গণস্বাস্থ্যের কোভিড টেস্ট কিট কি গ্রহণযোগ্য না বর্জনীয়?

রমজান মাস এলে ধর্মে-কর্মে একটু বেশী মনোযোগী হই, মা সহ প্রয়াত সকলের জন্য নামাজ পড়ে দোয়া করি। কোন এক রোজার মাসের দুদিন আগে আমার মা মধ্যরাতে ঘুমের মধ্যে মারা যান। রমজান মাস এলে তাই আমি খুব বেশী এলোমেলো হয়ে যাই। এর মধ্যে সংসারের নিয়মিত কাজগুলো তো আছেই। ক্লান্তিও বেড়েছে কিছুটা আজকাল। স্বভাবতই অন্যান্য কাজগুলো একটু কমে যায়। এর মধ্যে শুরু হয়েছে গণস্বাস্থ্য উদ্ভাবিত র‍্যাপিড (rapid) কোভিড টেস্ট কিট নিয়ে দেশজুড়ে তুমুল বিতর্ক। আমার কাছে এই বিতর্কটিকে খুব অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। বিশেষ করে বিতর্কের সেই ভাষাটি যখন দেখি বিজ্ঞানকে পাশ কাটিয়ে অন্যান্য অযাচিত অঙ্গনে ঢুকে পড়েছে।

অনেকেই ফেসবুকের ইনবক্সে যোগাযোগ করে এই কিটটির ব্যাপারে আমার মন্তব্য জানতে চেয়েছেন। ব্যস্ততার অজুহাতে তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে চেয়েছি। কিন্তু অবস্থা বর্তমানে এখন এমন পর্যায়ে পৌছেছে যে মনে হল, এসময়ে একজন সামান্য এপিডেমিওলজিস্ট হিসেবে আমার কিছু বলা উচিত।

বাস্তবতা হলো, বর্তমানের বৈশ্বিক করোনা মহামারীর প্রেক্ষিতে গণস্বাস্থ্যের গবেষকেরা মানবদেহে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি সনাক্ত করার জন্য একটি র‍্যাপিড টেস্ট কিটের উদ্ভাবন করেছেন। এই গবেষণা দলের প্রধান ড. বিজন কুমার শীল একজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষক, তার গবেষণার অতীত রেকর্ডও খুব উজ্জ্বল এবং এ ধরণের কাজের জন্য প্রাসঙ্গিক। কিটটি উদ্ভাবন করার প্রক্রিয়ায় গবেষণাগারে তারা নিশ্চয়ই তাদের মত করে কিটটির সক্ষমতা যাচাই করেছেন। পত্রিকায় দেখলাম, তারা ইতিমধ্যে এই কিট সেন্টারস ফর ডিজিস কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশনকেও (সিডিসি) হস্তান্তর করেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, মানবদেহে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করতে এই কিটটা আসলেই কার্যকর কি না? হলেও তা কতটুকু কার্যকর? এ ব্যাপারে লেখার আগে প্রাসঙ্গিক কিছু কথা বলে নেই। যে কোন আদর্শ পরিস্থিতিতে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে স্বভাবতই আমরা জানামতে সেরা টেস্টটিই করতে চাইব। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে সেটা সবসময় সম্ভব হয় না। এই যে আমরা বাসায় বসে আঙ্গুলের ডগা থেকে রক্ত নিয়ে স্ট্রিপ দিয়ে ডায়াবেটিসের পরীক্ষা করি, তা কতটুকু সঠিক? কেন আমরা প্রতিদিন ল্যাবরেটরিতে গিয়ে রক্তের শর্করার পরীক্ষাটা করি না? এর কারণ হলো, সবার পক্ষে প্রতিদিন বা প্রায়শই ল্যাবরেটরিতে যাওয়া কষ্টকর। আপনি কি জানেন, ঘরে বসে আপনি যে ডায়াবেটিসের স্ট্রিপ টেস্টটি করছেন তা কতটুকু সঠিক? বা একটু ঘুরিয়ে বলি, ঘরে বসে করা আপনার এই স্ট্রিপ টেস্টটি শতভাগ সঠিক নয়।

