১৫ আগস্ট বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা টার্গেট হলেন ২১ আগস্ট!

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে তাঁর আজীবন লড়াই-সংগ্রামে অর্জিত স্বপ্নের দেশে ফেরার পর ১৮ জানুয়ারি ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘যে মানুষ মরতে রাজি, তাকে কেউ মারতে পারে না। আপনি একজন মানুষকে হত্যা করতে পারেন। সেটা তো তার দেহ। কিন্তু তার আত্মাকে কি আপনি হত্যা করতে পারেন? না তা কেউ পারে না। এটাই আমার বিশ্বাস।’


১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাঙালির জাতির পিতা শেখ মুজিবের দেহবিনাশ হলেও প্রতি-দিন-প্রতি-ক্ষণ কোটি কোটি বাঙালি নতুন করে আবিষ্কার করেছে বাঙালির জাগরণের এই মহাজাদুকরকে, পুনর্জন্ম দিয়েছে তাদের অন্তরে, সংগ্রামে, প্রতিবাদে, বঞ্চনায় ও অধিকারের লড়াইয়ে। জাতির পিতার যে দর্শন পাকিস্তানি মতাদর্শের প্রেতাত্মারা থামিয়ে দিতে চেয়েছিল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, সেই মানব মুক্তির দর্শন আজ কোটি কোটি বাঙালি ধারণ করে তাদের হৃদয়ে। যারা ভেবেছিল শেখ মুজিবের দেহের বিনাশের মাধ্যমে মুছে ফেলা যাবে বাঙালির মন ও মনন থেকে কিন্তু বাঙালির অন্তর থেকে মুছে ফেলা যায়নি বরং বারংবার ফিরে এসেছে তাদের স্বপ্নের স্বদেশে মহাকালের এক অবিনশ্বর চরিত্র ধারণ করে। নিজের জীবনের চেয়েও দেশ আর দেশের মানুষকে যিনি ভালোবেসে ছিলেন, ফাঁসি নিশ্চিত জেনেও যিনি পাকিস্তানের কারাগারে বসে আপোস করেননি স্বাধীনতার প্রশ্নে, যিনি বারবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বলেছিলেন, এ দেশের স্বাধীনতা আর জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক মুক্তির কথা, এ জাতি তারই উত্তরসূরি।  


একই সাক্ষাৎকারে ডেভিড ফ্রস্ট বাঙালির জাগরণের মহাজাদুকর বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন, Mr. President, what is your qualification? বঙ্গবন্ধুর তাৎক্ষণিক জবাব ছিল- I love my people. ডেভিড ফ্রস্ট এমন জবাবের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। কারণ, তিনি মূলত বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন। বিমোহিত ফ্রস্ট-এর পরের প্রশ্ন- what is your disqualification? এবার যে উত্তরটি তিনি পেলেন, তাতেই আজীবনের জন্য বঙ্গবন্ধুর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন ওই বিখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক। একটু সময় নিয়ে চশমার ঈষৎ ধোঁয়াটে কাঁচ মুছতে মুছতে বঙ্গবন্ধু বললেন-  I love them too much. 

পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারাগারের নির্জন একটি সেলের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নয় মাস চৌদ্দ দিন রাখার পর বাংকার করার নামে খোঁড়া হয়েছিল কবর। কবর খোঁড়ার কথা শুনে বঙ্গবন্ধু এক কারারক্ষীকে বলেছিলেন, "কবরকে আমি ভয় পাই না। আমি তো জানি ওরা আমাকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু আমি জানি আমার বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে। এবং আমি এও জানি, বাংলার দামাল ছেলেরা হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে। সেই বাঙালি জাতিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।" সেদিন সেই রক্ষীকে আরো বললেন, "আমাকে হত্যা করে এই কবরে না, এই লাশটি আমার বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও। যে বাংলার আলো-বাতাসে আমি বর্ধিত হয়েছি- সেই বাংলার মাটিতে আমি চিরনিদ্রায় শায়িত থাকতে চাই।"  


বাঙালির ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে খুনি মোস্তাক চক্র ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নিজ বাসভবনে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। সেই কালরাত্রিতে বাঙালি হারিয়েছিল জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্ণেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক, প্রায় একই সময়ে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা করে সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত ও এক আত্মীয় বেন্টু খানকে হত্যা করে।


