কবিগুরুর জন্মদিন আজ

আজ ২৫ বৈশাখ। কাব্য, গীত, কথাসাহিত্য তো বটেই, বাঙালি সত্তা ও সংস্কৃতির মহানায়ক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন আজ। ১৬০ বছর আগে ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি আলো করে জন্ম নেন বাংলা সাহিত্যের এই প্রবাদপুরুষ। এরপর গত দেড় শতক ধরে বাঙালির যাপিত জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে জড়িয়ে পড়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখতে শুরু করেন ৮ বছর বয়সে। আটপৌরে বাঙালির মতো তার শুরুটা হয়েছিল ছড়া দিয়ে, যা পূর্ণাঙ্গতা পায় কবিতায়। একদিন সেই কবিতাই তাকে তুলে ধরে বিশ্ব দরবারে। তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বকবি।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৮৭৮ সালে ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশে ইংল্যান্ড যান ঠাকুর বাড়ির কনিষ্ঠ পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেখানে তিনি ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৭৯ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইনবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু গৃহের টান তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। বাংলার নদী, জল, ফুল, পাখি, ফল হাতছানি দিয়ে ডাকছিল। তাই মাত্র দেড় বছর ইংল্যান্ডে কাটিয়ে ১৮৮০ সালে কোনো ডিগ্রি না নিয়েই দেশে ফিরে আসেন।

১৮৮৩ সালের পারিবারিক রেওয়াজ মেনে ভবতারিণীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সদ্য কৌশোর পেরেনো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যদিও বিবাহিত জীবনে ভবতারিণীর নামকরণ হয়েছিল মৃণালিনী দেবী।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য ‘শ্রীনিকেতন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বিশ্বভারতী’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সবকিছুর মধ্যেও ১৮৭৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত পাঁচটি মহাদেশের ৩০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বোলপুরে ‘শান্তিনিকেতন’ নামক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ‘নাইট’ উপাধি বর্জন করে নিবিড় দেশপ্রেমের পরিচয় দেন।

মৃত্যু: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ মারা যান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এশীয়দের মধ্যে প্রথম সাহিত্যিক হিসেবে তিনি এ পুরস্কারটি লাভ করেন ।

কবিগুরুর জন্মদিনে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, রবীন্দ্রনাথের বিশালতা এবং তার সৃষ্টির অপূর্ব মাধুর্যকে অন্তরাত্মা দিয়ে উপলব্ধি করতে হলে রবীন্দ্রচর্চার বিকল্প নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জগৎ-সংসারকে গভীরভাবে জানতে তরুণ প্রজন্ম রবীন্দ্রসাহিত্যে অবগাহন করবে, রবীন্দ্রচর্চায় থাকবে ব্যাপৃত, যা কেবল আচারসর্বস্ব নয়, জীবনসর্বস্ব।

বিশ্বকবির জীবনাদর্শ এবং তার সৃষ্টিকর্ম শোষণ-বঞ্চনামুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে চিরদিন বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করবে বলে বাণী উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবোধ বাঙালির অনন্ত প্রেরণার উৎস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার কবিতা ও গান মুক্তিকামী বাঙালিকে উদ্দীপ্ত করেছে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। জীবনের প্রতিটি সমস্যা-সংকট, আনন্দ-বেদনা ও আশা-নিরাশার সন্ধিক্ষণে রবীন্দ্রসৃষ্টি আমাদের চেতনাকে আন্দোলিত করে।

প্রতিবছরই সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন ধরনের সংগঠনের নানা ধরনের আয়োজনে মহাসমারোহে রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী উদযাপন করা হয়ে থাকে। তবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিনে কোনো অনুষ্ঠান থাকছে না। টেলিভিশন, রেডিও, দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজপোর্টালগুলো তার জীবন ও কর্মের ওপর বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করছে, লেখা প্রকাশ করছে।

অনুষ্ঠান-আয়োজন হোক না না হোক, ২৫ বৈশাখ মানেই রবীন্দ্রনাথ, ২৫ বৈশাখ মানেই বাঙালির আপনার জনকে আরও একবার ফিরে দেখা তারই আলোয়। শুভ জন্মদিন রবি ঠাকুর।