নোয়াখালীতে আমন ধানে কারেন্ট পোকার আক্রমণ, দিশেহারা কৃষক

নোয়াখালীর সুবর্ণচর ও দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় রোপা আমন ধানে মহামারি রূপ নিয়েছে ‘বিপিএইচ’ বা ‘কারেন্ট’ নামক পোকার আক্রমন। চোখের সামনে রাতারাতি নষ্ট হচ্ছে জমির ফসল। ঘরে তোলার দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে পোকার এ ভয়াবহ আক্রমন কৃষকদের সোনালি স্বপ্ন ঝলসে যাওয়ার পথে। 

এমন অবস্থায় জেলার কৃষি অঞ্চল খ্যাত ওই দুই উপজেলার কৃষকরা আতংকিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে আর্থিক সংকটে পড়ার শঙ্কাও প্রকট হচ্ছে।

সুবর্ণচর উপজেলার চর ওয়াপদা গ্রামের কৃষক মো. শাহজাহান জানান, তিনি এ বছর ৬ একর জমিতে রোপা আমন আবাদ করেছেন। শুরু থেকে ক্ষেতের ধান বেশ ভালোই বেড়ে উঠছে। এখন গাছে দুধ এসেছে। আর মাত্র ১৫-২০ দিন পরই এ ধান ঘরে তোলার কথা। 

হঠাৎ গত শনিবার ক্ষেতে গিয়ে দেখতে পান কিছু কিছু অংশের ধান ঝলসে গিয়ে মাটিতে মিশে গেছে। এমন অবস্থায় তিনি উপায়ন্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পর দিন কিছু কীটনাশকও ব্যবহার করেছেন, কিন্তু কোনো সুফলই মেলেনি। বরঞ্চ দুই দিনের মাথায় ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। তার জমির ৩০ শতাংশ ধানই এখন ঝলসে গেছে। 

চরজুবলি গ্রামের কৃষক সিরাজ মিয়া জানান, আট একর জমিতে তাঁর এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। বর্তমানে তার দুটি জমিতে পোকার আক্রমণে ধান শেষ হয়ে গেছে। প্রতিদিন পোকা ভিন্ন ক্ষেতে আক্রমণ করছে। এ বছরই এধরনের পোকা তারা প্রথম দেখতে পেয়েছেন। 

শুধু ওয়াপদা বা চরজুবলী নয়। এমন ভয়াবহ অবস্থা সুবর্ণচর উপজেলার মোহম্মদপুর, চরজব্বর, চর আমান উল্যাহ্, চরক্লার্ক, চর আক্রাম উদ্দিন ও চরবাটাসহ পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। একই অবস্থা পার্শ্ববর্তী হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ও হরণি ইউনিয়নেও। 

জেলার বেশিরভাগ জমির আমন ধান কৃষকরা ঘরে তোলার অপেক্ষায় রয়েছে। ক্ষেতের ধানে অনেকটা সোনালি রঙ পড়েছে। আর মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিন পরই এসব ক্ষেতের ধান উঠার কথা কৃষকের ঘরে। তাই ক্ষেতের আইলে আনাগোনাও বেড়েছে কৃষকের। ধান নিয়ে স্বপ্নও বুনতে শুরু করেছে তারা। কিন্তু হঠাৎ গত এক সপ্তাহ ধরে ক্ষেতের ধানগুলো পুড়তে দেখা যায়। ঝলসে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে জমির সোনালি ধান। এর সঙ্গে কৃষকের সোনলি স্বপ্নেরও যেন সমাধি হচ্ছে। একরে একরে জমির ধান এক সপ্তাহের মাথায় ঝলসে যাওয়ার দৃশ্য কৃষকের সব কিছুকে শেষ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। 

পোকার আক্রমন নিয়ে কথা হয় একাধিক কৃষিবিদের সঙ্গে। এর মধ্যে স্থানীয় এনজিও সাগরিকা সমাজ উন্নয়ন সংস্থার কৃষি কর্মকর্তা শিবব্রত ভৌমিক বলেন, এটি মূলত ‘বিপিএইচ’ বা ‘কারেন্ট’ পোকার আক্রমন। যেসব উর্বর জমিতে একাধিকবার ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে, পাশাপাশি বৃষ্টির পানি জমাট বেঁধে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ তৈরি করেছে- সে জমিতেই মূলত এ পোকা সহজে বংশ বিস্তার করে এবং খুব দ্রত আক্রমন করে। পোকাগুলো সাধারণত ধানের কাইচথোড় থেকে দুধ গঠন অবস্থায় গাছের গোড়ায় আক্রমন করে কান্ডের রস চুষে ফেলে। এতে জমির ধান মুহুর্তের মধ্যে ঝলসে যায়।

এ কৃষিবিদের মতে, কৃষক যদি উর্বর জমিতে ইউরিয়া সার একবারের বেশি ব্যবহার না করে এবং জমে থাকা পানি দ্রুত নিষ্কাকশনের ব্যবস্থা করে তাহলে এ পোকার আক্রমন থেকে রেহাই পেতে পারে। পাশাপাশি জৈবিক দমন যেমন- আলোক ফাঁদ ব্যবহারের মাধ্যমে আক্রমন ঠেকাতে পারে। একই সঙ্গে জমিতে পোকার আক্রমণ দেখার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শক্রমে অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। 

কৃষকরা আক্ষেপ করে জানান, এ মুহুর্তে তারা কি করবে তা খুঁজেই পাচ্ছেন না। কীটনাশক কোম্পানীদের কথামতো অনেক কীটনাশকও ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তাতে কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। ক্ষেতের আইলে মাঝে মধ্যে সরকারি কৃষি কর্মকর্তাদের দেখা গেলেও তাদের কাছ থেকে মিলছে না সুপরামর্শ কিংবা সহযোগিতা। 

কৃষকদের মতে, কৃষি কর্মকর্তারা দক্ষতাসম্পন্ন নয়। ফলে ভালো পরামর্শও পাওয়া যাচ্ছে না তাদের কাছে। 

গণমাধ্যম কর্মীদের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কৃষি কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোকার এ আক্রমণের তথ্য পেয়ে টনক নড়েছে সরকারি কৃষি বিভাগের। ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এমন মহামারি থেকে বাঁচতে কৃষকদের সচেতন করতে মাইকিংও শুরু করেছে তারা।