শাহবাগ আন্দোলনের ইতিবৃত্ত ‘গণজাগরণের দিনগুলি’

সত্যি বলতে দীর্ঘদিন ধরে বইয়ের বাজারে একটি বইয়ের অভাব দারুণভাবে অনুভব করছিলাম। অবশেষে এ সময়ের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মশাল বহনকারীদের অন্যতম এক তরুণ এফ এম শাহীন সে অভাব বা ঘাটতিটা পূরণ করতে এগিয়ে আসায় ওকে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মোবারকবাদ জানাই। হ্যাঁ, আমি গণজাগরণ মঞ্চ বিষয়ক একটি বইয়ের কথাই বলছি। গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে ওঠার পর অদ্যাবধি এর সৃষ্টি এবং বিকাশ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেউ বিস্তারিতভাবে কিছু লিখেছেন বলে আমার জানা নেই। অবশ্য,আমি বেশ কিছুকাল যাবত দেশে না থাকায় এ বিষয়ে আমার সম্যক ধারণা নেই।

যা হোক,গণজাগরণ মঞ্চের উৎপত্তি এতদঞ্চলে বলতে গেলে সংবিৎহারা ও খানিকটা দিকভ্রষ্ট জাতির জন্য মহাজাগরণরূপেই প্রতিভাত হয়েছিল। একাত্তরে বাঙালির সুপ্ত চেতনা যেমন ভিসুভিয়াসের বিশ্বধ্বংসী অগ্নিস্রাবের মতো দেখা দিয়েছিল,তারই প্রতিরূপটি যেন আবার আমরা দেখতে পেলাম এই গণজাগরণ মঞ্চের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে।

একাত্তরে যারা বয়সের স্বল্পতা বা আধিক্যের কারণে সশরীরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে না পেরে হায় আফসোস করে ফিরত, এই গণজাগরণ মঞ্চের অভ্যুদয়ের পর এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে বা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে তাদের অনেকেরই সেই আক্ষেপ অনেকটাই মিটে যেতে দেখেছি।

পঁচাত্তরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাস্নাত ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা-সমৃদ্ধ আমাদের দেশটিকে প্রতিক্রিয়াশীল ধারায় পরিচালনার যে হীনচক্রান্ত শুরু হয় তাতে জাতিগতভাবে আমরা সকলেই শুধু হতভম্বই নয়,কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি!অতঃপর পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের সেই শাণিত চেতনাধারায় ফিরিয়ে আনতে গণজাগরণ মঞ্চ যে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে তা আমাদের এ কালের ইতিহাসের এক পরম সম্পদ হয়েই রইবে। এ সময়ের তরুণ প্রজন্মের প্রতি বিশেষত এই মঞ্চের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যিনি বা যাঁরা ঘনিষ্টভাবে যুক্ত ছিলেন তাদের প্রতি গোটা জাতি তাই শ্রদ্ধায় অবনত থাকবে চিরকাল।

এফ এম শাহীন সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও গণজাগরণ মঞ্চের প্রথম থেকে শেষ অবধি যে বিবরণ এই বইটিতে লিপিবদ্ধ করেছেন তা গবেষকদের তো বটেই, এমনকি যে কোনো সহৃদয় ও অনুসন্ধিৎসু পাঠককেও পরিতৃপ্তি দেবে। যদিও এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত বিবরণ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ সংযোজনের আবশ্যকতা রয়েছে, তথাপি এফ এম শাহীন রচিত এই পুস্তকটিকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশই নেই। বরং এটিই এ বিষয়ে আগামীতে যে কোনো রচনা বা লেখালেখির মূলভিত্তি হিসেবেই যে কাজ করবে সে বিষয়ে অন্তত আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই।

মোটকথা,এ ব্যাপারে ভবিষ্যতে যারা কিছু লিখতে চাইবেন,তাদের কাছে শাহীনের বইটি সূত্রধর হিসেবে বিশেষভাবে বিবেচিত হবেই। এ বইটিতে এফ এম শাহীন গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে তোলার এবং রাজাকার,আল বদর, আল শামসদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়ার ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের শাস্তি বিধানের ক্ষেত্রটি প্রস্তুত করে দিয়ে এই মঞ্চ ইতিহাসে যে অনন্য স্থান অধিকার করেছে তার চমৎকার ও অত্যন্ত বিশ্বস্ত বিবরণ তুলে ধরেছেন সাবলীল ও সহজবোধ্য ভাষায়।

