পরিত্যক্ত পলিথিনে তেল-গ্যাস তৈরীর যন্ত্র আবিস্কারক তৌহিদুল

Oil-gas, made, machine detector, Towhidul,
ad

স্থানীয় প্রতিনিধি: পরিত্যক্ত পলিথিন পুড়িয়ে একইসাথে পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন, এলপি গ্যাস ও কার্বন কালি তৈরীর যন্ত্র আবিষ্কার করে সাড়া জাগিয়েছেন জামালপুরের তরুণ উদ্ভাবক তৌহিদুল ইসলাম তাপস। তার এই বিস্ময়কর আবিষ্কারে উদ্ভাবকের খোঁজে প্রতিযোগিতায় দেশের সেরা ১০ জনের একজন উদ্ভাবক হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী দৃষ্টি কেড়েছেন তিনি।

নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরে জন্ম নেয়া এই সম্ভবনাময় উদ্ভাবক অর্থের অভাবে তেল, গ্যাস ও কার্বন কালি তৈরীর পরীক্ষামূলক প্ল্যান্ট স্থাপন করতে পারছেন না। বিষয়টি জানার পর তাকে এটুআই প্রকল্পের ফান্ড থেকে সাড়ে ৬ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তৌহিদুলকে বর্জশোধানাগার কেন্দ্রের পাশে জমি বরাদ্দ দিয়েছে জামালপুর পৌরসভা। তিনি পলিথিন থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাস তৈরীর জন্য কাজ শুরু করার প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছেন।

উদ্ভাবক তৌহিদুল ইসলাম তাপস বলেন, ১০ বছর বয়সে বাড়ির আঙিনায় ফুলের বাগান করি। বাগানে পড়ে থাকা পলিথিন ফুল গাছের পানি শোষণ ও বেড়ে উঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। আগুন লাগিয়ে ও এসিড দিয়ে পুড়িয়েসহ নানা উপায়ে পলিথিন ধ্বংস শুরু করি।

তিনি বলেন, কিছুদিন না যেতেই ফের পলিথিন জমে বাগানে। পলিথিনের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠি। কিভাবে পলিথিন ধ্বংস করা যায়, মাথায় নানা আইডিয়া ঘুরপাক করতে থাকে আমার মাথায়। সেই আইডিয়া থেকেই চেষ্টা করতে থাকি। তখন আমি সবে মাত্র চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। পলিথিন ধ্বংসের একটু একটু করে ফল পেতে থাকি।

Oil-gas, made, machine detector, Towhidul,

তৌহিদুল ইসলাম তাপস বলেন, স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। আমার এই উদ্ভাবনী নেশার পাশে পাই আমাদের কলেজের রসায়নের প্রভাষক ইকরামুজ্জামান স্যারকে। তিনি গবেষনা কাজে সহায়তা করেন। বিজ্ঞানাগার থেকে এসিড, টেস্টটিউব সবশেষে বিজ্ঞানাগারের চাবি দিয়ে দেন। দিনের পর দিন রাতের পর রাত গবেষণায় নিজেকে আত্বনিয়োগ করি। চিন্তা ও জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবহারিক বিষয়টিও মেলানোর চেষ্টা করতে থাকি।

তৌহিদুল বলেন, দীর্ঘ গবেষণার এক পর্যায়ে দেখতে পাই, পলিথিন চেম্বারে নিয়ে উচ্চ তাপমাত্রায় (৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে) উত্তপ্ত করার সময় পলিথিন যখন তরল হয়, তখন স্ববিভাজন বিক্রিয়া ঘটে। স্ববিভাজন বিক্রিয়া ঘটার পর জ্বালানি তেলের বাষ্প সৃষ্টি হয় এবং সেখানে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টির ফলে জ্বালানি তেলের বাষ্প খুব দ্রুত অন্য একটি শীতল চেম্বারে চলে আসে। পরে তা ঠান্ডা হয়ে তরল হয়ে যায় আর মিথেন বা এলপি গ্যাস ও জ্বালানি তেল পৃথকভাবে নিজ নিজ চেম্বারে চলে যায়।

তিনি জানান, তরল জ্বালানি ও এলপি গ্যাস বের হওয়ার পর সেখানে অনেক মুক্ত কার্বন তৈরি হয়, যা পরে ছাপার কাজে কালি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের টাকায় তৌফিদুল পরীক্ষামূলকভাবে ১৫০ কেজি সাপোর্টের একটি প্ল্যান্ট বসিয়েছেন। এই পলিথিন থেকে ১০৫ লিটার পেট্টোল, ডিজেল ছাড়াও এলপি গ্যাস উৎপাদন হবে। দিনে তিনবার এভাবে তেল সংগ্রহ করা যাবে। এতে প্রতিদিন ৩১৫ লিটার পেট্টোল, ডিজেল, এলপি গ্যাস ছাড়াও পাওয়া যাবে কার্বন কালি।

তরুন উদ্ভাবক তৌহিদুল আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সরকার যদি আমাকে সহযোগিতা করে, তাহলে প্রতিদিন ৫ হাজার সাপোর্টের একটি প্ল্যান্ট করে দেশকে পলিথিনমুক্ত করা এবং তেলের জ্বালানি সাপোর্ট দেয়া সম্ভব হবে।

জামালপুর সদরের কেন্দুয়া ইউনিয়নের কোজগড়ের মঙ্গলপুরে তৌহিদুলের বাড়ি। তৌহিদুল ২০০৯ সালে জামালপুর সদর উপজেলার নারিকেলি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১১ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন।

এরপর জামালপুর কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে উত্তীর্ণ হন। তৌহিদুলের এই উদ্ভাবনী কাজে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন তার মা হালিমা বেগম।

শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক মো. ইকরামুজ্জামান বলেন, তৌহিদুলের ইচ্ছা, একাগ্রতা, উদ্ভাবনী প্রতিভা দেখে নানাভাবে সার্পোট দেয়ার চেষ্টা করেছি। তৌহিদুল পরিত্যক্ত পলিথিন থেকে তেল, গ্যাস ও কার্বন কালি তৈরীর প্রকল্পের পাশে সরকারসহ বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। আমার বিশ্বাস, তৌহিদুল একদিন আমার কলেজ আর জামালপুর নয়, বাংলাদেশের মুখ উজ্জল করবে তার উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে।

স্থানীয় পরিবেশ কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, পলিথিন আমাদের পরিবেশের জন্য একটি মারাত্বক অভিশাপ। এই পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাস সংগ্রহের পাশাপাশি আমাদের শহর তথা গোটা দেশকে পলিথিনমুক্ত করার উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

পরিত্যক্ত পলিথিন যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর সেই পলিথিনকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আবিষ্কার করে ইতিমধ্যে তৌহিদুল যে সফলতা পেয়েছে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে জানিয়ে জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবির বলেন, তৌহিদুল বিভিন্ন সময় জেলা প্রশাসনের বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিয়ে সফলতা লাভ করেছে এবং সহযোগিতা পেয়েছেন। আমরা তার এই সফলতা সার্থক করতে সার্বিক সহযোগিতা করে যাবো।

ad