ঘূর্ণিঝড় আমফানের তাণ্ডবে বাগেরহাটে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

সুপার সাইক্লোন আমফানের তাণ্ডবে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাট লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। জেলার সর্বত্রই আমফানের আঘাতের ক্ষতচিহ্ন। ঘূর্ণিঝড়ে বিভিন্ন উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ, ঘরবাড়ি ও মৎস্য ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।জেলায় প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক মৎস্য ঘের পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ উপজেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

বুধবার (২০ মে) রাতে ঝড়ের তান্ডবে এ ক্ষয়ক্ষতি হয়।

জানা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ড বাগেরহাটের ৩৫/১ পোল্ডারের শরণখোলা উপজেলার বগী-গাবতলা অংশের ২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থান ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে বাঁধের আশপাশের কয়েকটি গ্রামের নিম্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া বাঁধের আশপাশের বেশকিছু কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। উপড়ে পড়েছে বেশ কিছু গাছপালা। 

জেলার শরণখোলা উপজেলার বাসিন্দা হানিফ শেখ বলেন, রাতে ঘূর্ণিঝড় আমফানের আঘাতে আমার বসতঘর ভেঙে পড়েছে। ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গেছে মাছের ঘের। উপজেলায় আমার মত অনেকেরই ক্ষতি হয়েছে।

জেলার কচুয়া উপজেলার ৭নং ওয়ার্ডের তুহিন শিকদার বলেন, রাতে ঝড়ের তাণ্ডবে গাছ উপড়ে পড়ে বসতঘর ভেঙে গেছে। বাগানের কয়েকটি গাছ উপড়ে পড়েছে ও গোয়াল ঘর পড়ে গেছে।

শরণখোলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজমল হোসেন মুক্তা বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি পড়ে গেছে, উড়িয়ে নিয়ে গেছে ঘরের টিনের ছাউনি। উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছপালা। নদীর পানির চাপে বেড়ি বাঁধের কয়েকটি স্থানও ভেঙে গেছে। ফলে সাউথখালী, দক্ষিণ সাউথখালী, তেরাবেকা, বগী, গাবতলীসহ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. খালেদ কনক জানান, ঝড়ে জেলার ৪ হাজার ৬৩৫টি মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। সব থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে মোংলা, রামপাল, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও উপজেলায়। এতে জেলার কয়েক হাজার চিংড়ি চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারিভাবে ক্ষতি ধরা হয়েছে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। তবে বেসরকারি হিসেবে এ ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি বলে জানিয়েছেন চিংড়ি চাষিরা।

বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদ উদ জামান জানান, সুপার সাইক্লোন আমফানের স্বাভাবিক জোয়ারের থেকে ৭ থেকে ৮ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে বাগেরহাটের শরনখোলা উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ৩৫/৩ পোল্ডারের ২শ’ মিটার বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ নির্মাণে কাজ শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে বন তলিয়ে যাওয়ায় সুন্দরবনের কটকা, দুবলা, চরাপুটিয়া ও কোকিলমুনি বন অফিসের কম্পাউন্ডে দল বেঁধে আশ্রয় নেওয়া কয়েকশ’ হরিণ বনে ফিরে গেছে। সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে সুন্দরবনে প্রথমে আঘাত হানে সুপার সাইক্লোন আমফান। প্রাথমিকভাবে ৮টি বন অফিসের টিনের চালা উড়ে গেছে ও সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে ৫টি জেটি। কোন বন্যপ্রাণী মারা যাওয়ার খবর বা বনের গাছপালার ক্ষয়ক্ষতির হিসেব এখনো পাওয়া যায়নি।

বাগেরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক রঘুনাথ কর বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের আগেই জেলার বোরো ধান কৃষকেরা ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তবে ঝড়ে আউস ও গ্রীষ্মকালীন সবজির সামান্য ক্ষতি হয়েছে, তা নিরুপণের জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জানান, সরকার বাগেরহাট জেলার জন্য ২০০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৩ লাখ টাকা, ২ লাখ টাকার শিশু খাদ্য, গো-খাদ্যের জন্য ২ লাখ টাকা ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দিয়েছে। জেলার কোথাও কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বেশ কিছু ফসল, মৎস্য ঘের, কাঁচা ঘরবাড়ি ও গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও  বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।