না খেয়েই দিন কাটছে কাশ্মীরিদের

ভারতশাসিত কাশ্মীরের জন্য দেশটির সংবিধানে থাকা বিশেষ মর্যাদা বাতিলের পর ওই এলাকায় বিক্ষোভ ঠেকাতে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযানে কর্তৃপক্ষ অন্তত ৩০০ রাজনীতিক ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে আটক করেছে। এছাড়াও গত কয়েকদিনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে হাজারের উপর বিক্ষোকারীকে। তাদের রাখা হয়েছে কাশ্মীরের বিভিন্ন গেস্ট হাউজ ও হোটেল, লজগুলোতে।

পুলিশের কর্মকর্তা, বিভিন্ন দলের নেতা ও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো এ তথ্য নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

মোদি সরকারের পক্ষ থেকে এমন দাবি করা হলেও সেখানকার বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। কারফিউ জারি রেখে সংবাদমাধ্যম ও ইন্টারনেটসহ মানুষের চলাচলের ওপর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন সত্ত্বেও বিক্ষিপ্তভাবে বিক্ষোভের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কাশ্মিরবাসী। এদিকে শ্রীনগরের মহারাজা হরি সিং হাসপাতাল (এসএমএসএইচ) পরিদর্শনের ভিত্তিতে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে ধারণা করা যাচ্ছে, আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভের আশঙ্কা দেখলেই বেসামরিক জনসাধারণের ওপর ছররা গুলি ছুড়ছে। বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত ৫শ’রও বেশি রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করেছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী।

সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদে কাশ্মীরকে দেওয়া বিশেষ সুবিধা বাতিলের পরিকল্পনায় চলতি সপ্তাহের রোববার থেকেই উপত্যকাটিতে মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট যোগাযোগ বন্ধ করে রাখা হয়; শ্রীনগরে সভা-সমাবেশের ওপরও আরোপ করা হয় নিষেধাজ্ঞা।

সোমবার ভারতের পার্লামেন্টে ৩৭০ অনুচ্ছেদে কাশ্মীরকে দেওয়া সিদ্ধান্ত বাতিলের পর থেকে শ্রীনগরের বিভিন্ন সড়কে আধাসামরিক পুলিশের হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন আছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। স্কুলসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন এলাকার সড়কে আছে ব্যারিকেড।

কাশ্মীরে অচলাবস্থায় বন্ধ হয়ে গেছে স্বাভাবিক খাবার সরবরাহ। ব্যাংক ও এটিএমগুলোতেও টাকা নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে দোকানগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন কাশ্মীরবাসী। ১০০ ঘণ্টা পার হতেই তাই দোকানগুলোতেও শেষ হয়ে গেছে খাবার। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে গেছে বহুগুণ। পাঁচ দিন ধরে চলা এই অচলাবস্থায় না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে নিম্নবিত্ত অনেক কাশ্মীরির।

এর মধ্যেও বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিবাদ বিক্ষোভের খবর মিলছে বলে জানিয়েছেন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি তারা।

কর্মকর্তাদের একজন বলেছেন, শ্রীনগরের অন্তত ৩০টি স্থানে সৈন্যদের ওপর পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষোভ দমাতে পুলিশের প্রতিক্রিয়ায় আহত অন্তত ১৩ জনকে শহরটির প্রধান সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় শ্রীনগরের পুরনো শহরে কয়েক মিটার পরপর দূরত্বে রায়ট গিয়ার নিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রস্তুত থাকতে দেখা গেছে; কয়েকশ মিটার পরপর ছিল কাঁটাতারের চেকপয়েন্ট। দীর্ঘদিন ধরে শ্রীনগরে বিক্ষোভের প্রধান কেন্দ্রস্থল জামে মসজিদের কাছে অন্তত তিনটি স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন উত্তরপশ্চিম শ্রীনগরের বেমিনা এলাকাতেও পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন।

“মানুষের মধ্যে ভয়াবহ ক্ষোভ বিরাজ করছে,” বলেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা।

কাশ্মীরিরা মোদীর এ ৩৭০ অনুচ্ছেদের বিশেষ সুবিধাদি বাতিলের সিদ্ধান্তকে ভারতের অন্য অঞ্চলের লোক ঢুকিয়ে কাশ্মীরের জনমিতি বদলানোর পরিকল্পনা করছেন বলে আশঙ্কা করছেন। পুলিশের এক কর্মকর্তা এখন পর্যন্ত ৩০০ রাজনীতিককে আটক করা হয়েছে বলে জানান। এদের অনেকেই কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতার পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন, বলেছেন তিনি।

কাশ্মীরের প্রভাবশালী দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের দুই নেতা সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আইনপ্রণেতাসহ অন্তত ১০০ নেতাকে আটক করা হয়েছে জানালেও সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া মেইলের হিসাবে আটক ও গৃহবন্দি রাজনীতিকের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে।

অহিংস বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর সম্মিলিত জোট হুররিয়াত কনফারেন্সের চেয়ারম্যান মিরওয়াইজ ওমর ফারুককে মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করা হলেও কয়েক ঘণ্টা পর নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে এনে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে বলে তার কার্যালয় জানিয়েছে। তাদের বেশিরভাগই বন্দি অস্থায়ী জেলখানা মানে গেস্ট হাউজ ও হোটেলগুলোতে।  এর মানে গোটা কাশ্মীরই পরিণত হয়েছে জেলখানায়।

মন্তব্য লিখুন :