কোন রোগে যখন মাঠ পর্যায়ে অনেক মানুষের টেস্ট করার প্রয়োজন হয় এবং দেশে ল্যাবরেটরিতে সেই পরিমাণ টেস্ট করা দু:সাধ্য বা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন বিকল্প হিসেবে স্ক্রিনিং টেস্টের কথা ভাবা হয়। এই স্ক্রিনিং টেস্টের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, মাঠ পর্যায়ে এগুলো সহজে, স্বল্প সময়ে ও সুলভে করা যায়। অনেক অসুখের জন্যই স্ক্রিনিং টেস্ট পাওয়া যায়। পৃথিবীতে কোন স্ক্রিনিং টেস্টই শতভাগ সঠিক নয়, সে কিছু ফলস পজিটিভ ও ফলস নেগেটিভ রেজাল্ট দেবেই। অর্থাৎ, কিছু লোককে সে বলবে করোনা পজিটিভ অথচ তাদের দেহে করোনা ভাইরাস নাই (ফলস পজিটিভ)। আবার কিছু লোককে সে বলবে করোনা নেগেটিভ অথচ তাদের শরীরে করোনা ভাইরাস আছে (ফলস নেগেটিভ)। মাঠ পর্যায়ে কোন স্ক্রিনিং টেস্ট কতটা কার্যকর তা নির্ধারণ করার জন্য আমরা সাধারণত ভাল কোন ল্যাবরেটরি টেস্টকে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে নির্ধারণ করি। গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড টেস্টকে সঠিক বিবেচনা করে সেই তুলনায় স্ক্রিন টেস্টটা কতটা সঠিক সেটা নির্ধারণ করেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, স্ক্রিন টেস্টটা আমরা ব্যবহার করবো কি না? এভাবে স্ক্রিন টেস্ট মূল্যায়নের জন্য এপিডেমিওলজিতে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির বর্ণনা করা হয়েছে যার মাধ্যমে আমরা প্রস্তাবিত স্ক্রিনিং টেস্টটির মূল্যায়ন করতে পারবো। মূল্যায়ন অর্থাৎ কিটটির সেন্সিটিভিটি, স্পেসিফিসিটি ক্যালকুলেট করতে হবে। সাথে পজিটিভ ও নেগেটিভ ভ্যালুও ক্যালকুলেট করা যায়। এ থেকে প্রয়োজনে রিসিভার অপারেটিং ক্যারেক্টারিস্টিক কার্ভ বা আরওসি কার্ভ তৈরী করেও কিটটির সক্ষমতা নির্ধারণ করা যায়। শেষের কথাগুলো একটু টেকনিক্যাল হয়ে গেলো, হয়তো বুঝতে অনেকেরই একটু কষ্ট হবে। তবে এর চেয়ে আর সহজ করে বলতে পারছি না বলে দু:খিত।

এখন আসি মূল কথায়। গণস্বাস্থ্য একটি কোভিড টেস্ট কিট তৈরী করেছে, এখন এটা কার্যকর কি না তা পরীক্ষা করার দরকার। বর্তমানের বৈশ্বিক মহামারীর প্রেক্ষিতে এই দায়িত্ব কার? আমার মতে, এটা যে কোন ভাল জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানই করতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ও উদ্যোগ নিয়ে করতে পারে। তবে আমি চাইব না গণস্বাস্থ্য এই কিটসের মূল্যায়ন করুক। কারণ এই ধরণের মূল্যায়ন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেই করা উচিত, তাতে মূল্যায়নটি পক্ষপাতমুক্ত হয়।

