মেঘে সীতাকুণ্ডের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মিশলে কী হবে?

সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মেঘে মিশে যাওয়ার তথ্য ছড়িয়েছে ফেসবুকে।


হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মেঘে মিশে যাওয়ার দাবির বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আর ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন তাদের নামে ফেসবুকে প্রচার করা তথ্যটি ভুয়া।


গত শনিবার রাতে সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় বিএস ডিপো নামের কনটেইনার টার্মিনালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণ স্থলে ৫০০ মিটার টিনের শেডের ভেতরে শত শত হাইড্রোজন পার অক্সাইড রাসায়নিকের ড্রাম বিস্ফোরক হয়ে আশাপাশের ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।


সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণের পর সেখানকার কনটেইনারের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড আকাশের মেঘে মিশে গেছে। এর ফলে আগামী কয়েকদিন বৃষ্টিতে না ভিজতে সতর্ক করে একটি পোস্ট শেয়ার হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের আশংকার কোনো ভিত্তি নেই। মনগড়া তথ্য প্রচার করে জনমনে ভীতি তৈরি করা হচ্ছে।


ফেসবুকে শেয়ার করা পোস্টের শেষে ‘ডিএমপি পরিচালক’ উল্লেখ রয়েছে। তবে এ ধরনের কোনো বার্তা দেয়ার তথ্য নাকচ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।


ফেসবুকের পোস্টে বলা হয় (বাক্য ও বানান অপরিবর্তিত), ‘ব্রেকিং... সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে।। আগামী ১০-১৫ দিনের মধ্যে কোন বৃষ্টি আসলে কেউ এটা তে ভিজবেন না। চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ড ভয়াবহ আগুনে যে, রাসায়নিক কেমিক্যাল গুলো ঝলসে গেছে। তার ফলে আকাশের মেঘ গুলোতে HYDROGEN PER OXIDE GAS টা মিশে গিয়েছে। সকলকে সতর্ক বার্তাটি প্রদান করুন, নিজে বাঁচুন, অন্য কে ও সাহায্য করুন৷ বিশেষ করে বৃদ্ধদের বৃষ্টির সময় ঘর থেকে বের হতে দিবেন না। -ডিএমপি পরিচালক’



সূত্র জানায়, ডিএমপিতে পরিচালকের কোনো পদ নেই। এই পদ ব্যবহার করে প্রচার করা ম্যাসেজটি ভুয়া।ডিএমপির মুখপাত্র উপ-কমিশনার মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘ডিএমপির পক্ষ থেকে এমন কোনো ম্যাসেজ পাঠানো হয়নি। যারা এ ধরনের তথ্য ছড়াচ্ছে তাদের শনাক্তে আমাদের সাইবার টিম কাজ করছে।’ মূলত, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মেঘে মিশে যাওয়ার দাবির বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই।



হাইড্রোজেন পার অক্সাইড কী?


হাইড্রোজেন পার অক্সাইড একটি রাসায়নিক যৌগ যার সংকেত H2O2। বিশুদ্ধ অবস্থায় এটি বর্ণহীন তরল, জলের থেকে এর সান্দ্রতা সামান্য বেশি। নিরাপত্তাজনিত কারণে সব সময় এটার জলীয় দ্রবণ ব্যবহার করা হয়। H2O2 সব থেকে সরল পারক্সাইড (যে যৌগে অক্সিজেন-অক্সিজেন একক বন্ধন থাকে) এবং এটা শক্তিশালী জারক ও বিরঞ্জক। গাঢ় H2O2 রকেটের জ্বালানীতে প্রোপেল্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়।


হাইড্রোজেন-পার-অক্সাইড সংক্রমণনাশক। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে কাজ করে। ১৯২০ সাল থেকে এটি অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়া হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। হাইড্রোজেন-পার-অক্সাইডে অতিরিক্ত একটি অক্সিজেন থাকে।


