাভেদ, কে হিন্দু, কে মুসলমান। তিনি ছিলেন সমাজ সেবক ও শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গ আশ্রমের এবং সৎসঙ্গ সংবাদ পত্রিকারলেখক ও কর্মী। ছিলেন গ্রাম ও প্রতিবেশীর বন্ধু ও সহযোদ্ধা। তার মধ্যে উ”চাভিলাষ ও অহংকার বোধ ছিল না।  

যদিও ঐ সময পাকুটিয়াতে প্যারী মোহন আদিত্যের পরিবার, কাব্যতীর্থ কুঞ্জ বিহারী মজুমদার, মথুরা নাথ আদিত্য ও ওমেশ সরকারের পরিবার ছাড়া তেমন কোন সৎসঙ্গী ছিল না, যার ফলে ঠাকুর ও সৎসঙ্গ সম্পর্কে আলোচনা করার তেমন কোন সুযোগ ছিল না। কিš‘ আশ্রমের মন্দিরের দেয়ালে ছিল শ্রীশ্রীঠাকুরের অসংখ্য বাণী। মুগ্ধ হতাম সেই সব বাণী পড়ে। প্যারীমোহন আদিত্যে কথা ভুলা যায় না। ভালবাসার মানুষ ছিলেন তিনি। আমাদের খুব ভালবাসতেন। শুধু আমাকে বললে ভূল হবে, গ্রামের প্রতিটি মানুষকে তিনি ভালবাসতেন, আপন করে নিতেন এবং বিপদে এগিয়ে আসতেন। 

প্যারী মোহন আদিত্যের পরিবার স্ব”ছল না থাকায় তিনি লোহার দোকানে কঠোর পরিশ্রম করতেন। চার ভাইয়ের মধ্যে প্যারী মোহন ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর উপরেই ছিল সংসারের ভার। লোহার দোকানের কাজের পাশাপাশী পাকুটিয়া বাজারে একটি মুদির দোকানও ছিল তাঁর।

১৯৫৮সালে শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীশ্রীপাদুকা সুদুর বিহার রাজ্য থেকে মাথায় করে এনেছেন প্যারী মোহন আদিত্য, যা আজও বর্তমান। ১৯৭০ সালে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিনাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও জলো”ছাসে অনেক মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হয়। তিনি সৎসঙ্গের বাহিনীসহ নিজে ঝঁপিয়ে পরেন তাদের সাহয্য সহযোগীতা করার জন্য। ১৯৭১ এর ২১শে মে আনুমানিক ৯টায় পাক হানাদর বাহিনীর সাঁড়াসি আক্রমনে প্যারী মোহন আদিত্য পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। হানাদার বাহিনী তাকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্মম ভাবে অত্যাচার করে। তিনি কৌশলে পালিয়ে আসেন।

৭ই মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভষণে-এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ ভাষণ শুনেই প্যারী মোহন আদিত্য বীরপ্রতীক মোঃ খোরশেদ আলম তালুকদারের সাথে মহান মুক্তিযোদ্ধে যোগ দেন। বীরপ্রতিক মোঃ খোরশেদ আলম তালুকদার প্যারী মোহন আদিত্যকে অনেক স্নেহ করতেন। 

১৯৭১ এর ৮ আগষ্ট ১১নং সেক্টরের কাদেরীয়া বহিনীর হেড কোয়াটার কোম্পানীর কমান্ডার খোরশেদ আলম তালুকদার (বীরপ্রতীক) কোম্পানীসহ পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় টাঙ্গাইল হইতে মধুপুর যাওয়ার জন্য পাক হানাদার বাহিনী পাকুটিয়া আশ্রম আক্রমন করে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এলোপাথারী গুলিতে প্যারী মোহন আদিত্য মুল মন্দিরের সামনে পরে যান। পরে ঘাতক বাহিনী টেনে হিচঁরে তাঁকে সামনে নিয়ে এসে লাথি আর বেয়নেট চার্চ করে যখম করে চলে যায়। গুলির আঘাত এবং বেয়নেটের আঘাত এতই মারাত্বক ছিল তার জন্য তাঁকে কোন অব¯’াতেই বাচাঁনো সম্ভব হয় নাই। আর চারিদিক এতই ভীঁত ছিল যে সেজন্য তাঁর মরদেহ দুদিন পর সৎকার করা হয়। 

প্যারী মোহন আদিত্যকে আমরা ভুলে গেছি। ভুলে গেছি যে প্যারী মোহন আদিত্য একটি প্রদীপ্ত সংগ্রামী নাম, একটি প্রতিভা। আমরা খুব দ্রুত ভুলে যেতে পছন্দ করি, সেই সব নাম, যাদের উৎর্কীণ করে রাখা উচিত আমাদের হৃদয়ের ফলকে। আমাদের উচিত তাদের নাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে স্মরনে রাখার জন্য কিছু ফলক ও ভবনের নাম করন করা। প্যারী মোহন আদিত্যকে আজকের অনেকেই চিনেন না। কিস্তু ১৯৭১ সালের আগে সৎসঙ্গ নিয়ে কাজ করেছেন ভারত-বাংলাদেশ এবং সৎসঙ্গের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সাথে। টাঙ্গাইলের প্রতিটি মানুষের মুখে ছিল ঐ সংগ্রামী নাম শহীদ বুদ্ধিজীবী প্যারীমোহন আদিত্য।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ হযরত আলী