ফেঁসে যাচ্ছেন নাসির-তামিমা, হতে পারে ২২ বছরের জেল

শুধু অবৈধ উপায়ে বিয়েই নয়, রাষ্ট্রীয় নথি জালসহ বেশ কয়েকটি অপরাধে ফেঁসে যাচ্ছেন ক্রিকেটার নাসির হোসেন। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার জন্য অপেক্ষা করছে বড় ধরনের শাস্তি।

তামিমা কাজ করতেন সৌদিয়া এয়ারলাইন্সে। ফেসবুকে পরিচয় হয় ক্রিকেটার নাসির হোসেনের সঙ্গে। এরপর থেকে প্রায়ই কথা হতো দুজনের। ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি তামিমা বাংলাদেশে এসে গুলশান-২ এর একটি রেস্তোরাঁয় দেখা করেন নাসিরের সঙ্গে। এরপর দুজনই নিয়মিত কথাবার্তা বলতে থাকেন। একপর্যায়ে নাসির-তামিমার মধ্যে পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে উঠে।  বিয়ের আগে তারা বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েকবার দেখা করেন।

পিবিআইকে দেওয়া জবানবন্দিতে নাসির জানান, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে নাসিরের সঙ্গে পরিচয় হলেও তামিমা ওই বছরের শেষ দিকে রাকিবের সঙ্গে তার (তামিমা) বিয়ের বিষয়টি তাকে জানান। বিয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তামিমা অস্বস্তিবোধ করতেন। চেষ্টা করতেন এড়িয়ে যাওয়ার। পরে ২০২০ সালের শেষের দিকে তারা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের হাভেলি রেস্তোরাঁয় ২০ লাখ ১০০ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিয়ে করেন নাসির-তামিমা।

কিন্তু কাবিননামায় ‘বিবাহ কার্যনিষ্পন্ন স্থান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ঘারিন্দা ইউনিয়ন কাজী অফিস টাঙ্গাইল সদর।  টাঙ্গাইলের ৩নং ঘারিন্দা ইউনিয়নের নিয়োগপ্রাপ্ত কাজী দেলোয়ার হোসাইন এই বিয়ে নিষ্পন্ন করেন।

পিবিআইকে দেওয়া জবানবন্দিতে নাসির আরও জানান, সব জেনেই তামিমাকে তিনি বিয়ে করেছেন। বিয়ের আগে তামিমার স্বামী রাকিবের সঙ্গে তার (নাসির) কখনো দেখা বা কথা হয়নি। তবে ২০২১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাকিবের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে একবার কথা হয়েছে বলে জানান নাসির।

এদিকে রাকিবের সঙ্গে তামিমার তালাক নোটিশ নিয়েও করা হয়েছে জালিয়াতি। তালাক নোটিশ দিলেও তামিমা ও তার মা সুমি ছিলেন রাকিবের বাসায়।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানা তাম্মির বিয়ে অবৈধ উল্লেখ করে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসীমের আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান।

তবে ঘটনার এখানেই শেষ নয়। নাসির-তাম্মির বিপক্ষে উঠেছে আরো গুরুতর অভিযোগ। প্রতারণা, বিচ্ছেদের কাগজ জালিয়াতি, মানহানি, ভুয়া নথিকে আসল কাগজ দাবী করার মত দণ্ডনীয় অপরাধ। যার জন্য তাদের বিরুদ্ধে অপেক্ষা করছে বড় ধরনের শাস্তি, দাবী রাকিবের আইনজীবী ইসরাত হাসানের।
 
