বাংলাদেশে আর কতকাল এই খণ্ডিত লকডাউন?

নভেল করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে লকডাউনের পাঁচ সপ্তাহ পার হল। পরিসংখ্যানের মডেলিং অনুসারে, কোন জনপদে আশি শতাংশের বেশী মানুষ লকডাউন না মানলে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে একটানা আট সপ্তাহ কঠোরভাবে লকডাউন পালন করলে জনপদে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। বিভিন্ন সূত্রমতে, করোনার প্রেক্ষিতে দেশব্যাপী আংশিক লকডাউন পালিত হয়েছে। সেক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যখাতে লকডাউনের পরিপূর্ণ উপকারটুকু বাংলাদেশ পেয়েছে বলে মনে হয় না।

লকডাউন আংশিক পালিত হলেও এসময়ে আন্তর্জাতিক ও আভ্যন্তরীণ বাণিজ্য কমার ফলে দেশের অর্থনীতি ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে। বৈশ্বিক মহামারীর প্রেক্ষিতে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্সের প্রবাহও কমেছে। দেশের ভেতরে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা বড় অংশের উপার্জন বিঘ্নিত হয়েছে। অন্ন কষ্টের ঝুঁকির মুখেও পড়তে হয়েছে অনেক পরিবারকে। এ কথা সবাই জানে যে, সমাজে একটা উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষ অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে পড়লে তার একটা সামাজিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতিসহ সমাজে তখন নানাবিধ বিশৃংখলার সৃষ্টি হতে পারে। এই সুযোগে ওঁত পেতে থাকা দেশের অপশক্তিসমূহও তৎপর হয়ে ওঠার চেষ্টা করবে। সব মিলিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এভাবে খণ্ডিত লকডাউন চালিয়ে যাবে নাকি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিতভাবে শুরু করবে? ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, প্রায় সারাদেশেই গার্মেন্টস কারখানাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জেলা শহরেই লোকজন রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছেন, লকডাউন তেমন আর মানছেন না।

পৃথিবীতে যেসব দেশ লকডাউন শিথিল করেছে বা করার কথা ভাবছে, তাদের অধিকাংশ দেশের ক্ষেত্রেই করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের হার বর্তমানে নিম্নমুখী। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিন্তু এখনো করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের হার উর্ধ্বমুখী। দেশে টেস্টের সংখ্যা যতোই বাড়ছে, করোনা সংক্রমনের হার বিষয়ে আমাদের ধারণা ততই স্পষ্ট হচ্ছে। আমরা দেখছি যে এটা বাড়ছে। এই অবস্থায় লকডাউন শিথিল করা কতটা যৌক্তিক সেই প্রশ্ন থেকেই যায়, এবং এখানেই যত শঙ্কা! বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, এখন কি বাংলাদেশ থেকে লকডাউন প্রত্যাহার করা উচিত, আমার স্পস্ট উত্তর হবে ‘না’। করোনা সংক্রমণের উর্ধ্বগতির এই সময়ে বাংলাদেশের জন্য লকডাউন প্রত্যাহার ভাল কোন পরিণতি বয়ে আনার কথা না। করোনার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দেশে বরং যোগ্য মানুষের সমন্বয়ে একটা ছোট কমিটি থাকা উচিত যারা জাতীয় পর্যায়ে বা এলাকাভেদে লকডাউন আরোপ বা শিথিল করার ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সময়ে সময়ে পরামর্শ দেবেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও করোনার প্রতি এক ধরণের উদাসীনতার প্রেক্ষিতে মার্চ মাসে আমরা বলেছিলাম, মধ্য এপ্রিলে এসে বাংলাদেশে করোনার গতিপ্রকৃতি বোঝা যাবে। আমাদের অনুমান ভুল হয় নি, বরং টেস্টের সংখ্যা বাড়াতেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের হারও প্রত্যাশিতভাবেই বেড়েছে। বর্তমানে যেটা বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রেই লক্ষ্যনীয়, সেটা হল এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯ রোগে মৃত্যুহার চীন-ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় অনেক কম। পর্যাপ্ত সংখ্যক টেস্ট না করে নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের আপাতত হার লুকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও এ সংক্রান্ত মৃত্যু লুকিয়ে রাখা কঠিন। এটা নিয়েই এখন নানান দেশে চিন্তাভাবনা শুরু হয়ে গেছে। কারো কারো ধারণা, উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ অচিরেই কমে আসবে। এটি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য কোন কারণ বলে মনে হয় না। কারণ মানুষ থেকে মানুষে করোনার সংক্রমণ হয়। ঋতুভেদে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কিন্তু একই থাকে, তেমন হেরফের হয় না। তাছাড়া, তাপমাত্রার সাথে করোনার সংক্রমণের কোন সম্পর্ক এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। এর চেয়ে বরং গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিন্যাস। দেশে পয়ষট্টি বা ততোধিক বয়সের মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার সাড়ে পাঁচ শতাংশের মত। অর্থাৎ, বাংলাদেশের মানুষের গড় বয়স পশ্চিমা দেশের তুলনায় কম। পশ্চিমা দেশসমূহে বয়স্ক লোকেরাই কোভিড-১৯ রোগে অধিক হারে মারা গেছে। অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সের লোকেরা করোনায় সংক্রমিত হলে মৃত্যুহার কম হতে পারে। তবে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসজনিত মৃত্যু নিয়ে কথা বলবার জন্য আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। পুরো মে মাসটা আমাদের সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রতীক্ষার কালটা জুন-জুলাই পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও অবাক হব না।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বোঝাই যাচ্ছে লকডাউন কাগজে-কলমে যতটাই থাকুক, বাস্তবে আর ততটা পালিত হবে বলে মনে হয় না। সরকারী নির্দেশনা সত্ত্বেও যখন সবার কঠোরভাবে লকডাউন পালন করার কথা ছিল, তখনই অনেকে তা মানেনি। উল্টো লকডাউনের সময়টা ছুটির মুডে কাটিয়ে সচেতন নাগরিক হিসেবে স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে অনেকেই ব্যর্থ হয়েছি। সরকার তার সাধ্যমত বিভিন্ন খাতে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করেছেন, দরিদ্রদের ঘরে ঘরে ত্রাণ সহায়তা পৌছে দেবার চেষ্টা করেছে। আর আমরা লকডাউনের নির্দেশনা ভেঙ্গে অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে ঘুরে বেরিয়েছি। স্বভাবতই দেশে সামগ্রিকভাবে করোনা পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে।

