নাইমুল আবরারের মৃত্যু: প্রথম আলো কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানোর কোন সুযোগ নেই

ফেইসবুকে, অনলাইন পোর্টালে- কালো ফ্রেমের চশমা ও হ্যাটের সামনের ভাগ পেছন দিকে ঘুরিয়ে মাথায় দেয়া আবরারের একটি ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। অনিন্দ্য সুন্দর একটি ছবি। সব বাবা মায়ের কাছে তার সন্তানের মুখ সব থেকে প্রিয়, তারপরও সুন্দর মুখ সাধারণ মানুষ বেশি ভালোবাসে। আবরারের মুখ দেখে ভালো না বেসে থাকতে পারবে এমন কোনও মানুষ নেই। কিন্তু এই মুখটি আর নেই পৃথিবীতে। এই মুখটি কি কোন রোগে বা কোন যানবাহন দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেছে? না, অন্যকোনও দুর্ঘটনায়! খুব সাধারণভাবে ঘটনা বিশ্লেষণ করলে মনে হবে এই মুখটি একটি দুর্ঘটনায় অকালে পৃথিবী থেকে চলে গেছে। কিন্তু যেভাবে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র নাইমুল আবরার মারা গেছেন তাকে কি দুর্ঘটনা বলা যায়?

পৃথিবীর কিছু কিছু স্থানকে বলা হয়ে থাকে সব থেকে নিরাপদ স্থান। সেখানে কোন দুর্ঘটনা হয় না বলেই মানুষ নিশ্চিন্তে থাকে। কারণ, এইসব জায়গা সব থেকে নিরাপদ বলা হয়। যেমন এই লেখা যখন লিখছি তার একদিন পরে জেল হত্যা দিবস, জেলখানাকে সব থেকে নিরাপদ স্থান বলা হয়। এখানে কোন মানুষ কাউকে হত্যা করতে পারে না। যদি করে তাহলে সে সকল দায় জেল কর্তৃপক্ষের। তেমনি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কোন পত্রিকা কর্তৃপক্ষ, কোন মিউনিসিপ্যালিটি কর্তৃপক্ষ, কোন সরকারি প্রতিষ্ঠান- এমনি যারা সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল বলে সমাজে পরিচিত, রাষ্ট্রে পরিচিত, তারা যদি কোনও অনুষ্ঠান করে তাহলে সেখানে নিশ্চিন্তে সবাই যায়। কারণ, সব ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রেখেই তারা অনুষ্ঠান করে। আর তারপরে এই অনুষ্ঠান যদি হয় শিশু কিশোরদের নিয়ে তাহলে সেখানে দায়িত্ব আরো অনেক বেশি। যারা শিশু কিশোরদের নিয়ে কাজ করে তাদের সেই দায়িত্ব আছে বলেই পিতা-মাতা তাদের অনেকখানি অবুঝ ছেলে মেয়েদের সেখানে পাঠায়। তারা জানে কর্তৃপক্ষ সেই দায়িত্ব পালন করবে।

প্রথম আলো পত্রিকার সহযোগী পত্রিকা ‘কিশোর আলো’র অনুষ্ঠানে যেভাবে নাইমুল আবরার মারা গেল, এখানে কি এই কর্তৃপক্ষ শিশু কিশোরদের নিয়ে অনুষ্ঠান করার মত দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে? প্রথম আলো-র পক্ষ থেকে ‘কিশোর আলো’-র সম্পাদক আনিসুল হক ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে ‘দু:খিত’ বলেছেন। একটি বাবা মায়ের সন্তানের মৃত্যু কি এতই হালকা যে সেটা ফেইসবুকে শুধু ‘দু:খিত’ বলার মতো কিছু! এটা কি পরিহাসের মত শোনায় না? এই মৃত্যুকে নিয়ে এই পরিহাস না করলেই কি হতো না? প্রথম আলো কর্তৃপক্ষের বা ‘কিশোর আলো’-র অনুষ্ঠান না হয়ে এটা যদি অন্য কোনও কোম্পানির অনুষ্ঠান হতো তাহলে তাদের বিবেক এটাকে শুধু দু:খিত বলার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকতো? আর ওই কর্তৃপক্ষ যদি এমন ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে তাদের দায় এড়াতে চাইতো, একটি পত্রিকা হিসেবে প্রথম আলো কি সেই দায় এড়ানোকে সমর্থন করতো? তবে এমন একটি মৃত্যুর পরে যারা ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে দায় শোধ করতে পারে তাদের বিবেক নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন যুক্তি নেই। কারণ, এই কাজের ভেতর দিয়েই তাদের বিবেকের দৌড় প্রকাশিত হয়ে গেছে।

