সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল: সমালোচনায় আংশিক সেবা!

অদৃশ্য কারণে তড়িঘড়ি করে হাসপাতালটি উদ্বোধন করা হয়েছে। এরপর তিন মাস পেরুলেও চালু হয়নি সেবা কার্যক্রম। এ নিয়ে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। যার প্রেক্ষিতে গণমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে সাড়ে তিনমাসের মাথায় কুম্ভকর্ণ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সজাগ হয়। চিকিৎসাসেবা চালু করা হয় হাসপাতালটিতে। তবে এখনও সকল সেবা চালু করা সম্ভব হয়নি! এই ঘটনায় হাসপাতালে আগত সেবাপ্রার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে উদ্বোধনের এতো মাস পরেও সকল সেবা পাওয়া যাচ্ছে না, যা খুবই দুঃখজনক। এদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, ধাপে ধাপে সকল সেবা চালু করা হবে।


জানা যায়, ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। এরপর ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর, বুধবার গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে হাসপাতাল উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনের পর তিন মাসের অধিক সময় পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি চিকিৎসা সেবা। এ নিয়ে সেবাপ্রার্থী, সাধারণ মানুষসহ হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট মহলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে গতবছরের ২৭ ডিসেম্বর ১৪টি বিভাগে কনসালটেশন সার্ভিস সেন্টারে কার্যক্রম শুরু করে কর্তৃপক্ষ।



সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের গ্রাউন্ড ফ্লোরে ওয়েলকাম ডেস্ক বসানো হয়েছে। সেখানে দুইজন দায়িত্ব পালন করছেন। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে দেখা যায়, একের পর এক রোগী ও তাদের স্বজনরা সেখানে এসে তথ্য নিচ্ছেন। তখন কাউকে বলা হচ্ছে, এই সেবা ওই দিকে পাবেন। তবে আগতদের অধিকাংশকে শুনতে হচ্ছে, এসব সেবা এখনও চালু হয়নি। আর কবে চালু হবে সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কর্তব্যরতরা। ফলে আগতদের অধিকাংশকেই হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে। এ নিয়ে তাদেরকে ক্ষোভ প্রকাশ করতেও দেখা গেছে।




মিরপুর থেকে এসেছেন স্বপন উদ্দিন। তিনি কাগজপত্র নিয়ে ওয়েলকাম ডেস্কে কথা বললেন। কিন্তু এরপর মন খারাপ করে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় তার সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বিবার্তাকে বলেন, শুনেছিলাম- ভালো চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতাল চালু করা হয়েছে। তাই আমি এক ডাক্তারের পরামর্শে রেডিওলজিক্যাল পরীক্ষা করাতে এসেছিলাম। কিন্তু আমাকে বলা হলো, এটা এখনো চালু হয়নি। আর কবে চালু হবে সেটাও তারা ক্লিয়ার করে বলতে পারল না।


ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, হাসপাতাল উদ্বোধনের ৪ মাস হয়ে গেছে- এখনও এখানে এই সেবা নাই, ওই সেবা নাই বলা হচ্ছে! তাহলে আর কতদিন পরে তারা পুরো সেবা দিতে পারবে? এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অনিচ্ছা, গাফিলতি থাকতে পারে। সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত।


চিকিৎসা না পেয়ে ফেরত যাওয়া আরেক রোগী আসমা বেগম বিবার্তাকে বলেন, এই হাসপাতালে এক ছাদের নিচে সব সেবা থাকবে বলে টেলিভিশনে দেখলাম। ঘটাও করে উদ্বোধন করা হলো! আর এখন সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। কেমনটা লাগে বলেন!


তিনি বলেন, আমাকে প্রথমে বলা হলো ওই রুমে যান। সেখানে কথা বলেন। কিন্তু আমি সেখানে গিয়ে কাউকে না পেয়ে ওয়েলকাম ডেস্কে এসে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, এটা হয়তো এখনো চালু হয়নি। আগামী সপ্তাহে আসেন।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন বিবার্তাকে বলেন, আমি কিডনির সমস্যার কারণে এখানে চিকিৎসা নিচ্ছি। তবে এটা সত্য যে, এখানে আগতদের অধিকাংশই এখনো পুরো সেবা পাচ্ছেন না। এটা কেন হচ্ছে? কী কারণে হচ্ছে? সেটা কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।


তিনি বলেন, আমি মনে করি- সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল করা হলো। কাজেই এই হাসপাতাল যাতে তার নামের প্রতি সুবিচার করতে পারে সেই উদ্যোগ কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।


হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে সেবা চালু হওয়া ১৪টি বিভাগ হলো: জেনারেল শিশু, অবস অ্যান্ড গাইনি, অফথালমোলজি, বক্ষব্যধি, নিউরোলজি, নেফ্রোলজি (কিডনি), ইউরোলজি, কার্ডিওলজি, কার্ডিয়াক সার্জারি (থোরাসিক সার্জারিসহ), সার্জিক্যাল অনকোলজি, অর্থপেডিক্স এন্ড ট্রমা, হেপাটোলজি (লিভার), গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, হেপাটোবিলিয়ারি অ্যান্ড প্যানক্রিয়েটিক সার্জারি বিভাগ।



সূত্র জানায়, এই হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, যন্ত্রপাতি স্থাপনসহ চিকিৎসা সংক্রান্ত অনেক কাজই বাকি রয়েছে। ফলে হাসপাতালের কার্যক্রম এখনো পুরোদমে চালু হয়নি। মূল কারণ হলো- উদ্বোধনের আগে পুরো সেটআপের নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে তা পালন করেনি কর্তৃপক্ষ। এখন উদ্বোধনের পর কী কী সমস্যা রয়েছে তা দেখে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের একজন অধ্যাপক বিবার্তাকে বলেন, হাসপাতালের প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগে তড়িঘড়ি করে উদ্বোধন করার উদ্যোগ নিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া রয়েছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন ডাক্তার বিবার্তাকে বলেন, হাসপাতালটির প্রস্তুতি নিয়ে উপাচার্য প্রধানমন্ত্রীকে অসত্য তথ্য দিয়েছেন। প্রস্তুতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক তথ্য জানানো হলে হয়তো এতো আগে এটা তিনি উদ্বোধন করতে রাজি হতেন না। উপাচার্যের এই তড়িঘড়ির পেছনে ব্যক্তিস্বার্থ থাকতে পারে বলে আমার মনে হয়।


সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল তড়িঘড়ি করে উদ্বোধন করার বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (উন্নয়ন ও গবেষণা) অধ্যাপক ডা. জাহিদ হোসেন বিবার্তাকে বলেন, এ বিষয়ে তো ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) কথা বলবে। এতো এডভান্স কেনো উদ্বোধন করেছেন? আর এটা তো ওনারই দায়িত্ব। জনবলসহ সবকিছু তো আগে করতে হতো। আর যদি ইনকমপ্লিট থাকে, তাহলে অপেক্ষা করবে। আর যখন কমপ্লিট হবে তখন চালু করবে। কাজেই উনি কী করেছেন, তিনি ভালো বলতে পারবেন।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. আব্দুল্লাহ আল হারুন বিবার্তাকে বলেন, আমরা কিন্তু অলরেডি ১৪টা বিভাগে সার্ভিস চালু করেছি। সকালে ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত এবং বিকালে ৩টা থেকে ৬টা পর্যন্ত এই সেবা চলছে। আর সেখানে আমাদের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং সহকারী অধ্যাপকবৃন্দ রোগী দেখছেন।


পুরোপুরি সেবা কার্যক্রম দিতে দেরি হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি হাসপাতাল যখন শুরু হয় তখন তার একটা প্ল্যানিং থাকে। এখানেও প্রথমেই আমরা শুরু করলাম। এরপর আস্তে আস্তে সবকিছু ওপেন করব। আগামী সপ্তাহে রেডিওলজিসহ আরও বেশকিছু সেবা চালু করা হবে। অর্থাৎ ধাপে ধাপে ধাপে সবকিছু করা হবে।


সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পুরো সেবা কার্যক্রম চালু না হওয়ার বিষয়ে অবগত করে মন্তব্য জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বিবার্তাকে বলেন, অলরেডি আমাদের সেবা কার্যক্রম চলছে। এখন পুরো কার্যক্রম শুরু করতে যে কয়দিন লাগে আর কি!


উদ্বোধনের পর দেরি করে সেবা চালু করেও পুরো সেবা না দিতে পারার বিষয়ে তিনি বলেন, ইন্সুট্রুমেন্ট করোনার জন্য আসতে দেরি হওয়াতে কার্যক্রমে একটু দেরি হয়েছে। কিন্তু এখন আমাদের পুরোদমে কাজ চলছে।


এদিকে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পুরো সেবা কার্যক্রমে বিলম্বিত হওয়ার সমালোচনার প্রেক্ষিতে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, আগামী ২৩ জানুয়ারি পুরোদমে চালু হচ্ছে দেশের প্রথম সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অধীনে থাকা হাসপাতালটিতে ওইদিন থেকে রোগী ভর্তিসহ সকল সেবা চালু হবে। ১০ জানুয়ারি, মঙ্গলবার সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপ’ অনুষ্ঠানে তিনি এইসব কথা বলেন।