তাঁর লেখায় মুন্সিয়ানার ছাপ স্পষ্ট আর সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিষয়ে তাঁর মন যে কত সংবেদনশীল তা পুস্তকটির ছত্রে ছত্রে বিধৃত। এফ এম শাহীনদের মতো অনেক লড়াকু সৈনিক সেদিন ছিল বলেই দেশ আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল স্রোতধারায় ফিরে আসতে পেরেছিল।

তবে সেদিনের সেই নানামুখি প্রতিকূলতার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর কন্যা,আমাদের সকলের প্রিয় নেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিপূর্ণ সমর্থন, অদম্য সাহস,দৃঢ় প্রত্যয়, অসীম ধৈর্য,অসামান্য প্রজ্ঞা আর অকৃত্রিম সহযোগিতা মূল প্রণোদনা হিসেবে কাজ করেছিল এ কথাটিও ইতিহাসের প্রয়োজনে অকপটে ও সুস্পষ্টভাবে উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন, এ ধরনের বই-পুস্তকে।

সে যাই হোক,গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে এ দেশের অগণিত মানুষের যে নিবিড় সখ্য ও নাড়ির সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা এককথায় অভূতপূর্ব। আমি নিজেও যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে অকুতোভয়ে সাক্ষী দিয়েছি সেদিন ইতিহাসের ও সময়ের দাবি পূরণের কথাটিকে মাথায় রেখে।

এই সুযোগে নিজের কথা একটু বলি। কাদের মোল্লার রায় ঘোষিত হবার পরপরই আমি এডভোকেট রানা দাশগুপ্তের ফোন পাই এবং আমার প্রিয়ভাজন ও জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে নিরবিচ্ছিন্নভাবে লড়াইতে সামিল আল নোমানকে সঙ্গে নিয়ে রানা দার সঙ্গে দেখা করতে যাই এবং অন্যান্য প্রসিকিউটরসহ বৈঠকে মিলিত হই আর সব জানতে পেরে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি।

প্রজন্ম ৭১সহ বিভিন্ন সমমনা সংগঠনের সঙ্গে সেই মুহূর্তেই যোগাযোগের প্রয়োজন বোধ করি এবং সেই মোতাবেক কাজ শুরু করার পূর্বেই লক্ষ্য করি যে,শাহবাগ চত্বরে কিছু তরুণ-যুবক একত্রিত হয়েছেন এর প্রতিবাদের জন্য এবং সকলকে এই উদ্যোগের সঙ্গে শামিল হওয়ার জন্য উদাত্ত আহবান জানিয়েছেন। অতঃপর কিয়ৎকাল পরেই তাঁদের সেই ভ্রুণ থেকে আত্মপ্রকাশ করে গণজাগরণ মঞ্চ। যার মোটামুটি বিশদ বিবরণ এফ এম শাহীনের এই বইটিতে পাওয়া যাবে। এই মঞ্চ সারাদেশেই মুহূর্তের মধ্যে মাউন্ট এটনার মতো গর্জে ওঠে।

আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার দৃপ্ত পদচারণায় আর মুহুর্মুহু বজ্র-নির্ঘোষ রাজাকার-বিরোধী শ্লোগানে-শ্লোগানে শাহবাগ চত্বর প্রকম্পিত হয়ে ওঠে আর তার রেশ সারা দেশে নীলাম্বুরাশির অতন্দ্র তরঙ্গের মতো কলমন্দ্রমুখর হয়ে ওঠে।

মঞ্চ গঠিত হবার তিন দিনের মাথায় দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক-কর্মচারীদের একদিনের বেতন সংগ্রহের ব্যবস্থা করে ইত্তেফাকের ব্যানার সহযোগে চিফ রিপোর্টার আবুল খায়ের,বর্তমানে জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিনসহ অনেককে সঙ্গে নিয়ে শাহবাগ চত্বরে গিয়ে মঞ্চের তরুণকর্মী রোমেলের সহযোগিতায় সে অর্থ নেতৃবৃন্দের হাতে পৌঁছাবার ব্যবস্থা করি।

