‘ক্ষমতা যার, জলাশয় তার’

গোপালগঞ্জ জেলার সবগুলি নদী এবং খালের পানিতে হাজারো কাঠা (গাছের ডাল ও বাঁশ দিয়ে তৈরী মাছের আশ্রয় স্থল) দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এতে জেলার নদী এবং খালের স্বাভাবিক গতিতে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে কাঠা দিয়ে নদী এবং খাল প্রভাবশালীদের দখলে থাকায় জেলেদের মাছ ধরা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অভিযোগ, এই কারণেই জেলার বিভিন্ন বাজারে নদীর মাছ পাওয়া দুষ্প্রাপ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাঠা দেওয়া ওই প্রভাবশালীরাই নদীর মাছ খেয়ে থাকেন, বাকি মাছ চলে যায় আড়ৎদারদের হাত হয়ে ঢাকায়। যে কারণে জেলাবাসী গোপালগঞ্জের সবগুলি নদী ও খালের সকল কাঠা তুলে দিয়ে জেলার নদীগুলি রক্ষা ও জেলার নিবদ্ধিত জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

সরজমিনে জেলার বিভিন্ন নদী এবং খাল পরিদর্শন করে দেখা গেছে, নদী বা খালের তীরে বসবাসকারী প্রভাবশালী লোকজন তাদের পছন্দমতো স্থানে আকাশী, শিশু ও বাবলা ঘাছের ডাল শুকিয়ে তা নদীর একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে চতুর্দিকে বাঁশ দিয়ে বেড়া দিয়ে কাঁঠা তৈরী করে মাছ ধরার ফাঁদ তৈরী করেছে। দু’মাস পরে ওই কাঠা জাল দিয়ে বেড় দিয়ে তার মধ্যে থাকা মাছ ধরে কেউ পরিবার নিয়ে খাবে। কেউ বা আবার সব মাছ আড়ৎদারদের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠিয়ে দিবে। স্থানীয় বাজারে ওই মাছ বিক্রি হবে না, জেলেদের ভাগ্যেও ওই মাছ জুটবে না। আর ফলে নদীতে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতিতে বাধা সৃষ্টি হয়ে দিন দিন নদী-খাল ভরাট হচ্ছে। জেলার সর্বত্রই এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে।

স্থানীয় জেলেরা জানিয়েছেন, প্রত্যেকটি নদী এবং খালের কাছাকাছি পুলিশ ফাঁড়ির যোগসাজসে এই কাঠা দেওয়া হয়ে থাকে। আমরা নদীতে নিজেদের পছন্দমতো মাছ ধরতে পারি না, নদীতে নামলে কাঠা দেওয়া লোকজন উঠিয়ে দেয়। যে কারণে আমরা দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরতেও পারি না এবং বাজারে দেশী প্রজাতির মাছ বিক্রির সুযোগ পাই না।

গোপালগঞ্জ জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নারায়ন চন্দ্র মন্ডল বলেছেন, মৎস্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী জাল যার জলাশয় তার। কিন্তু বাস্তবে এখানে তা নেই, এখানে টাকা যার, ক্ষমতা যার, জলাশয় তার। প্রতিবছরই এই সময়টা নদী, খাল স্থানীয় প্রভাবশালীদের দখলে থাকে। জেলেরা মাছ ধরে দেওয়ার সুযোগ পায় মজুরীর বিনিময়ে। তারা বাজারে বিক্রি করার সুযোগ পায় না।

তিনি আরো বলেন, গোপালগঞ্জে প্রায় ১৭ হাজার নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। জেলার নদী এবং খালে তারা মাছ আহরণের সুযোগ পেলে বাজারে দেশীয় প্রজাতির মাছ আমদানি থাকতো। পুকুরে, ঘেরে চাষ করা মাছের উপর জনগণকে নির্ভরশীল হয়ে থাকতো হতো না।

গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবাহী প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ বিশ্বাস বলেছেন, গোপালগঞ্জ জেলার পাঁচ উপজেলায় মধুমতি নদী, কুমার মধুমতি নদী, মাদারীপুর বিলরুট চ্যানেল লাইন, বাঘিয়ার নদীসহ সব নদী ও খালে কম করে এক হাজার কাঠা দিয়েছে স্থানীয়রা। এইসব কাঠা দেওয়ার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতি বাধা সৃষ্টি হয়ে দিন দিন নদী ভরাট হচ্ছে। নদী কমিশনের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে নদী রক্ষার জন্য। জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে জেলার সর্বত্র অভিযান চালিয়ে সব কাঠা উচ্ছেদ করা হবে।