বিশ্ব ও মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্য ও নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেদিন শুধু বঙ্গবন্ধুকেই নয়, তার সঙ্গে বাঙালির স্বাধীনতার আদর্শগুলোকেও হত্যা করতে চেয়েছিল। মুছে ফেলতে অপপ্রয়াস চালিয়েছিল বাঙালির বীরত্বগাঁথার ইতিহাসও। মিথ্যাচার ও ইতিহাসের বিকৃতি করে সত্যকে আড়াল করতে চেয়েছিল তারা। আজ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা রিপোর্ট ও দূতাবাসের গোপন নথি প্রকাশের মাধ্যমে আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিলিত চক্রান্তের নাম ১৫ আগস্ট। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম জঘন্যতম ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। ৩০ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত যেই দেশ, সেই যুদ্ধের যে মহানায়ক সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁকেই হত্যা করা হলো তাঁর নিজের বাসভবনে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যাকে হত্যা করতে সাহস পায়নি, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা সেই ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিল মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায়, তাঁকে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।


গোপালগঞ্জ থেকে উঠে আসা সেই লম্বা মানুষটি বাঙালির হৃদয়ে এতটা উচ্চতায় আসীন হয়েছিলেন ভালোবাসা দিয়ে এবং অধিকার বঞ্চিত মানুষের লড়াইয়ে, যা আর কারো স্পর্শ করার মত যোগ্যতা ছিল না। তাই সরদার ফজলুল করিম লিখলেন, শেখ মুজিবকে আমরা ঈর্ষা করেছি আমাদের অতিক্রম করে বড় হওয়াতে। সবদিকে বড়। তেজে, সাহসে, স্নেহে, ভালোবাসায় এবং দুর্বলতায়, সবদিকে এবং সেই ঈর্ষা থেকেই আমরা তাঁকে হত্যা করেছি। কেবল এই কথাটি বুঝিনি যে, ঈর্ষায় পীড়িত হয়ে ঈর্ষিতের স্থান দখল করা যায় না। তাইতো এই ভূখণ্ডে মুজিবের স্থায়ী অবস্থান মধ্য গগনে এবং তাঁর নাম শুনে শোষকের সিংহাসন কাঁপে।


১৫ আগস্টের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল নানাভাবে। হত্যার বিচার ঠেকাতে কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছিল বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোশতাক সরকার। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর খুনি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যাকারীদের রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল।  


১৯৭৬ সালের ৮ জুন ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে অভিযুক্ত হত্যাকারী চক্রের ১২ জনকে পুরস্কার সরূপ বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়েছিল, লে. কর্নেল শরিফুল হককে (ডালিম) চীনে প্রথম সচিব, লে. কর্নেল আজিজ পাশাকে আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব, মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব, মেজর বজলুল হুদাকে পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব, মেজর শাহরিয়ার রশিদকে ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব, মেজর রাশেদ চৌধুরীকে সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব, মেজর নূর চৌধুরীকে ইরানে দ্বিতীয় সচিব, মেজর শরিফুল হোসেনকে কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব, কর্নেল কিসমত হাশেমকে আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব, লে. খায়রুজ্জামানকে মিসরে তৃতীয় সচিব, লে. নাজমুল হোসেনকে কানাডায় তৃতীয় সচিব, লে. আবদুল মাজেদকে সেনেগালে তৃতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।  


খুনিদের বাঁচানোর জন্য ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্ব-ঘোষিত রাষ্ট্রপতি খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ আছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় অংশে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।


এরপর ক্ষমতায় আসে সামরিক শাসক খুনি মোশতাক চক্রের অন্যতম বেনিফিসিয়ারি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেয় ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে নির্বাচন করে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।


বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেক কালো অধ্যায় সেই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, "১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ ও অন্যান্য আইন এবং উক্ত মেয়াদের মধ্যে অনুরূপ কোনো ফরমান দ্বারা এই সংবিধানের যে সকল সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন ও বিলোপসাধন করা হইয়াছে তাহা, এবং অনুরূপ কোনো ফরমান, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ বা অন্য কোনো আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত ক্ষমতাবলে, অথবা অনুরূপ কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে গিয়া বা অনুরূপ বিবেচনায় কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত কোনো আদেশ কিংবা প্রদত্ত কোনো দণ্ডাদেশ কার্যকর বা পালন করিবার জন্য উক্ত মেয়াদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আদেশ, কৃত কাজকর্ম, গৃহীত ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ, অথবা প্রণীত, কৃত বা গৃহীত বলিয়া বিবেচিত আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং ঐ সকল আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বাগৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল এবং তত্সম্পর্কে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো কারণেই কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।"