তিনি বলেন, তারা একটা অপরাধ ঢাকতে গিয়ে আরো অনেকগুলো অপরাধের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছেন। ডাক বিভাগ থেকে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে তাদের দেওয়া স্মারক নাম্বার থেকে কোনো ডিভোর্স লেটার রাকিবের কাছে যায়নি। তার মানে নাসির দম্পতি সরকারি নথিপত্রও জালিয়াতি করেছে। যার শাস্তি ৭ বছরের জেল। এছাড়া ব্যাভিচারের জন্য ৫ বছর, স্বামী বর্তমান থাকা অবস্থায় আবার বিয়ে করার জন্য ৭ বছর, অন্যের স্ত্রীকে নিয়ে আসার জন্য ৩ বছরের সাজা, মানহানীর জন্য ২ বছরের জেলসহ আরো অন্যান্য সাজাও যুক্ত হবে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— তালাক যথাযথ হয়নি জেনেও নাসির বিয়ে করেছেন তামিমাকে।  তামিমা রাকিবকে তালাক দেননি।  আইনগতভাবে রাকিব তালাকের কোনো নোটিশও পাননি। তামিমা উল্টো জালিয়াতি করে ডাকবিভাগের তালাকের নোটিশ তৈরি করে তা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তালাক না দেওয়ার ফলে তামিমা তাম্মী এখনও রাকিবের স্ত্রী হিসেবে বহাল রয়েছেন। দেশের ধর্মীয় বিধিবিধান ও আইন অনুযায়ী এক স্বামীকে তালাক না দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করা অবৈধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এমন পরিস্থিতিতে ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তামিমা তাম্মীর বিয়ে অবৈধ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যবসায়ী রাকিব-তামিমা ও তার পরিবারসহ ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের জুলাই পর্যন্ত উত্তরার ৯নং সেক্টরের একাধিক বাসায় একসঙ্গে ছিলেন। ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে রাকিবের ভাড়া বাসা, হোটেল ও আত্মীয়-স্বজনের বাসায় স্বামী-স্ত্রী পরিচয় ছিলেন তামিমা। যদিও তামিমার দাবি, তিনি রাকিবকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ডিভোর্স দিয়েছেন।

পিবিআইয়ের কাছে জবানবন্দিতে তামিমা বলেন, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে হোটেল লা মেরিডিয়ানে রাকিবের সঙ্গে তার অনেকবার দেখা হয়েছে। এছাড়াও ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই হোটেল লা মেরিডিয়ানের রিজারভেশন রুম নম্বর ১০১৭-তে রাকিব ‘অ্যাকমপ্যানিং গেস্ট’ হিসেবে তার (তামিমা) সঙ্গে একদিন ছিলেন।

এদিকে ২০১৮ সালের ৩ মার্চ শেষ হয় তামিমার পাসপোর্টের মেয়াদ। পরে নবায়নের সময় স্বামীর নাম রাকিব হাসানই উল্লেখ করেন তামিমা। ২০১৬ সালে ডিভোর্স হয়ে থাকলে স্বামীর নাম রাকিব হাসান লেখার আইনগত বৈধতা নেই বলে জানায় পিবিআই।

এ ছাড়া চাকরির সমস্ত নথি, মেডিকেল কার্ড, সৌদি আইডি কার্ড, লাইসেন্স GACA আইডেনটিফিকেশন কার্ড- সব জায়গাতেই স্বামীর নাম রাকিব হাসান ব্যবহার করেছেন তামিমা।

মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, রাকিবের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক চলমান অবস্থাতেই তাম্মি নাসিরকে বিয়ে করেছেন; যা ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। নাসির তামিমাকে প্রলুব্ধ করে নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছেন।’

এ বিষয়ে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেছেন, প্রথম স্বামী রাকিব হাসানকে তালাক হওয়ার ক্ষেত্রে যে নিয়ম মানা দরকার ছিল- তা মানা হয়নি। তামিমার মা সুমি আক্তার বেশ কিছু জালিয়াতিও করেছেন।

পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার একটি গণমাধ্যমকে বলেন, তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত থাকে। কাজীকে অবহিত করা, তালাক যাকে দেওয়া হবে, তার ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে ডাক বিভাগের মাধ্যমে চিঠি দেওয়া। এই তিনটি শর্তের পরের দুটি তামিমার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে করা হয়নি। চার্জশিটে নাসিরের বিরুদ্ধে ‘অন্যের স্ত্রীকে প্রলুব্ধ’ করে নিয়ে যাওয়া, ‘ব্যাভিচার’ এবং তামিমার আগের স্বামীর মানহানি ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। আর সব ‘জেনেও’ বিয়েতে সহায়তা করায় তামিমার মাকে চার্জশিটে আসামি করা হয়েছে।

পিবিআই প্রধান আরও বলেন, তালাকের ব্যাপারে যেসব কাগজ তৈরি করা হয়েছে, সেগুলো তামিমার মা সুমি আক্তার জালিয়াতির মাধ্যমে করেছেন। ডাক বিভাগের কাগজসহ যেগুলো জালিয়াতি করা হয়েছে, সেগুলো তিনিই করেছেন।