'কৃষিতে ভর্তুকি দেন, কৃষক ঠেকাবে দুর্ভিক্ষ'

বিশ্বজুড়ে করোনার কারণে অর্থনীতিতে বিরাট ধাক্কা খাবে। কল কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। যন্ত্র সভ্যতা মুখ থুবড়ে পরেছে। এখন আমাদের দ্রুত ফিরতে হবে কৃষি সভ্যতায়। ১৯৭২ সালে কৃষি ক্ষেত্র মোট জিডিপি ছিলো ৭২% সেটা এখন কমতে কমতে ১৪% এ এসে দাঁড়িয়েছে। সারা পৃথিবীই অর্থনীতির ধস নেমেছে। দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির অনুৎপাদনশীলতার কারণে দেশে দেশে খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করবে। ফলাফল নিশ্চিত দুর্ভিক্ষ। এ দুর্ভিক্ষ থেকে পরিত্রানের একমাত্র উপায় খাদ্য শষ্য উৎপাদন।

মানুষের ঘরে যদি খাবার থাকে তবে দীর্ঘ মেয়াদে অরাজকতা থেকে মুক্তি মিলবে। খাদ্য সংকট দেখা দিলে দ্রুত আইন শৃঙ্খলার অবনতি হতে থাকবে। মহামারীতে যত মানুষের মৃত্যু হবে তার চেয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হবে দুর্ভিক্ষে। 

তাহলে আমাদের এখন করনীয় কি?
প্রথমেই নজর দিতে হবে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে। আমরা জানি আমাদের স্বাস্থ্যখাত কতোটা বিশৃঙ্খল। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জেলা মানিকগঞ্জ। মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের দামি দামি চিকিৎসা সামগ্রী কেনা হয়েছে কিন্তু ব্যবহার না করার কারনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি কেন সব মন্ত্রণালয় কেনাকাটা আগ্রহী? 

এ সংকটপূর্ণ সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজাতে হবে। প্রয়োজনে মন্ত্রীর সাথে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাদের সমন্ময়ে গুরত্বপূর্ণ ও কার্যকরি সিদ্ধান্ত নিয়ে এ খাতে প্রনোদনার আওতায় আনতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে স্বাভাবিক বাজেটে মহামারীর মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। অথচ আমরা দেখলাম, এ সময়ে যে দুটি খাত স্বাস্থ্য ও কৃষি সবচেয়ে গুরত্ব পাওয়ার কথা সেখানে কোন প্রনোদনা নাই। 

অর্থনীতিতে অতীতের কোন সূত্রই কিন্তু খাটবে না। এখন প্রয়োগ করতে হবে সম্পর্ণ নতুন কোন সূত্র কারন পৃথিবীর সকল কিছুই এক সাথে বন্ধ। অর্থনীতি পুরোপুরি ধংস হয়ে যাবে। কোন দেশই অন্য কোন দেশের পাশে এসে দাঁড়াতে পারবে না। প্রতিটা দেশকেই তার নিজস্ব অর্থনীতির মধ্য দাঁড়াতে হবে। তাই আমাদের কৃষিকে ঢেলে সাজাতে হবে। কৃষককে সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে। ঋণটা হতে হবে সরাসরি কৃষকের হাতে। 

আমরা জানি, কৃষকের হাতে কোন গচ্ছিত টাকা নাই। সে উৎপাদনে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন এনজিও, ব্যাংক বা মহাজন থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে থাকে। ফসল উৎপাদনের পরে তারা উৎপাদনের খরচও ঘরে নিতে পারে না। ফলশ্রুতিতে কৃষক দারিদ্রতার দুষ্টুচক্রে নিমজ্জিত হয়। 

কৃষককে তার ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে যেন সে আবার উৎপাদনের যেতে উৎসাহ পায়। খাদ্য শষ্যের কোন ঘাটতি যেনো না পরে। গরীব জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি টাকা পৌছাতে হবে। টাকাটা পাঠাতে হবে কৃষির মাধ্যমে বা অন্য যে কোন উপায়ে, এতে মূল্যস্ফীতি ঘটতে পারে সে দিকে তাকানো যাবে না।

