সাংবাদিকতার মৌলিক বিষয়গুলো বলবে ‘সাংবাদিকতা রাতে বিরাতে’

২০০০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে আমার প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়। ভালো ভালো বই সব ইংরেজিতে। সেমিনারে যেয়ে বাংলা বই খুঁজি। উল্টেপাল্টে দেখি। মনঃপুত হয় না। অনুবাদের যে মান, আনাড়ি আমার চোখেই কেমন বেখাপ্পা লাগে। ক্লাসরুমে পড়ানো তত্ত্বগুলো বেশ খটমট লাগতো।

যদিও সাংবাদিকতার মৌলিক বিষয়গুলো সব জায়গায় একই রকম। কিন্তু আমার দেশের পাঠকের দাবির সঙ্গে নিশ্চয়ই মার্কিন মুল্লুকের কোন পাঠকের দাবি মিলবে না! ক্লাসরুমে মার্কিনিদের বই পড়ে মাঠে সাংবাদিকতা করতে গেলে তত্ত্ব ও বাস্তবতার গ্যাঁড়াকলে নাভিশ্বাস উঠবেই। আমি আমার ছাত্রজীবনে সাংবাদিকতার পাঠক্রমে ভালো বাংলা বইয়ের অভাব ভীষণভাবে অনুভব করেছি।

‘সাংবাদিকতা রাতে বিরাতে’- মাহফুজুর রহমান এর বইটা হাতে পেয়ে বেশ আগ্রহ আর মনোযোগের সাথে শেষ করলাম। লেখক নিজে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার ছাত্র। দীর্ঘ তিন দশকের ক্যারিয়ার। কাজ করেছেন খ্যাতনামা সব প্রতিষ্ঠানে। সহ-সম্পাদক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করা মাহফুজুর রহমান গত তিন বছর ধরে বার্তাসংস্থা ইউএনবির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। উনার দেখা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বিবর্তন, সংকট, সম্ভাবনা সবই বেশ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে বইটাতে। বেশ সহজ এবং প্রাঞ্জল ভাষায় ছোট ছোট অধ্যায়ে সাংবাদিকতার মৌলিক বিষয়গুলো লেখক তুলে এনেছেন। শুধু সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী নয় নবিস সাংবাদিকদেরও বইটা উপকারে আসবে। এমনকি বোদ্ধা পাঠক যারা সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতা কিংবা একটা মিডিয়া হাউজ কিভাবে রান করে এগুলো সম্পর্কে কৌতুহলী- বইটা তাদের কৌতুহল মেটাবে বলে আমার বিশ্বাস।

গল্পের ছলে। ছোট ছোট ঘটনা বিন্যাসে অনেক তিতা সত্য বলা হয়েছে বইটাতে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবিকতার কথা উঠে এসেছে বারবার। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ভবিষ্যত নির্ভর করছে মানসম্মত বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতার উপর। স্মার্টফোনের যুগে যার হাতে একটা স্মার্টফোন সেই তথ্যের ভান্ডার। সাংবদিকতার সামনের দিনের চ্যালেঞ্জ মোকালেবার কৌশলও বলা আছে বইটাতে।

আর্থিক সংকট, পর্যাপ্ত বিনেয়োগের অভাব এই দুইয়ের পাশাপাশি দক্ষ কর্মীবাহিনীর অভাব বাংলাদেশের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এদেশে যারা সাংবাদিকতা করে তাদের অধিকাংশেরই সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা বা কোনরকমের প্রস্তুতি থাকে না। আরো অবাক করা ব্যাপার হলো কোন প্রশিক্ষণ ছাড়াই নতুনদের মাঠে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমার বিশ্বাস- ১.সংবাদ কি এবং কেন ২.সংবাদ বোধ ৩. সংবাদ কাঠামো ৪.ফিচার ভাবনা ৫.অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ৬.ভাষার মুন্সীয়ানা ৭. মন্তব্যধর্মী সংবাদ ৮. শিরোনামই শিরোপা ৯. ছবির চমক ১০.’আমি সাংবাদিক ‘ ১১. সাংবাদিকতা রাত বিরাতে ১২. সাংবাদিকতা ডিজিটাল যুগে ১৩.সাংবাদিকতা মাঠে ময়দানে -বইটার এই চ্যাপ্টারগুলো কেউ যদি মনোযোগ দিয়ে পড়ে এবং ধারণ করে তাহলে সাংবাদিকতার মৌলিক বিষয়গুলো তার দখলে চলে আসবে।

কিছু মুদ্রণগত ত্রুটিছাড়া বইটার তেমন কোন দুর্বলতা চোখে পড়েনি। বইটার একটা শব্দ ব্যবহারে আমার আপত্তি আছে ‘অবিবাহিতা যুবতী’। শব্দটা জেন্ডার বায়াসড।

এই বইয়ের একটা বিশেষত্ব আছে। সেটা হলো-পুরো বইটা  মুখে মুখে বলা। লেখক বলেছেন, লেখকের বর্ণনা শুনে আরেকজন টাইপ করেছেন। সেগুলোকেই একত্রিত করে পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বইটা লেখা। এদেশের গণমাধ্যমের বিভিন্ন অলিগলি খুব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে একজন পেশাদার সাংবাদিকের বর্ণনায়। সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রছাত্রী এবং এই পেশায় যারা নতু্ন এসেছেন ‘রাত বিরাতে সাংবাদিকতা’ বইটা তাদের দিক নির্দেশনার কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস।

বাণী ইয়াসমিন হাসি

সম্পাদক, বিবার্তা২৪ডটনেট।