যদি আমরা কিটটি মূল্যায়ন করবার ব্যাপারে একমত হই, তাহলে এটি করতে সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ সময় লাগবে। গবেষণার শুরুতেই একটা রিসার্চ প্রোপোজাল লিখতে হবে যেখানে মূল্যায়ন পদ্ধতিটি বিস্তারিত লেখা থাকবে। এক্ষেত্রে গণস্বাস্থ্যকে তাদের উদ্ভাবিত কিট সম্পর্কে সকল তথ্য প্রদান করতে হবে যা প্রোটোকলে লেখা থাকবে। পুরো প্রোপোজালটা লিখতে একবেলা, বড় জোর একদিনের বেশী সময় লাগার কথা না। যেহেতু এই গবেষণায় মানবদেহের স্যাম্পল ব্যবহৃত হবে, তাই যে কোন একটা রিসার্চ এথিক্স কমিটির অনুমতি নিতে হবে। বর্তমানের জরুরী পরিস্থিতিতে এই অনুমতি একদিনে পাবার ব্যবস্থা করা সম্ভব। সেটা বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি) বা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ এথিক্স কমিটিই দিতে পারে। এই দুটো ধাপ পেরোনোর পরে আমরা গবেষণার উপাত্ত সংগ্রহের কাজটা শুরু করতে পারি। আমার হিসেব মতে স্যাম্পল সাইজ দুইশত হলেই যথেষ্ট। অর্থাৎ, দুইশত মানুষের প্রত্যেকের শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে একই ব্যক্তির একটি নমুনা (গলার ভেতর থেকে নেওয়া নমুনা) আমরা পিসিআরে পরীক্ষা করবো এবং একই ব্যক্তির রক্তের নমুনা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গণস্বাস্থ্য উদ্ভাবিত কিট দিয়ে পরীক্ষা করবো। পরীক্ষা শেষে দুটোর ফলাফলই আমরা লিখে রাখবো। এক্ষেত্রে আমার প্রস্তাবনা হবে, একদিনে আইইডিএসআরে এবং বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পিসিআরে পরীক্ষার জন্য যত ব্যক্তির কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হবে, তাদের প্রত্যেকেরই কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিকভাবে গণস্বাস্থ্য প্রণীত কিট দিয়েও করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করে দেখা হবে। সেক্ষেত্রে দুশোর বেশী মানুষ হলে ক্ষতি নেই, বরং আরো ভালো হবে। যেহেতু গবেষণার অংশ হিসেবে পরীক্ষাগুলো করা হবে, তাই পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষকে দুয়েকদিনের জন্য তদারকি কাজে নিয়োজিত রাখতে হবে। গবেষণার উন্নত মান নিশ্চিত করাটাও জরুরী। পরীক্ষার ফলাফল হাতে পেলে তা কম্পিউটারে ঢুকিয়ে দ্রুততম সময়েই সেন্সিটিভিটি, স্পেসিফিসিটি ও অন্যান্য সূচকগুলো ক্যালকুলেট করা সম্ভব। আমার মতে, প্রস্তাবিত কিটটির যদি ৮০% সেন্সিটিভিটি ও ৯০% স্পেসিফিসিটি থাকে, তাহলেই মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক মানুষের দেহে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি সনাক্তকরণে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

আমরা কেন স্ক্রিনিং মূল্যায়নের বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত এই পথে হাঁটছি না? গুগলে খোঁজ করে দেখেন, অন্যদেশে ইতিমধ্যে কয়েকজন গবেষক কোভিড কিটের কার্যকারিতা মূল্যায়নে এই পদ্ধতির ব্যবহার করেছেন। এই গবেষণাটি খুব কঠিন কিছু নয়, চাইলে বিদেশে বসেও আমরা পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতে পারি।

বিজ্ঞানের জগতে বৈজ্ঞানিক ভাষায় কথা বলাই কাম্য, কাঁদা ছোড়াছুড়ি নয়।

লেখক:

অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

এপিডেমিওলজিস্ট এবং চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস এন্ড রেসপন্সিবিলিটিজ (এফডিএসআর)