তাছাড়াও,শোলাকিয়ার প্রধান ইমাম মৌলানা ফরিদউদ্দিন মাসুদের নেতৃত্বে তিনশতাধিক বিশিষ্ট আলেম-ওলেমাকে গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করানোর ব্যাপারে আমি প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে দারুণ তৃপ্তি বোধ করেছিলাম। প্রতি রাতে গণজাগরণ মঞ্চে যাওয়া,প্রায় ভোর-অবধি সেখানে অবস্থান করা,বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে অবিরাম সাক্ষাৎকার ও বাইট দেয়া ছিল আরেকটি কাজ আমার। সেই গণজোয়ারের প্লাবনে মন-চেতনা-দেহকে সিক্ত করার মধ্যে ছিল পরমানন্দের স্বাদ! এসবই আজ সুখস্মৃতি কিন্তু মনের পর্দায় আজও তা কত সমুজ্জ্বল!এফ এম শাহীনের বইটির ভূমিকা লিখতে বসে মনের অজান্তেই স্মৃতির ভান্ডার থেকে উপরে উল্লিখিত দু’একটি মতি খসে পড়েছে। এমনি ধারায় অসংখ্য স্মৃতির ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে আছে আমার আর সেদিনগুলোতে গণজাগরণ মঞ্চের সাথী-সারথি-নিবেদিতপ্রাণ অগণিত মানুষের হৃদয়-মন।

বইটিতে গণজাগরণ মঞ্চের সূচনা ও এর পরবর্তী দিনগুলোর সংগ্রাম-সাধনার কথা এবং মঞ্চের নানান কর্মধারা আর এর সঙ্গে যারা নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন তাদের নাম পরিচয় ইত্যাদি উল্লিখিত হয়েছে বিশ্বস্ততার সঙ্গে। আর সেদিনের ঐ মঞ্চের কুশীলবদের মধ্যে কারো কারো অতি উৎসাহী ও হঠকারিতামূলক ভূমিকাগুলিও স্পষ্টভাবে লেখক ফুটিয়ে তোলার আন্তরিক চেষ্টা করেছেন।

কিছু চিহ্নিত বামপন্থী নেতা সেদিন এটিকে একটি মওকা হিসেবে বিবেচনা করে ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটাবার যে চক্রান্তমূলক কার্যকলাপ গ্রহণ করেছিলেন তাতে তাদের মুখোশটি জনগণের কাছে উন্মুক্ত হতে সময় লাগেনি। এ বিষয়ে বইটিতে এ সংক্রান্ত যেসব ঘটনার উল্লেখ লেখক করেছেন তা যে এককথায় ন্যাক্কারজনক এবং ষড়যন্ত্রমূলক এতে কোনো সন্দেহের অবকাশই নেই আজ!

গণজাগরণ মঞ্চের শেষদিকে কী কারণে ইমরান এইচ সরকারকে নানা বিতর্কিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গেল,সে বিষয়ে কিছু তথ্য-প্রমাণ এতে সন্নিবেশিত হলে আরো ভালো হতো নিশ্চয়!এর দ্বিতীয় সংস্করণে লেখক বিষয়টির দিকে খেয়াল রাখবেন বলে আশা করি। আলোচ্য বইটি বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছাক আর এর বিবরণ পাঠ করে গণতান্ত্রিক,অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবাদী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যুগে যুগে দেশের তরুণেরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে নিজেদের বুদ্ধি, বিবেচনা,মেধা ও প্রতিভা সর্বতোভাবে নিয়োগ করুক এটিই আমার অন্তরের একান্ত কামনা। দেশের সরকারি পাঠাগারগুলিতে বইটি যাতে স্থান পায় সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ কাম্য বলে মনে করি।

লেখক: শাহীন রেজা নূর

নির্বাহী সম্পাদক দৈনিক ইত্তেফাক ও সভাপতি প্রজন্ম-৭১

(এফ এম শাহীনের ‘গণজাগরণের দিনগুলি’ বইয়ের ভূমিকা)