তাজউদ্দীন আহমদ: বাংলার অবিসংবাদিত নেতা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হল ১৯৭১ সালের নয়টি মাস। বাংলাদেশের চব্বিশ বছরের স্বাধিকার আন্দোলন ও সংগ্রাম রূপান্তরিত হয় স্বাধীনতার যুদ্ধে। ঐ নয়টি মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের হাল ধরে যিনি তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিকে বিজয়ের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তিনি হলেন তাজউদ্দীন আহমদ– বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতা যুদ্ধের অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের অনন্য নেতা ও রাষ্ট্রনায়ক।

খাঁটি নেতা তিনিই যিনি অন্যের বেদনার ভার নিজ কাঁধে বহন করেন ও মুক্তির পিচ্ছিল পথটির পথপ্রদর্শক হন প্রজ্ঞা, সাহস, সততা ও দক্ষতার আলো ছড়িয়ে। রাষ্ট্রনায়ক ভাবেন শত বছর পরের কথা। সেই অনুযায়ী তিনি সমুখে চলার পথের মানচিত্র নির্মাণ করেন; জনকল্যাণভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র তিনি গড়েন গণমানুষকে সঙ্গে নিয়েই। নেতা ও রাষ্ট্রনায়কের বিরল গুণে ভূষিত তাজউদ্দীন আহমদকে তাই ভালোমত না জানলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসও রয়ে যাবে অসম্পূর্ণ।

মনীষীরা বলেন যে, ইতিহাসে কোনো ফাঁক রাখতে নেই। ফাঁক থাকলেই তাতে ঢুকে পড়ে জঞ্জাল। যার যেখানে স্থান নেই, সে সেখানে তখন স্থান দখল করে বসে। স্বাধীনতার প্রতিপক্ষ, দ্বিধা-বিভক্তকারী ও সুযোগসন্ধানীরা তখুনি ইতিহাসের বিকৃতি ঘটাতে সচেষ্ট হয়।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনার প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা। তাজউদ্দীন আহমদ সেই প্রেরণাকে প্রবাহিত করেছিলেন সুনির্দিষ্ট পথে। পাকিস্তান কারাগারে অন্তরীন বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাজউদ্দীন তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে শক্তি সঞ্চার করেছিলেন এক আপোষহীন স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে।

তাজউদ্দীন সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ‘তাজউদ্দীন আহমদের ডায়রি ১৯৪৭-৪৮’ গ্রন্থের ভূমিকায় লেখেন–

“তাজউদ্দীন তাঁর অসাধারণ গুণাবলী দিয়ে বাংলাদেশের আত্মঅধিকার ও পরে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী পার্টিতে প্রথমে কর্মী ছিলেন, পরে এর সাংগঠনিক হাল ধরেছিলেন এবং একাত্তরে একটা অত্যন্ত জটিল অভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্যে জাতির মুক্তিযুদ্ধে সফল রাজনৈতিক নেতৃত্ব দান করেন। এ জাতির ইতিহাসে, তথা বাঙালির আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাজউদ্দীনের এই অবদান, অদ্বিতীয় এবং অবিস্মরণীয়।”

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চে, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর চোখ এড়িয়ে, দুর্গম যাত্রার সঙ্গী ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামের সঙ্গে ঢাকা ত্যাগ করার সময় রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া এক চিরকুটে তিনি তাঁর স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন লিলিকে লিখেছিলেন–

“লিলি, আমি চলে গেলাম। যাবার সময় কিছুই বলে আসতে পারিনি। মাফ করে দিও। আবার কবে দেখা হবে জানি না…… মুক্তির পর।তুমি ছেলেমেয়ে নিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের সাথে মিশে যেও।

তাজউদ্দীন আহমদ (২৩ জুলাই ১৯২৫ - ৩ নভেম্বর ১৯৭৫) বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সাফল্যের সাথে পালন করেন। একজন সৎ ও মেধাবী রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন যা মুজিবনগর সরকার নামে অধিক পরিচিত। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হিসাবে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হবার পর আরও তিনজন জাতীয় নেতাসহ তাঁকে বন্দী করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। সেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেই ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর বন্দী অবস্থায় ঘাতকের বুলেটে তিনি নিহত হন।

ব্যক্তিগত জীবন

তাজউদ্দীন আহমদ ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই গাজীপুর জেলার অন্তর্গত কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলভী মোঃ ইয়াসিন খান এবং মাতা মেহেরুননেসা খান। তাঁর স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর বর্তমান সদস্য। তাঁদের ৪ সন্তান রয়েছে। বড় মেয়ে শারমিন আহমদ রিতি; মেজো মেয়ে বিশিষ্ট লেখিকা ও কলামিস্ট এবং গাজীপুর-৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমি এবং কনিষ্ঠা মেয়ে মাহজাবিন আহমদ মিমি। পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে আসীন অবস্থায় পদত্যাগ করেন ও ৭ জুলাই, ২০১২ তারিখে তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।