আবারও শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করুক বাংলাদেশ

sad bangladesh team
ad

রিয়াজুল ইসলাম শুভ: আজ থেকে ১১ বছর পেছনে ফিরে গেলে সালটা ছিল ২০০৭। ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচের আগের দিন ১৬ মার্চ বাংলাদেশ দল পেল ভয়াবহ এক দুঃসংবাদ। খুলনায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান সেই সময়ের টাইগার দলের স্পিন অলরাউন্ডার মাঞ্জারুল ইসলাম রানা।

ভারতের বিপক্ষে রানা না থেকেও ছিলেন পোর্ট অব স্পেনের মাঠে, বাংলাদেশের প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে ছায়াসঙ্গী হয়ে। ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ সেদিন প্রমাণ করেছিল মানজারুল ইসলাম রানার আধ্যাত্মিক উপস্থিতি।

নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশী রয়েছেন ২৬ জন। বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়া এই ট্র্যাজেডির ভেতরেই দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আজ নিদাহাস ট্রফিতে ভারতের বিপক্ষে খেলতে নামবে বাংলাদেশ।

তবে কি এবারও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি? রানার মৃত্যু ছিল মার্চ মাসে, বিমান দুর্ঘটনায় ২৬ জন বাংলাদেশী নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘুরে ফিরে মার্চ মাসে। কি তাজ্জব ব্যাপার আবারও প্রতিপক্ষ সেই ভারত! রানার আধ্যাত্মিক উপস্থিতি যদি তখন কার শচীন, সৌরভ, দ্রাবিড়, শেবাগ, যুবরাজদের টিম ইন্ডিয়াকে বিধ্বস্ত করে দিতে পারে, তাহলে হালের জনপ্রিয় টি-২০ তে আগের ম্যাচে লংকানদের সাথে পরে ব্যাট করে ২১৫ রান করে জেতার টাটকা স্মৃতি থাকতে আবারও নয় কেন!

যদিও ক্রিকেট আবেগ দিয়ে নয়, খেলতে হয় মাঠে আর সাথে রাখতে হয় উপস্থিত বুদ্ধি। তবে বাংলাদেশ যে আজ আবেগ দিয়েই খেলতে নামবে তা বলা বাহুল্য। ১১ বছর আগে রানার প্রিয় বন্ধু মাশরাফি জয়ের প্রতিজ্ঞা নিয়ে বলেছিল ধরে দিবানে! এবারও সেই ধরে দিবানের পুনরাবৃত্তির অপেক্ষায় গোটা দেশ।

নেপাল ট্রাজেডিতে নিহত ২৬ জন আর হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকা আহতদের জন্য হলেও যে ম্যাচটি টাইগারদের জয়ের জন্য তাতিয়ে তুলেছে সেটা বুঝতে জ্ঞানী হওয়ার দরকার পড়ে না। কারণ এটা তো হৃদয়ের কথা!

১১ বছর আগের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের দুইজন ক্রিকেটার এখনকার দলে খেলছেন। তামিম ইকবাল আর মুশফিক আছেন এই দলে। সাকিব ইনজুরির কারণে এই সিরিজ মিস না করলে সংখ্যাটা হলো তিন। পোর্ট অব স্পেনের সেই ম্যাচে তখনকার ১৭ বছরের কিশোর তামিমের ভারতীয় পেসারদের ডাউন দ্যা উইকেটে এসে মারা ছক্কা দুইটা যেন ছিল রানাকে বলতে না পারা কথা- ভাই এটা আপনার জন্য!

তামিমের ৫৩ বলে ৫১ রানের চোখ ধাঁধানো সেই ইনিংসের শরীরী ভাষা বলে দিচ্ছিল শোক তখন শক্তিতে পরিণত। মুশফিকও কম যাননি। অপরাজিত ৫৬ রানের ইনিংস খেলে দলের জয়সূচক রান নিয়েই মাঠ ছেড়েছিলেন।

সাকিব আল হাসান খেলেছিলেন ৫৩ রানের অতি কার্যকরী ইনিংস। নিদাহাস ট্রফির গত ম্যাচে দুই শতাধিক রান চেস করে জেতা ম্যাচের পর সাকিব তার ফেসবুক পেজে আফসোস করে লিখেছিলেন উদযাপনটা মিস করেছি। এখন কি তবে তিনি মনে মনে বলছেন- ইস! শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করার ম্যাচতাও বড্ড মিস করছি!

২০০৭ বিশ্বকাপের সেই ম্যাচ জয়ের নায়ক মাশরাফি অবশ্য আজ ঠিকই মাঠে নামছেন! কি চোখ কপালে উঠে গেল তো। টি-২০ থেকে অবসর নিয়েছেন এক বছর আগেই। তাহলে কিভাবে এটা সম্ভব! জি হ্যাঁ তিনি আজ মাঠে নামছেন তবে টাইগারদের জার্সি গায়ে নয়, ফতুল্লায় আবাহনীর জার্সি গায়ে। ক্লাবের হয়েই হয়তো তিনি মনে প্রাণে চাইবেন নিজেকে উজাড় করে দিতে, বিমান দুর্ঘটনার শোককে শক্তিতে পরিণত করতে।

পোর্ট অব স্পেনের কুইন্স পার্ক ওভাল থেকে কলম্বোর রণিল প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম। মাঝের ১১ বছরে বদলে গেছে অনেক কিছু। বদলে যাওয়া বাংলাদেশ তখন ছিল জায়ান্ট কিলারের তকমা লাগানো দল, আর এখন প্রায় পরাশক্তি হতে যাওয়া দল। এখনও তারা হোঁচট খায়। পরাজয়ের বৃত্তে বন্দী হয়। মাঠ ও মাঠের বাইরের অনেক কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তারপরেও বাঘের হুংকার দিয়ে আবারও ঠিকই ঘুরে দাঁড়ায়।

বিভেদ, পরমত সহিষ্ণুতা না থাকা, রাজনৈতিক অনৈক্য, হানাহানি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা এসবের মাঝে জাতীয় ঐক্যের একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে ক্রিকেটারদের সাফল্য। অন্য কোনো খেলায় বিশ্বমানে আমরা পৌঁছাতে না পারায় ক্রিকেটই কখনও কখনও হয়ে ওঠে আবেগ দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। দিন শেষে খেলা যতই বিনোদনের মাধ্যম হোক না কেন বাঙ্গালী জাতির কাছে তা হয়ে ওঠে দুঃখের মাঝে মহা আনন্দের উপলক্ষ।

নেপালে হতাহত বাংলাদেশীদের উৎসর্গ করে তবে আবারও একটি জয়ের সাক্ষী হোক টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া। আর দেশবাসী হৃদয়ে ধারণ করুক- ‘নিজেকে হারিয়ে যেন পাই ফিরে ফিরে. এক নীল ঢেউ কবিতার প্রচ্ছদ পটে। কতো আনন্দ বেদনায়, মিলন বিরহ সংকটে।’

ad