বাংলাদেশের কৃষকের সব কিছুই চলে গেছে বহুজাতিক কম্পানীর কাছে। তারা কৃষকদেরকে দিয়ে শুধু উৎপাদনটা করিয়ে নেয় কিন্তু লভ্যাংশ চলে যায় কোম্পানির ব্যাংক এ্যাকাউন্টে। কখনো ইংরেজ আমলের নীল চাষের মতো বাধ্য করা হয় কোম্পানির ইচ্ছা মতো ফসল চাষ করাতে।


উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়- তামাক চাষ। কোন কৃষকই তামাক চাষ করতে চায় না। ফসল উৎপাদনের জন্য জমি, জমি প্রস্তুত, বীজ, সার প্রভৃতি প্রয়োজন হয়। কিন্তু এ সময় কৃষকের কাছে কোন নগদ টাকা থাকে না। সে সরকারি, বেসরকারি ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে কোন ঋণ পায় না। এনজিওদের কাছে চড়া সুদ সে বহন করতে অক্ষম। আর তখনই কৃষকের কাছে এগিয়ে আসে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তারা সহজ শর্তে ঋণ দেয় এবং বাধ্য করে কোম্পানির পছন্দ মতো চাষ করতে। 

অন্যদিকে কৃষক যে যুগ যুগ ধরে নিজেই বীজ সংগ্রহ করতো সেটা এখন চলে গেছে বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। কোন কৃষকের গোলায় এখন আর বীজ থাকে না। উৎপাদনে যাওয়ার আগে তাকে চড়া মূল্যে কম্পানীর দেয়া বীজ কিনতে হয়। যে ধান সে বিক্রি করে প্রতি মণ ৬০০/- ৭০০/- টাকায়। কম্পানীর কাছে থেকে সে ধান বীজ কিনে প্রতি মণ ৮০০০/- ৯০০০/- টাকায়। এরপর আছে সার, কীটনাশক, জমি প্রস্তুতের জন্য চাষ দেয়াসহ অন্যান্য খরচ। কৃষক যেন কম্পানীর নব্য ক্রীতদাসে রুপান্তরিত হয়। এখনই সময় কৃষককে তার কৃষি ফেরত দিতে হবে। তাহলে কৃষক উৎপাদনে উৎসাহ হারাবে না। যদি কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হয় এবং তার ফসলের ন্যায্য দামের নিশ্চিত করা যায় তাহলে বাংলাদেশের খাদ্যশষ্যের ঘাটতি তো হবেই না উদ্বৃত্ত খাদ্য শষ্য মহামারীর এ ক্লান্তিকালে রপ্তানি করে আয়ের সম্ভাবনা প্রবল। 

অতীতে আমাদের দেশে হরতালসহ নানান অরাজকতায় দেশ প্রায় অচল হয়ে গিয়েছে তখনো আমাদের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখির হয়েছে আবার দু তিন মাসের মধ্যের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। তবে এবারের সংকট আরো বেশি ঘনীভূত কারন বৈদেশিক রেমিট্যান্স আসা প্রায় বন্ধই হয়ে যাবে। বেশির ভাগ প্রবাসী চলে এসেছে বা চাকরী হারাবে অথবা তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি পুষিয়ে দেশে টাকা পাঠানোর সক্ষমতা অর্জনের বেশ কিছু সময় প্রয়োজন হবে। এহেন বাস্তবতায়, মানুষের ঘরে যদি খাবার থাকে এবং চিকিৎসা পায় তবে সে আগামীর সব সংগ্রামে অগ্রনী ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে। এখনই কৃষিতে ভুর্তকি দিয়ে খাদ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে তবেই আশু দুর্ভিক্ষ থেকে দেশের মানুষ মুক্তি পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

শফিক সেলিম
লেখক: কবি ও সম্পাদক
মেইল : [email protected]
সেল : ০১৯৮৫-৩৫২৫১৫