কাশ্মীর নিয়ে বিপাকে ভারত সরকার

জম্মু ও কাশ্মীরের স্পেশ্যাল স্ট্যাটাস তুলে নিয়ে গত ৫ আগস্ট উপত্যকাকে আলাদা দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ করা হয় রাজ্যটিতে। কাশ্মীরের নিজস্ব পতাকার পরিবর্তে ঝুলানো হয় ভারতের পতাকা।

ওই ঘোষণার পরই পুরো কাশ্মীরজুড়ে জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল ফোন, ল্যান্ডলাইনসহ ইন্টারনেট পরিষেবা। ফলে থমকে যায় গোটা উপত্যকার মানুষের জীবন। বন্ধ হয়ে যায় স্কুল কলেজসহ পর্যটনও।

এর ২ মাস পর আংশিক মোবাইল সেবা চালু হয়। তবে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধই ছিল। সম্প্রতি খুলে দেওয়া হয় পর্যটন শিল্পও। তবে তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কারণ আতঙ্ক নিয়ে কেউ আসছেন না কাশ্মীরে।

এদিকে, শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই কার্যত ঝড় উঠে ভারতের সংসদে। কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপি সরকারকে কোণঠাসা করতে একযোগে বিরোধিতায় সরব হয়েছে বিরোধীরা। কংগ্রেস, ন্যাশনাল কনফারেন্স ও ডিএমকে অধিবেশন শুরু হতেই ওয়েলে নেমে হইচই শুরু করে। তাঁদের অভিযোগ, ৩৭০ ধারা বিলোপের পর ১০০ দিন কেটে গিয়েছে, এখনও কাশ্মীর অবরুদ্ধ। অধিবেশন চলাকালীনই ওয়াক-আউট করে শিবসেনা।

সংসদে মুলতুবি প্রস্তাব আনে কংগ্রেস, তৃণমূল ও শিবসেনা। কাশ্মীরের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চেয়ে প্রস্তাব আনে কংগ্রেস। কাশ্মীরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাকে বন্দি রাখার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিবৃতি চান তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়।

এরপর গতকাল ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানান, কাশ্মীর স্বাভাবিকই আছে। ইন্টারনেটও ‘উপযুক্ত সময়ে’ চালু করা হবে। কিন্তু উপত্যকার পরিস্থিতি অন্য কথা বলছে।

কয়েক দিনের তুষারপাত আর তার জেরে বিদ্যুৎ বিপর্যয় নিষেধাজ্ঞার কাশ্মীরে বাসিন্দাদের যন্ত্রণা আরও বাড়িয়েছে। দু’দিন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও আজ আবার ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে পোস্টার দেখা দিয়েছে শ্রীনগরের শহরতলি এলাকা, গান্ডেরবাল ও অনন্তনাগে। ফলে বন্ধ হয়ে গিয়েছে দোকানপাট।

তারই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তৃতার উপরে নজর রেখেছিলেন অনেকে। তবে তাতে ফের হতাশই হয়েছেন তাঁরা। শ্রীনগরের মহিলা কলেজের শিক্ষক আব্দুল মান্নান শেখ বলেন, আমাদের সব কিছু কেড়ে নিয়ে এখন ওঁরা জ্ঞান দিচ্ছেন। এই বক্তৃতা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিল।

মহিলা কলেজেরই ছাত্রী রাকিবা সালিমের আশা ছিল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো জম্মু-কাশ্মীরকে রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার কথা ঘোষণা করতে পারেন। হতাশ তিনিও। রাকিবার সহপাঠী শাইস্তার মতে, শাহের বক্তৃতা ‘মিথ্যের ঝুড়ি’ ছাড়া কিছু  নয়। চিকিৎসক আব্দুল কবীর দারের মতে, অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী না সরানো পর্যন্ত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরার দাবি করাটাই হাস্যকর।

কাশ্মীরের দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিনতাবাদীদের টার্গেটে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে সম্প্রতি তাদের টার্গেট পাল্টেছে। এখন তাদের টার্গেটে ভীন রাজ্যের মানুষ। গত ১৫ দিনে অন্তত ২০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে যারা ভারতের অন্যসব রাজ্য থেকে কাশ্মীরে এসেছে। এতে পর্যটকদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।

এছাড়াও কাশ্মীরকে স্বাভাবিক দেখাতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের একটি দলকে কাশ্মীর নিয়ে আসা হয়। তবে তাতে ঘটেছে ঠিক উল্টো। কাশ্মীরে গিয়েই বিক্ষোভের মুখে পড়েন ইউ প্রতিনিধিরা। ফলে বাতিল হয় তাদের সফর।

অন্যদিকে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করায় ভারতের বিরুদ্ধে সুর চড়াচ্ছে আমেরিকা। এছাড়াও প্রতিদিনই ঘটছে বোমা হামলার ঘটনা। তাতে করে সাধারণ মানুষ ঘর থেকেই বের হচ্ছে না।

কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বারতের অর্থনীতিতেও। প্রতিবছর কাশ্মীর থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আয় হতো ভারত সরকারের। তবে এবার সে আয়ের খাতা শূন্য। উল্টো তাদের খরচ গুনতে হচ্ছে। তাছাড়া কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে ভারত থেকে।