আলেকজান্ডার ভন হাম্বোল্ট বাতাসের পচে যাওয়ার তার প্রচেষ্টার উপ-পণ্য হিসাবে ১৭৯৯ সালে প্রথম কৃত্রিম পারক্সাইড, বেরিয়াম পেরক্সাইডের মধ্যে একটি সংশ্লেষিত করেছিলেন। উনিশ বছর পরে লুই জ্যাক থনার্ড স্বীকৃতি দিয়েছিলেন যে এই যৌগটি পূর্বে অজানা যৌগ তৈরির জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে, যা তিনি ইও অক্সিজিনি (ফরাসী: অক্সিজেনযুক্ত জল) হিসাবে বর্ণনা করেছিলেন - পরবর্তীকালে হাইড্রোজেন পারক্সাইড হিসাবে পরিচিত।


হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের ব্যবহার


সরাসরি হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ব্যবহার বিপজ্জনক। তাই নিরাপত্তাজনিত কারণে সবসময় এর জলীয় দ্রবণ ব্যবহার করা হয়। এই রাসায়নিকের সর্বোচ্চ ব্যবহার দেখা যায় অ্যাভিয়েশন শিল্পখাতে। গাঢ় হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রকেটের জ্বালানিতে প্রোপেল্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়।


হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কখন বিপজ্জনক?


এই রাসায়নিকটির স্ফুটনাঙ্ক ১৫০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা পানির চেয়েও ৫০ ডিগ্রি বেশি। যে তাপমাত্রায় কোনো তরল পদার্থ বুদবুদসহ ফুটতে থাকে, তাকে সেই তরল পদার্থের স্ফুটনাঙ্ক বলে। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড উত্তপ্ত করা হলে এটি তাপীয় বিয়োজনে বিস্ফোরক হিসেবে আচরণ করে। এজন্য এই রাসায়নিকটি কম তাপে নিরাপদে পাতিত করা হয়।


হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে সরাসরি বিস্ফোরক তালিকায় রাখা না হলেও ক্ষতি করার অসীম ক্ষমতা রয়েছে এর। ২০২০ সালে লেবাননে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের গুদামে এই রাসায়নিক বিস্ফোরণে প্রায় ২০০ মানুষ মারা গিয়েছিল।


হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কারণে লাগা আগুন কেন পানিতে নেভানো যায় না ?


হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কারণে লাগা আগুন পানি দিয়ে নেভানো যায় না। বরং এতে আগুনের মাত্রা আরও বাড়ে। রাসায়নিকের কারণে লাগা আগুন নেভাতে হয় ফগ সিস্টেমে। কিংবা ব্যবহার করা হয় ফোম কিংবা ড্রাই পাউডার জাতীয় অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র। এ কারণে পানির সাহায্যে এই আগুন নেভানো সম্ভব নয়।


সীতাকুণ্ডের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মেঘে মিশলে কী হবে?


বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড নিজে জ্বলে না, কিন্তু সে যখন বেশি হিটেড অবস্থায় থাকে তখন ডিকম্পোজ হয়ে অক্সিজেনের লেভেলটা বেড়ে গেলে বিস্ফোরণ ঘটে। মেঘের সঙ্গে এই যৌগ মিশলেও কোনো ক্ষতি নেই। মেঘের সঙ্গে মিশলে তখন সেটা আর হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড থাকবে না। সেটা অক্সিজেনে কনভার্ট হয়ে যাবে। তখন আর কোনো ক্ষতি নেই।


আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড মূলত ডিকম্পোজ হয়ে অক্সিজেন তৈরি হয়। এই এইচটুওটু (H2O2) মূলত হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন। এটাকে ভেঙে অক্সিজেন রিলিজ হয় আর পানি তৈরি হয়। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে যদি কনটেইনারে রাখা হলে উত্তাপে অক্সিজেন রিলিজ হয়ে ব্লাস্ট (বিস্ফোরিত) হয়।


বিএম কনটেইনার ডিপোর হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মেঘের সঙ্গে মেশার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না, উত্তর হল, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড সেভাবে থাকবে না। ওটা ডিকম্পোজ হয়ে যাবে। ডিকম্পোজ হয়ে গেলে অক্সিজেন বাতাসের সঙ্গে চলে যাবে, আর পানিটা নিচে থাকবে। এটা মেঘের সঙ্গে মেশার কোনো সুযোগ নেই।


আগুন লাগার পর থেকে সেখানে রাসায়নিকের উপস্থিতির কথা বলছিলেন উদ্ধারকর্মীরা। ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ‘কনটেইনার ডিপোটিতে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড কেমিক্যাল রয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে বিস্ফোরণ ঘটল, তা এখনও জানা যায়নি।'


তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বয়ে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন ধরনের গুজব, আলোচনা-সমালোচনা। নেটিজেনদের মধ্যে আলোচনার মূল বিষয় এখন ''হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড দাহ্য না'কি না" তা নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য ভেসে বেড়াচ্ছে। 'আগুনের ঘটনাস্থলের আশেপাশে আছেন তারা কেউ বৃষ্টিতে ভিজবেন না।' এমন পরামর্শ ফেসবুকে পোস্ট হলেও মূল বিষয় নিয়ে ''আল রাজি কেমিক্যাল কমপ্লেক্স লিমিটেড'' এর প্রোডাকশন অফিসার (হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড প্ল্যান্ট) পল্লব আচার্য্য বলেন, 'H2O2 বা হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড এর কারণে এসিড বৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। গুজব ছড়াবেন না । বায়ুতে বিভিন্ন শিল্প কারখানা থেকে নির্গত সালফার ডাই - অক্সাইড , নাইট্রোজেন ডাই - অক্সাইড , সালফিউরিক এসিড বাষ্প বেশি থাকলে , বৃষ্টির সময় ঐ এসিড বাষ্প পানির সাথে যুক্ত হয়ে কেবলমাত্র এসিড বৃষ্টির সৃষ্টি করে । হাইড্রোজেন পারক্সাইডে এসিড বৃষ্টি সৃষ্টিকারী কোনো উপাদানই নাই । ১৫০+ ডিগ্রী তাপমাত্রায় শুধুমাত্র এটা ডিকম্পোজ হয় , ডিকম্পোজড হলে এটার রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে অক্সিজেন মুক্ত হয়ে অগ্নিকাণ্ডে সহায়তা করে মাত্র । সুতরাং পারক্সাইডের কারণে এসিড বৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই ।'


তবে, ভাবনা একদমই যাচ্ছে না


সীতাকুণ্ডের বিস্ফোরণস্থলে পাওয়া হাইড্রোজেন পার অক্সাইডে মানবদেহ ও পরিবেশের ওপর প্রভাব হবে ভয়াবহ। চিকিৎসকরা বলছেন, রাসায়নিকের শরীরে ঢোকা মাত্রই শ্বাসকষ্ট, অভ্যন্তরীণ প্রদাহ, এমনকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকলও হতে পারে। আর পরিবেশবিদরা বলছেন, ছড়িয়ে পড়া এলাকার বায়ু, পানি ও মাটি মুহূর্তেই দূষিত হবে।


অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিক মানুষের নিঃশ্বাসে প্রবেশ করামাত্রই শুরু হয় শ্বাসকষ্ট, এরপর রক্তে মিশে যাওয়ামাত্রই অভ্যন্তরীণ দাহ। শরীরে অক্সিজেনের তীব্র সংকট শুরু হতেই একের পর এক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হতে থাকে। ভয়াবহ বিস্ফোরণের ২৪ ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে পাওয়া হাইড্রোজেন পার অক্সাইড নিয়ে এমন শঙ্কা জানালেন চিকিৎসকরা।


সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মো. খলিলুর রহমান বলেন, সবচেয়ে খারাপ বার্ন হলো কেমিক্যাল বার্ন যা আমদের শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে। শ্বাসতন্ত্র আক্রান্ত হলে এজেন্ট হিসেবে রক্তের মধ্যে গিয়ে যেমন ক্ষতি করছে তেমনি সঙ্গে সঙ্গে আমাদের যে রেসপুরেটরি সিস্টেম আছে সেখানে যে বার্ন হয় সেটাতে রোগীর ভয়াবহতা বেড়ে যায়। তখন দেহের বিভিন্ন অর্গান ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, এতে অনেকে মারা যেতে পারে।


শুধু মানুষের শরীরেই নয়, ভয়ংকর রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে পরিবেশের ওপরও। বিস্ফোরণের ধোঁয়ার মাধ্যমে বাতাসে মিশে যাওয়া রাসায়নিকটির মাধ্যমে দূষিত হবে সেখানকার বায়ু, মাটি। এমনকি পানিতে মিশলে দূষিত হবে।