তারপর দীর্ঘ ২১ বছর লড়াই-সংগ্রাম ও অগণিত নেতাকর্মীর আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হলে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত করা এবং নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বিচার সম্পন্ন হয়। ২০০১-এর পর বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনের পাঁচ বছর এই রায় কার্যকরের পথে বাধা সৃষ্টি করে রাখা হলেও বর্তমান আওয়ামী মহাজোট সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের পাঁচজনের রায় কার্যকর হয় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি। দণ্ড প্রাপ্ত কয়েক খুনি বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছে।  


১৫ আগস্ট ১৯৭৫ দেশে অবস্থান না করার কারণে ভাগ্যগুণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। স্বামী ও বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে জার্মানিতে ছিলেন শেখ হাসিনা। কালরাতে ঘাতকের বুলেট থেকে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে। তারপর চাইলেও দেশে ফিরতে পারেননি। যে দেশটি অর্জিত হয় পিতা শেখ মুজিবের আজীবন লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে। যে দেশের জন্য পরিবারের সকলে জীবন দিল সেই পরিবারের সদস্যদেরই দেশে ফিরতে দেয়া হলো না। জার্মানি থেকে ভারত এসে আশ্রয় নেন বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে। ছয় বছর পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরেন তাঁরা। 


কিন্তু পঁচাত্তরের ঘাতকেরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে স্পর্শ করতে না পারা বুলেট পরবর্তীতে তাঁর পিছু নেয় বারবার। দেশে ফেরার পর বাবার মতো তাঁকেও হত্যার চেষ্টা হয়েছে একের পর এক। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯ বার হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হামলাটি হয় ২১ শে আগস্ট ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণে।


বাঙালির ইতিহাসে আরেকটি কলঙ্কময় দিন রচিত হয় ২১ আগস্ট ২০০৪। দিনটি পরিণত হয় বারুদ আর রক্তমাখা বীভৎস রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞের দিনে। পঁচাত্তরের খুনি ও তাদের উত্তরসূরি তারেক রহমান এই হামলার মূল কারিগর। সভ্যজগতের অকল্পনীয় এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালানোর মাধ্যমে ২০০৪ সালের এই দিন জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। 


বাঙালির শোকাবহ রক্তাক্ত আগস্ট মাসেই আরেকটি ১৫ আগস্ট ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে ঘাতক হায়েনার দল গ্রেনেড দিয়ে রক্তস্রোতের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউয়ের আওয়ামী সমাবেশস্থলে। টার্গেট ছিল এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ নেতৃত্বশূন্য করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করতেই এই দানবীয় হত্যাযজ্ঞ।


মহামান্য আদালতের রায়ের মাধ্যমে জাতির সামনে আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের কারা জড়িত। দেশবাসির কাছে আজ পরিষ্কার কিভাবে রাষ্ট্রীয় মদদে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত মারণাস্ত্র গ্রেনেড দিয়ে এই ভয়াল ও বীভৎস হামলা চালানো হয়েছিল। আলোচিত এই মামলার তদন্তে দেখা যায়, প্রভাবশালী বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী নেতা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা, পুলিশ, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই), জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) ২১শে আগস্ট হামলায় জঙ্গি সংগঠন হুজির সাথে সম্পৃক্ত ছিলো। এই মামলায় ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ এসেছে।


মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমাদের দাবি, ১৫ আগস্ট ও ২১ শে আগস্ট হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের জাতীয়-আন্তর্জাতিক কুশীলবদের চিহ্নিত করার জন্য একটা ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিশন গঠিত হোক। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের যারা মদদ দিয়েছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। হয়তো অনেকে মারা গেছে। জীবিতও আছে অনেকে, যারা সেদিন সমস্ত ষড়যন্ত্রের পেছনে ছিল। এই ধরনের একটি গবেষণা বা তদন্ত করতে পারলেই বঙ্গবন্ধুর আসল খুনিদের পরিচয় দেশবাসী জানতে পারবে। আগামী প্রজন্ম জানতে পারবে জিয়াউর রহমানসহ অন্যরা ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডে কে কী ভূমিকা পালন করেছিল এবং ২১ শে আগস্ট তার পুত্র তারেক রহমানের কী ভূমিকা ছিল। কী ভূমিকা ছিল তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ রাষ্ট্রীয় উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। নাহলে শুধু অল্প কয়েকজনের নামই জাতি জানবে কিন্তু ইতিহাসে অন্ধকারতম অধ্যায়গুলোর খলনায়কদের মুখোশ উন্মোচন হবে না।     


লেখক : এফ এম শাহীন


সম্পাদক, ডেইলিজাগরণডটকম