দেশে যখন লকডাউন শিথিল হয়ে পড়ছে, তখন কিছু মানুষ করোনা পরিস্থিতির সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভেবে উদ্বিগ্ন। এরকম একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে আমাদের আসলে করণীয় কী? আমাদের সকলের নিজ নিজ স্বার্থেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ, প্রয়োজনানুযায়ী বারবার সাবান পানি বা অ্যালকোহলবেজড হ্যান্ড স্যান্টাইজার দিয়ে দুই হাত পরিস্কার রাখতে হবে। নাকে, মুখে ও চোখে অপরিচ্ছন্ন হাত দেওয়া যাবে না, কারণ এই তিনটি পথেই মানুষের শরীরে নভেল করোনা ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে। যদি নিজের ভাল চান, তাহলে বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হবেন না। প্রয়োজনে যদি বের হতেই হয়, তাহলে মাস্ক পরে বের হওয়া ভাল। এই সময়ে মানুষের সাথে করমর্দন, আলিঙ্গনের মত ঘনিষ্টতা এড়াতে হবে। অন্যান্য মানুষের থেকে ছয় ফুট বা যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। যাদের পক্ষে সম্ভব, তাদের বাসা থেকেই অফিসের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া উচিত। যাদের বয়স পঞ্চাশের উপর, করোনার সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে তাদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। যারা করোনার মত উপসর্গ যেমন জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্টে ভুগছেন তারা ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন এবং বাইরে ঘোরাঘুরি বন্ধ করুন। এরকম মিশ্র পরিস্থিতিতে নভেল করোনাভাইরাস টেস্টের সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে কম্যুনিটি পর্যায়ে স্ক্রিনিং টেস্ট কিট দিয়ে লাখ লাখ মানুষের টেস্ট করতে হবে। এই টেস্টের মাধ্যমে আমরা কম্যুনিটিতে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি বুঝতে পারব।

যেহেতু নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের অভিজ্ঞতা সমগ্র পৃথিবীর জন্য নতুন, তাই অনেক প্রশ্নের উত্তরই এই মুহূর্তে আমাদের জানা নাই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কিছু প্রশ্নের উত্তর সময়ই ভাল দিতে পারবে। বর্তমানে আমরা একটা অনুমিত দু:সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এ সময়ে যতটা সতর্ক থেকে, সাধ্যমত সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যায়, ততই উত্তম। প্রিয় মাতৃভূমির জন্য শুভ কামনা।

লেখক

অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস এন্ড রেসপন্সিবিলিটিজ (এফডিএসআর)