যেভাবে আবরারের মৃত্যু ঘটেছে, পত্র-পত্রিকায় যেটুকু খবর এসেছে তাতে এটা নিশ্চিত বলা যায়, বাস্তবে দায়িত্বহীনতার কারণেই এই মৃত্যুটি ঘটেছে। এটা এক ধরনের পরোক্ষ হত্যাকাণ্ড। কারণ, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, প্রথম আলোর এই প্রতিষ্ঠান কিশোর আলো তাদের অনুষ্ঠানে জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল। সেটা স্টেজের কাছাকাছি ছিলো এবং তার পাশে বসে আবরার ও তার বন্ধুরা গল্প করতে গিয়ে আবরার ওই জেনারেটারের ওপর পড়ে যায়। সাধারণত কোন গণ্ডগ্রামেও যদি জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় কোন অনুষ্ঠানে তাহলে সেখানে কোন লোহার বেড়া না দিলেও বাঁশ বা কাঠের বেড়া দিয়ে জেনারেটরটির চার পাশ ঘিরে রাখা হয়। আর সেখানে ঢাকা শহরে, একটি পত্রিকার অনুষ্ঠান হচ্ছে, সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সেই অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন, আয়োজন করেছেন- সেখানে জেনারেটর এভাবে আলগা থাকবে? সেটার চারপাশ ঘেরা থাকবে না? তারওপর কোন ভলান্টিয়ার থাকবে না? সেখানে গিয়ে কিশোররা গল্প করার মত সুযোগ পাবে সেটা দেখারও কেউ নেই? দায়িত্বহীনতার চূড়ান্ত বলে একটা কথা আছে, এটা কি তাকেও ছাড়িয়ে যায় না? আর এই চরম দায়িত্বহীনতার মধ্যদিয়ে যখন একটা মানুষের মৃত্যু ঘটে তখন সেটাকে কি মৃত্যু বলা হবে? না, হত্যাকাণ্ড বলা হবে?

তবে এখানে আশ্চর্য লাগছে পুলিশের ভূমিকা দেখে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা দেখে, এমনকি এই অনুষ্ঠানের অনুমতি সরকারের যে কর্তৃপক্ষ দিয়েছিল- তাদের ভূমিকা দেখে। পত্র-পত্রিকার রিপোর্টে বলা হচ্ছে, আবরারের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তাদের কোন অভিযোগ নেই বলে আবরারের মৃতদেহ তাদের কাছে পুলিশ হস্তান্তর করেছে। এ ধরনের কোন অপমৃত্যুর ঘটনার পর পুলিশ কোনরূপ সরকারি হাসপাতালের ময়না তদন্ত ছাড়া মরদেহ হস্তান্তর করতে পারে কি? তাছাড়া যে কোন কারণে হোক, আবরারের পরিবার কোন ডায়েরি বা মামলা করেনি, কিন্তু পুলিশ কি নিজ থেকে এ কাজ করবে না?

এই লেখা যখন লিখছি তখন আবরারের মৃত্যুর প্রায় ২০ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। এখনও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি ছাত্রের এমন করুণ মৃত্যু নিয়ে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপমন্ত্রী দুজনই উচ্চশিক্ষিত এবং শুধু হৃদয়বান নন, রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাদের মানুষের প্রতি দায়বোধ সাধারণের থেকে একটু বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবে এ দুজন বিষয়টি হালকাভাবে নিবেন না। কারণ, পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী এখানে আরো অনেকগুলো ক্রাইম ঘটেছে, প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ নিজের থেকে কোনও ডায়েরি করেনি। যা এ ধরনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে অবশ্য করণীয়। তাই পুলিশকে দেখতে হবে কেন প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ এটা করলো না। দেশের সকল ছাত্রের অভিভাবক হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এটা দেখতে হবে। দেশের সকল মানুষের নিরপত্তার দায় থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়কে এটা দেখতে হবে। পাশাপাশি সেখানে কাছে সরকারি হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও কেন চার মাইল দুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ বিদ্যুতস্পৃষ্ট আবরারকে নিয়ে গেল এই রহস্যও পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে খুঁজে দেখতে হবে।

অনলাইন পোর্টালগুলোতে যা সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে আবরারের মৃত্যু ঘটেছে অবহেলায়। কারণ, সেখানে মেডিকলে ক্যাম্পের এফসিপিএস ডাক্তারদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল দ্রুত তাকে নিকটস্থ সরকারি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হোক। কিন্তু তা না নিয়ে চার মাইল দূরে ‘আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে’ নেয়া হয় শুধুমাত্র এ কারণে যে প্রথম আলোর সঙ্গে তাদের চুক্তি আছে তারা ফ্রি চিকিৎসা দেবে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের কয়েকটি টাকা বাঁচানোকে তারা আবরারের জীবনের থেকে বেশি মূল্য দিয়েছে। কসাইও মনে হয় এমন কাজ করে না। তাছাড়া ঘটনাটি এমনই হালকাভাবে নেয়া হয় যে, তারা রীতিমতো অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছে। তাই এই অবহেলায় মৃত্যু কি হত্যাকাণ্ড নয়? আর এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের পর সবকিছুই ফেইসবুকের স্ট্যাটাসে শেষ হয়ে যাবে? কোন সার্কাস কর্তৃপক্ষ যদি একাজ করতো, আইনের হাত থেকে কি তারা রেহাই পেতো? তাহলে এখানে সরকার নিশ্চুপ কেন?


লেখক: স্বদেশ রায়