ক্রিকেটার হয়েই ৯ বছর পর বাড়ি ফিরল ছেলেটি

প্রতিজ্ঞা করেই ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন কার্তিকেয়া সিং।


পেশাদার ক্রিকেটার হতে হবে। প্রতিষ্ঠা না পাওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবেন না। এরপর নিরন্তর অনুশীলনের জীবন। কিন্তু শুধু অনুশীলন আর ক্রিকেট খেললেই তো আর পেট ভরবে না। পেটে কিছু দিতেও হবে। বাড়ি থেকে কোনো অর্থ নেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কার্তিকেয়া সিং। সে উপায়ও ছিল না। মধ্যপ্রদেশে পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরি করা বাবা নিজের সীমিত আয় থেকে ছেলের ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাওয়ার রসদ জোগাবেন কীভাবে! সে কারণেই ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি শ্রমিক হিসেবে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে গেছেন কার্তিকেয়া। নয় বছর ধরে তাঁর অমানুষিক পরিশ্রম বিফলে যায়নি। জায়গা করে নিয়েছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে। জায়গা পেয়েছেন আইপিএলেও। এখন বাড়ি ফেরাই যায়। তাই ৯ বছর পর নিজের প্রতিজ্ঞার ফল হাতে নিয়েই বাড়ি ফিরলেন, মায়ের সঙ্গে দেখা করলেন কার্তিকেয়া।

গতকাল বুধবার বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে তোলা একটি ছবি নিজের টুইটারে পোস্ট করেছেন কার্তিকেয়া। বলেছেন ৯ বছর ৩ মাস পর বাড়ি ফেরা—এই মৌসুমের রঞ্জি ট্রফি বিজয়ী মধ্যপ্রদেশের বাঁ হাতি স্পিনারের টুইটের পর আবেগের ঝড় বইছে ভারতীয় ক্রিকেটে। একজন ক্রিকেটারের নিবেদন কতটা গভীরে হলে এমন হতে পারে! ক্রিকেটার হতে বাড়িমুখো হননি দীর্ঘ ৯ বছর!

ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটে ‘পাওয়ার হাউজ’ বলে সুপরিচিত মুম্বাই। রঞ্জি ট্রফির অন্যতম সফল ও শক্তিশালী দল। সেই মুম্বাইকেই এবার রঞ্জির ফাইনালে হারিয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রদেশ। বাঁহাতি স্পিনার কার্তিকেয় রঞ্জিতে ১১ ইনিংসে বোলিং করে পেয়েছেন ৩২ উইকেট। এর মধ্যে আছে তিনটি পাঁচ উইকেট–কীর্তি। মধ্যপ্রদেশ রঞ্জি জয় করার পর তাদের অনেক ক্রিকেটারেরই গল্প জানতে পারছে সবাই। তবে কার্তিকেয়ার ব্যাপারটা বোধহয় আর দশজনের চেয়ে আলাদা।

এই নয় বছর কেন একবারের জন্যও বাড়ি ফিরলেন না কার্তিকেয়া? হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রদেশের এই ক্রিকেটার বলেছেন, ‘আমি বাড়ি ফিরতে পারতাম। বাড়ি ফেরার সময়ও পেতাম। কিন্তু ফিরিনি। বাবাই আমাকে বলেছিলেন, “যখন একটা প্রতিজ্ঞা নিয়ে বাড়ি থেকে একবার বেরিয়ে গেছই, তখন সেই প্রতিজ্ঞাটা পূরণ করেই দেখাও। কিছু অর্জন করে ফেরো।” আমি শুধু বলেছিলাম, “ঠিক আছে।” আমি বাড়ি কখনোই ফিরিনি। যখন মনে করেছি, কিছু একটা অর্জন করেছি, শুধু তখনই ফিরেছি।’


কোচ সঞ্জয় ভরদ্বাজের কাছে অনেক ঋণ কার্তিকেয়ার


তাঁর মা ব্যাপারটিকে কীভাবে দেখেছেন? কার্তিকেয়া জানিয়েছেন, ‘আমি ভিডিও কল করা বন্ধ করে দিই। কারণ, মা কেবলই কাঁদতেন। নিজে থেকে ফোন করাও বন্ধ করে দিয়েছিলাম। যখন মা ফোন করতেন, তখনই তাঁর সঙ্গে কথা হতো। রঞ্জির ফাইনালে মুম্বাইকে মধ্যপ্রদেশ হারিয়ে দেওয়ার পর আমি আবারও মাকে ভিডিও কল করি। তার আগে অনেক দিন পর প্রথম ভিডিও কল করেছিলাম যেদিন আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসে সুযোগ হলো। আইপিএলের আগে সবশেষ ভিডিও কল করেছিলাম ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো রঞ্জি ট্রফিতে মধ্যপ্রদেশ দলে সুযোগ পেয়ে।’

২০২২ সালে সুযোগ পেয়েছেন আইপিএলেও। মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের হয়ে খেলেছেন ৪ ম্যাচ

২০২২ সালে সুযোগ পেয়েছেন আইপিএলেও। মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের হয়ে খেলেছেন ৪ ম্যাচছবি: বিসিসিআই

কার্তিকেয়ার সংগ্রামের জীবনে কোচ সঞ্জয় ভরদ্বাজ অনেক সাহায্য করেছেন। তাঁর কৃতজ্ঞতার সীমা নেই কোচের প্রতি, ‘স্যারের সঙ্গে প্রথম যেদিন দেখা হলো, তিনি ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ক্রিকেট খেলতে তো কিছু খরচ আছে। জুতো ও নানা ধরনের সরঞ্জাম লাগে। স্যার সবকিছুর খরচ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমার কাছে তাঁর এই প্রস্তাবটি ছিল হাতে আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো। আমি আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। কেঁদে দিয়েছিলাম। এমন সাহায্য কেউ তো করেনি। তিনি দিল্লিতে তাঁর কাছে চলে গেলাম। তিনি শুধু দিয়েই গেছেন। বিনিময়ে কিছুই চাননি। তিনি আমার বাবার মতোই। এখনো তিনি আমার পাশেই আছেন।’



কার্তিকেয়ার পুলিশ কনস্টেবল বাবা শ্যামনাথ সিং অবশ্য সব সময় ছেলেকে উৎসাহই দিয়ে গেছেন। তিনি নিজেও ক্রিকেটপাগল। একসময় খেলাধুলাও করেছেন। শ্যামনাথ ছিলেন শুটিং খেলোয়াড়। পুলিশের হয়ে অনেক সাফল্য আছে তাঁর।


কার্তিকেয়া দীর্ঘ সংগ্রামের পর ২০১৮ সালে রঞ্জি ট্রফিতে মধ্যপ্রদেশের হয়ে খেলার সুযোগ পান। এরপর সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফি খেলেন। ২০২২ সালে হঠাৎ করেই সুযোগ হয়ে যায় আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ানস দলে। সেখানে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল যথেষ্ট নজর কাড়া। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মধ্যপ্রদেশের হয়ে ১২ ম্যাচে ৫৫ উইকেট তাঁর। টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে পেয়েছেন মোট ১৪ উইকেট। এর মধ্যে আইপিএলে ৪ ম্যাচে ৫ উইকেট।